টোকিওর সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রনাথের নামে চত্বর
জাপানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির খোঁজে ৪

টোকিওর শিনাগাওয়া প্রিন্স হোটেল থেকে সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় ৫৩ কিলোমিটার। ট্রেনে টোকিওর কেন্দ্রীয় স্টেশন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছাকাছি পৌঁছে সেখান থেকে ট্যাক্সিতে ক্যাম্পাসে যাওয়া যায়। স্ত্রী চন্দনা ও কন্যা আনিকে নিয়ে প্রথমে ট্রেনে, পরে ট্যাক্সিতে করে পৌঁছাই সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
আমাদের যাত্রার শুরু টোকিওর কেন্দ্রীয় রেলস্টেশন থেকে। ১৯১৬ সালের জুনে জাপান সফরের শুরুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই স্টেশনেই প্রথম এসে পৌঁছেছিলেন। তার সেই ঐতিহাসিক আগমনের দিনের একটি ছবিও রয়েছে আমাদের কাছে। ছবিটি তুলেছিলেন কিংবদন্তি মার্কিন আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক জর্জ গ্রানথাম বেইন। বিদেশি সংবাদ আলোকচিত্রের জনক হিসেবে পরিচিত বেইনকে রবীন্দ্রনাথের টোকিও সফরের ছবি তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।

পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসটি বেশ বিস্তৃত। এখানে বিশ্বের চারজন বিখ্যাত সাহিত্যিকের নামে চারটি চত্বর রয়েছে। সেগুলো হলো লিও তলস্তয় স্কয়ার, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্কয়ার, ভিক্টর হুগো স্কয়ার ও ওয়াল্ট হুইটম্যান স্কয়ার। ক্যাম্পাসের মানচিত্রে চারটি চত্বরের অবস্থানও আলাদাভাবে চিহ্নিত করা আছে।

রবীন্দ্রনাথের মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলল আনি ও মামি। মামি জাপানি সাহিত্যের শিক্ষার্থী। মূর্তির নিচে স্থাপিত স্মারক ফলকে রবীন্দ্রনাথের একটি বাণী খোদাই করা আছে। সেখানে লেখা, ‘সভ্যতার লক্ষ্য হলো মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা এবং শান্তি ও সম্প্রীতি গড়ে তোলা।’
সোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়া রিসার্চ সেন্টার ও গ্লোবাল কোর সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর রবীন্দ্রজয়ন্তী উদ্যাপন করা হয় এই টেগোর স্কয়ারে। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিকে এভাবে ধরে রাখার আয়োজন দেখে ভালো লাগল। আনি ও মামির সঙ্গে টেগোর স্কয়ারে কাটানো সময়টুকু আমাদের জাপান ভ্রমণের বিশেষ এক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও বিজ্ঞান জাদুঘরেও ঘুরে দেখার সুযোগ হলো। সেখানে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির একটি মূর্তি রয়েছে। মূর্তিটির সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলল আনি।
ওকাকুরা কাকুজোর স্মৃতির খোঁজে
সোকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফেরার পর আমরা গেলাম টোকিওর কেন্দ্রীয় এলাকায় অবস্থিত ওকাকুরা কাকুজো (ওকাকুরা তেনশিন) পার্কে। জাপানের শিল্প ও সাহিত্যের ইতিহাসে ওকাকুরা এক গুরুত্বপূর্ণ নাম। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। ১৯১৩ সালে ওকাকুরার মৃত্যু পর্যন্ত এই সম্পর্ক অটুট ছিল।
পার্কের প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে আনি। ভেতরে রয়েছে ওকাকুরার স্মৃতিবিজড়িত স্থান ও একটি স্মৃতিসৌধ। তার মৃত্যুর পর পুরোনো বাড়িটিকে পার্কে রূপান্তর করা হয়। সেখানে ওকাকুরার একটি ব্রোঞ্জের আবক্ষ মূর্তিও রয়েছে।
১৯০২ সালে প্রায় ১০ মাসের জন্য ভারতে এসেছিলেন ওকাকুরা। কলকাতায় ১৬ এপ্রিল সিস্টার নিবেদিতার মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে ওকাকুরা কয়েক মাস জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে অবস্থান করেন। রবীন্দ্রনাথ ও ওকাকুরার এই ঐতিহাসিক সম্পর্ক আধুনিক প্যান-এশীয় চিন্তা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংহতির ধারণাকে সমৃদ্ধ করেছিল।
এই সম্পর্কের স্মৃতি এখনো বহন করছে কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি। সেখানে জাপান গ্যালারিতে রবীন্দ্রনাথ ও জাপানের গভীর সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষ করে জাপানে কবির ঐতিহাসিক সফরগুলোর স্মৃতিও সেখানে সংরক্ষিত আছে।
জাপানের বিভিন্ন স্থানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিচিহ্ন খুঁজতে গিয়ে বারবার অনুভব করেছি, কবির সঙ্গে এই দেশের সম্পর্ক কেবল সাহিত্যিক পরিচয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দুই দেশের মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার যে সেতু তিনি গড়ে দিয়েছিলেন, তার স্মৃতি আজও নানা জায়গায় যত্ন করে ধরে রাখা হয়েছে।
চলবে…






