রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত জাপানের সেই বাগানে
জাপানে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির খোঁজে ৩

জাপানে প্রথম সফরে ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছিলেন ইয়োকোহামায়। সেখানে আড়াই মাসেরও বেশি সময় তার ঠিকানা ছিল সানকেইয়েন গার্ডেন। সম্প্রতি সেই ঐতিহাসিক বাগান ঘুরে দেখার সুযোগ হলো আমাদের। সঙ্গে ছিলেন চন্দনা ও অনি।
কোবে থেকে বুলেট ট্রেনে ইয়োকোহামা পৌঁছাতে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় লেগেছিল। আমাদের হোটেল শিন ইয়োকোহামা প্রিন্স হোটেল থেকে গাড়িতে প্রায় ৩০ মিনিটের পথ সানকেইয়েন গার্ডেন। ১৯১৬ সালের গ্রীষ্মে যে বাগানে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ, সেখানে পৌঁছানোর পর মনে হচ্ছিল ইতিহাসের এক বিশেষ অধ্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি।
প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার বর্গমিটার আয়তনের সানকেইয়েন জাপানের অন্যতম সুন্দর ঐতিহ্যবাহী বাগান। টোকিও উপসাগরমুখী একটি উপত্যকায় এর অবস্থান। বাগানটি তৈরি করেছিলেন জাপানের প্রখ্যাত রেশম ব্যবসায়ী ও শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক তোমিতারো হারা (১৮৬৮-১৯৩৯), যিনি সাইকেন হারা নামেও পরিচিত। কিংবদন্তি জাপানি চিত্রশিল্পী ইয়োকোয়ামা তাইকান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে হারার পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগী হারা ইয়োকোহামায় অবস্থানকালে কবিকে আতিথ্য দিয়েছিলেন। ১৯৩৯ সালে হারার মৃত্যু পর্যন্ত তাদের বন্ধুত্ব অটুট ছিল।
আমার আগে প্রকাশিত বই ‘পেইন্টিংস অব রবীন্দ্রনাথ’-এ রবীন্দ্রনাথ ও হারার বন্ধুত্বের কথা একাধিকবার লিখেছি। এবার সেই বন্ধুত্বের স্মৃতিবিজড়িত স্থানটি নিজের চোখে দেখার অভিজ্ঞতা হলো।
বাগানের সবচেয়ে আবেগময় জায়গা শোফুকাকু। এই বাড়িতেই আড়াই মাসেরও বেশি সময় ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বাড়িটির নাম দিয়েছিলেন ‘শোফুকাকু’। এর অর্থ পাইনগাছের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাসের প্যাভিলিয়ন।
এই বাড়িটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতার সংকলন ‘স্ট্রে বার্ডস’-এর স্মৃতি। এখানে অবস্থানকালে কবি সংকলনটির অধিকাংশ কবিতা একত্র করেছিলেন। ১৯১৬ সালের নভেম্বরে নিউইয়র্কের ম্যাকমিলান কোম্পানি থেকে বইটি প্রকাশিত হয়। জাপানি বন্ধু তোমিতারো হারাকে বইটি উৎসর্গ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। বাড়িটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, যে পরিবেশে বসে কবি তার অসাধারণ কবিতাগুলো সাজিয়েছিলেন, সেই পরিবেশের কিছুটা আবহ আজও যেন এখানে রয়ে গেছে।
অবশ্য সময়ের আঘাত থেকে রক্ষা পায়নি শোফুকাকু। ১৯২৩ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে বাড়িটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়। পরে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় জাপান সরকার রবীন্দ্রনাথের ব্যবহৃত অংশের কিছু অবশিষ্টাংশ সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। বর্তমানে তার শোবার ঘরের মেঝে ও একটি দেয়ালের অংশটুকু টিকে আছে। ধ্বংসস্তূপের সেই অংশকে সেভাবেই সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেন ১৯১৬ সালের স্মৃতি মুছে না যায়।
