বিশ্বের বিভিন্ন দাপুটে চলচ্চিত্র উৎসবের কল্যাণে বরাবরই চর্চায় থাকে ইরানি সিনেমা! তবে এবার ভিন্ন প্রেক্ষাপটে সারা বিশ্বের নজর কেড়েছে ইরানের সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি! সরকার আরোপিত সীমাবদ্ধতাগুলো সিনেমার মাধ্যমে তুলে ধরায় আইনি ঝামেলায় পড়েছেন সিনেমাগুলোর নির্মাতা-কলাকুশলীরাও।
সর্বশেষ কান চলচ্চিত্র উৎসবে ‘লেইলাস ব্রাদার্স’ ছবিটি প্রদর্শনের দায়ে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক সাঈদ রুস্তাইকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ইরানের একটি আদালত। ‘ইসলামী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিরোধীদের প্রচারণায় অবদান রাখার’ দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয় সাঈদ রুস্তাইকে। তেহরানের অর্থনৈতিক দুর্দশার সঙ্গে লড়াই করা একটি পরিবারের সমৃদ্ধ ও জটিল গল্পে নির্মিত হয়েঝে ‘লেইলাস ব্রাদার্স’। গত বছর ছবিটি মুক্তি পাওয়ার পর থেকে ইরানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলির মধ্যে আরেকটি হল ‘তাফরিঘ’ চলচ্চিত্রের উপর চলমান আইনি লড়াই। সিনেমাটি মুক্তির আগেই নিষিদ্ধ করেছে ইরানের সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়। হিজাব আইন বিরোধিতাকারী অভিনেত্রী তারানেহ আলিদুস্তি সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন বলেই এই সিদ্ধান্ত। এছাড়াও নিষিদ্ধ করা হয়েছে ‘ক্যাবারে’ নামের একটি চলচ্চিত্র।
কেউ কেউ মনে করেন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপরে অদ্ভুত সব আদেশ জারি করা এবং বিদ্রোহে জড়ানো শিল্পীদের সিনেমার ওপরে নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে দেয়ার বিষয়টি বেড়ে গেছে গত বছর মাহশা আমিনীর মৃত্যুর পরে। মাহশার মৃত্যু প্রসঙ্গে সিনেমা সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবাদের কারণেই সরকার এসব বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিচ্ছে সিনেমা শিল্পের ওপরে।
আজাদেহ সামাদি এবং আফসানেহ বায়গানের ওপর সাইকোলজিক্যাল ক্লাস চাপিয়ে দেয়ার মতো ঘটনা, সেই সাথে ‘লেইলাস ব্রাদার্স’ এর পরিচালক সাঈদ রুস্তাইয়ের কারাদণ্ডের শাস্তি সবই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে ইরান সরকারের নিরাপত্তাহীনতার বহিঃপ্রকাশ।
ইরানের গণমাধ্যম ‘ইরানওয়্যার’-কে সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক আলি মোসলেহ বলেন, ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন থেকে উদ্ভূত সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলির মধ্যে একটি ছিল ইরানী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের প্রতিক্রিয়া।
২০১০ এর শুরু দিক থেকেই ইরানের সিনেমার তারকারা সাধারণ জনগণদের থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন। তাদের কাছে শুধুমাত্র চড়া পারিশ্রমিক এবং ট্রেড ইউনিয়নের সুবিধাগুলোই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আলি মোসলেহ-এর মতে, সাম্প্রতিক ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনটি ছিল শিল্পীদের জন্য রিসেট বাটনের মতো। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের সুযোগ ছিল সেটি।
তারকাদের আন্দোলনে পেয়ে জনগণ খুশি হলেও সরকার ভালো ভাবে নেয়নি বিষয়টি। তারকাদের সতর্ক করে দেয়া হয়। তাতেও কাজ না হলে তাদের তলব করা হয়, আটক করা হয়। কাজে বাধা দেয়া হয়। ভ্রমণ সীমাবদ্ধ করা হয়। চলচ্চিত্র নির্মাতারা জনগণের সঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর কারণে তাদেরকে বিভ্রান্তিকর আইনি জটিলতায় ফেলা হয়। সরকারের স্বার্থে আঘাত লাগাই এর পেছনের কারণ বলে মনে করেন মোসলেহ।
মোসলেহ আরও বলেন, ‘চলচ্চিত্র নির্মাতারা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রচারের একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছিলেন। আমির নাদেরি, আব্বাস কিয়ারোস্তামি, আসগর ফরহাদি এবং অন্য নির্মাতারা কয়েক দশক ধরে প্রচার করতেন যে হিজাব একটি সাংস্কৃতিক আচার।’
‘৪০ বছর ধরে চলে আসা নিয়ম মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে এলোমেলো হয়ে যায়। অনেক নারী নির্মাতা ও অভিনেত্রীরা ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলনের শুরুতে হিজাব ত্যাগ করেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন,’ মোসলেহ যোগ করেন।
প্রাক্তন অভিনেত্রী এবং নারী অধিকারের জন্য লড়া আইনজীবী শাঘায়েগ নওরোজিও একই অনুভূতি জানান। তার মতেও, শিল্পীরা আন্দোলনের সাথে নিজেদের জড়াবেন তা কল্পনাও করেনি সরকার। আর একারণেই প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে বিধিনিষেধ চাপানো শুরু করেছে।
ইসলামিক রিপাবলিক পছন্দ করুক বা না করুক, সিনেমা ও থিয়েটার শিল্পীদের সাড়া জাগানো প্রতিক্রিয়া ইরানের নারীদের আন্দোলন এবং দেশের সংস্কৃতিতে দারুণ প্রভাব ফেলেছে।
আগের মতো সরকারের প্রচারের খাতিরে সিনেমা নির্মাণের যুগে ফিরে যাওয়া অসম্ভব বলেই মনে হচ্ছে এখন। সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অনুমতির তোয়াক্কা এখন আর নির্মাতারা করেন না। ২০০০-এর দশকে, জাফর পানাহি এবং মোহাম্মদ রসুলফের মতো বড় নির্মাতারা স্বাধীন ধারার সিনেমার দিকে ঝুঁকেছেন। গত ১০ মাসে উদীয়মান নির্মাতারা তাদের পদাঙ্কই অনুসরণ করেছেন এবং বিদেশী চলচ্চিত্র উৎসবগুলোতে অংশ নিয়ে সেগুলো প্রদর্শন করেছেন।
মোসলেহ বলেন, ‘স্বাধীন ধারার সিনেমা যারা নির্মাণ করছেন তাদের অনেকেই তরুণ, কম পরিচিত। সর্বশেষ উদাহরণ হল আলি আহমেদজাদেহ, যিনি একটি স্বাধীন ধারার সিনেমা দিয়ে লোকার্নো ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের শীর্ষ পুরস্কার জিতেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ছবিগুলো হয়তো বক্স অফিসে ভালো করতে পারে না, ইরানে মুক্তি পায় না। কিন্তু এগুলো ইরানের সিনেমা শিল্প সম্পর্কে বিশ্বের ধারণা বদলে দিয়েছে।’ তার মতে, সরকার বুঝে গিয়েছে যে এই ছবিগুলো মেইনস্ট্রিম ছবির জায়গা নিয়ে নিয়েছে।
সূত্র: ইরানওয়্যার