ঘরের দেয়ালে টাঙানো রয়েছে রবীন্দ্রনাথের একটি সেপিয়া টোনের ঐতিহাসিক আলোকচিত্র। ছবিটির সামনে দাঁড়িয়ে কবির সেই সময়ের কথা ভাবছিলাম। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এই ছোট্ট ঘরটি যেন তার উপস্থিতির কথা মনে করিয়ে দেয়।
সানকেইয়েনের ভেতরের জাপানি সেতুটিও আমার কাছে বিশেষ আকর্ষণের। রবীন্দ্রনাথ তার লেখায় এই সেতুর উল্লেখ করেছিলেন। সেতুটির এক পাশে শাপলার পুকুর, অন্য পাশে পদ্মের পুকুর। সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে আমার মনে পড়ে গেল ফ্রান্সের গিভার্নিতে মহান ইমপ্রেশনিস্ট চিত্রশিল্পী ক্লদ মোনের বাড়ির জললিলি পুকুরের ওপর থাকা বিখ্যাত জাপানি সেতুটির কথা। কয়েক বছর আগে সেটি দেখার সুযোগ হয়েছিল। দুটি ভিন্ন দেশের দুটি জায়গা, অথচ জাপানি বাগানশৈলীর এক অদ্ভুত যোগসূত্র যেন খুঁজে পেলাম।
বাগানের লেকের সামনেও কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলাম। রবীন্দ্রনাথ নৌকাবিহার পছন্দ করতেন। ইয়োকোহামায় থাকার সময় এই লেকেও নৌকায় ঘুরেছেন তিনি। তার সেই স্মৃতি ধরে রাখতে স্থানীয় প্রশাসন লেকের মধ্যে কবির ব্যবহৃত মূল নৌকার একটি প্রতিরূপ স্থায়ীভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছে। লেকের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, এই জলরাশির ওপর দিয়েই হয়তো একদিন নৌকায় ভেসে বেড়িয়েছেন কবি।
সানকেইয়েনের পাশাপাশি আমরা ঘুরে দেখেছি ইয়োকোহামার সোওজি-জি মন্দির। ১৯১৬ সালের ১২ জুলাই রবীন্দ্রনাথ এই মন্দির পরিদর্শন করেছিলেন। এটি জাপানের অন্যতম বৃহৎ ও ব্যস্ত বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। মন্দিরের উন্মুক্ত মিলনায়তনে তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও স্থানীয় মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য দিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে এই মন্দির সফরের স্মৃতি প্রতিফলিত হয়েছিল তার বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘ধ্যানী জাপান’-এ।
মন্দিরের সেই উন্মুক্ত মিলনায়তনের সামনে দাঁড়িয়ে কবির বক্তব্য দেওয়ার মুহূর্তটি কল্পনা করছিলাম। এক শতাব্দী আগে যে জায়গায় দাঁড়িয়ে তিনি জাপানের মানুষের সঙ্গে ভাবনার আদান-প্রদান করেছিলেন, আজ সেখানে দাঁড়িয়ে তার স্মৃতির সঙ্গে এক ধরনের আত্মিক সংযোগ অনুভব করলাম।
রবীন্দ্রনাথের জাপান সফর কেবল একটি বিদেশ ভ্রমণ ছিল না। এই সফরের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল নতুন বন্ধুত্ব, শিল্প-সাহিত্যের আদান-প্রদান এবং দুই দেশের সাংস্কৃতিক সম্পর্কের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সানকেইয়েন গার্ডেন ও সোওজি-জি মন্দির ঘুরে সেই ইতিহাসের নানা চিহ্ন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো।
ভ্রমণের আনন্দের পাশাপাশি এমন কিছু জায়গা থাকে, যেখানে পৌঁছালে সময়ের ব্যবধান যেন মুছে যায়। সানকেইয়েনের শোফুকাকু, সেই জাপানি সেতু, লেক কিংবা সোওজি-জি মন্দিরের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ আমার কাছে তেমনই কিছু স্মৃতিময় স্থান হয়ে থাকবে। মনে হবে, এক শতাব্দী আগে রবীন্দ্রনাথ যে পথে হেঁটেছিলেন, যে পরিবেশে সময় কাটিয়েছিলেন, আমরাও তার কিছুটা কাছাকাছি পৌঁছাতে পেরেছিলাম।
চলবে…






