কাতার বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডের লড়াই আজই শেষ। আজ রাত ৯টায় মুখোমুখি হবে সাউথ কোরিয়া-পর্তুগাল এবং ঘানা-উরুগুয়ে। রাত ১টায় গ্রুপের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি হবে সার্বিয়া-সুইজারল্যান্ড এবং ক্যামেরুন-ব্রাজিল। প্রথম রাউন্ডের শেষদিকে এসে বিশ্বকাপের পরতে পরতে যেন চমক আর চমক!
সেই চমকে কেউ হাসছে আর কেউ কাঁদছে। কাল বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নিয়েছে গতবারের তৃতীয়ে থাকা শক্তিশালী বেলজিয়াম। আবার মধ্যরাতে স্পেনের বিরুদ্ধে জাপানের দুরন্ত এক জয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে চারবারের বিশ্বকাপজয়ী জার্মানিকে। গ্রুপপর্বে শীর্ষে থেকে দ্বিতীয় রাউন্ড নিশ্চিত করেছে জাপান।
এই বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে সত্যিই সূর্যোদয়ের দেশ জাপান এক অভাবনীয় উদাহরণ তৈরি করে দেখাল। গ্রুপ ‘ই’তে জাপানের সঙ্গী ছিল জার্মানি, কোস্টারিকা এবং স্পেন। সবার ধারণা ছিল কেবল ঈশ্বর সহায়তা করলেই জাপান হয়তো জার্মানি, স্পেনকে টপকে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাবে। কিন্তু ২৩ নভেম্বর প্রথম ম্যাচেই জাপান এই বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট জার্মানিকে ২-১ গোলে হারিয়ে চমকে দেয়। অবশ্য পরের ম্যাচে জাপান ভালো খেলেও কোস্টারিকার কাছে হেরে যায়। এই অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের কারণে জাপানের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা মহা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে যায়। কারণ সর্বশেষ ম্যাচের প্রতিদ্বন্দ্বী স্পেন যে সবদিক দিয়েই এগিয়ে।
স্পেনই জিতবে এমন ভাবনায় অনেকেই আর রাত জেগে খেলা দেখার আগ্রহ বোধ করেননি। কিন্তু মহা চমকের জন্ম দেয় জাপান। প্রথমে গোল খেলেও দ্বিতীয়ার্ধে সামান্য সময়ের ব্যবধানে রিতসু দোয়ান (৪৮ মি.) এবং তানাকা (৫১ মি.) পরপর দুটি গোল করে স্পেনকে আটকে রাখে। টোটাল সময়ে স্পেন জাপানের ২২৮টি ম্যাচের বিপরীতে ১০৫৮টি পাস করেও পরাজয় এড়াতে পারেনি। জাপানের কোচ হাজিমে মোরিয়াসু সত্যিই নতুন এক ইতিহাসের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে জাপানকে খেলতে হবে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে।

বিশ্বকাপ ফুটবলে জাপানের এই নবতরো ইতিহাসকে যথার্থ মনে করছেন সাবেক তারকা ফুটবলার, দীর্ঘদিন জাতীয় দলের ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে খেলা বরুণ বিকাশ দেওয়ান। বরুণ বলেন, জাপানের এই প্রাপ্তি দীর্ঘ পরিকল্পনা ও পরিশ্রমের এক শিল্পিত ও নন্দিত রূপ। জাপান আজ যে সাফল্য পেয়েছে সেই স্বপ্ন তারা বুনেছিল অনেক অনেক আগে। বরুণ নব্বই দশকের প্রারম্ভে জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপ কোয়ালিফাইং ম্যাচ খেলতে জাপানে গিয়েছিলেন।
সেই স্মৃতি মনে করে বলেন, ‘৯৩ সালের ৩০ এপ্রিল জাপানের মুখোমুখি হয়েছিলাম আমরা জাপানের মাঠে। সে ম্যাচে আমরা ১-৪ গোলে হেরে পরাজয় বরণ করি। আমাদের পক্ষে রুমি একমাত্র গোল করেন। সে সময় জাপান দলে ছিল তুখোড় স্ট্রাইকার ইজিয়ুশি মিউরা। সে সময়ই অনুধাবন করেছি ফুটবল নিয়ে তাদের মেগা পরিকল্পনা ও স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন তারা সত্য করতে সক্ষম হয়েছে।’
‘জাপান এবারের ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের উঁচুতে থাকা দুটি শক্তিশালী দলকে পরাজিত করে যে অনবদ্য ইতিহাস তৈরি করল, সেটি তাদের ফুটবলে আরও প্রাণশক্তির সঞ্চার করবে। এশিয়ার দেশ হিসেবে জাপানের এই প্রাপ্তিতে আমি নিজেও ধন্য। স্পেন ও জার্মানিকে একই টুর্নামেন্টে হারানো চাট্টিখানি কথা নয়। বিশ্ব ফুটবলে এই এশিয়ার এই উত্থান খুবই ভালো লাগছে।’

বরুণ আরও বলেন, ‘আশি ও নব্বই দশকে জাপানের সাথে আমাদের ব্যবধান কিন্তু খুব একটা ছিল না। কিন্তু জাপান আজ কোথায়, আর আমাদের ফুটবল কোথায়? সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, একনিষ্ঠতার কারণেই জাপানে আজ নতুন সূর্য উদিত হল। নতুন রূপে জাপান আজ হৈচৈ ফেলে দিয়েছে। চূর্ণ করে দিয়েছে ইউরোপিয়ানদের গৌরব। আমি মনে করি দ্বিতীয় রাউন্ডেও জাপান অনেক বড় ফাইট দিবে। সেই আত্মবিশ্বাস, সেই লড়াকু মনোভাব তাদের আরও দৃঢ় হয়েছে। জাপান তাই আরও চমক জাগানিয়া ফলাফল বের করে আনবে।’
বরুণ বিকাশ দেওয়ান এবারের বিশ্বকাপের ট্রফির লড়াই-এ নানান পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করেন। তার মতে, ‘কেবল কাউকে কাউকে সামনে এগিয়ে রাখার ভাবনা এখন ছোট হয়ে এসেছে। দলগুলোর মধ্যে খেলার মানের ব্যবধান কমে এসেছে অনেক। ফলে কেউ বলতে পারবে না কে জয়ী হবে। ছোট দল হিসেবে যাদের আখ্যায়িত করা হয় বা বলা হয় তারা কিন্তু বড় দলগুলোর সাথে লড়ছে সমান তালে। মরক্কোর কথাই ধরা যাক। তারা প্রমাণ করেছে যে কাউকে হারিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা আছে।’
‘আবার এশিয়ার কাতার ছাড়া সব টিমই প্রমাণ করেছে যেকোনো শক্তিকে তারা চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এই যে নতুন ডাইমেনশন, নতুন এক রঙের উত্থান- এবারের বিশ্বকাপকে কেবলই রোমাঞ্চিত করছে। এই রোমাঞ্চ মনে হয় আরও জমে উঠবে। আর তাই শেষ দেখা ছাড়া কিছু বলার নেই।’
সৌদি আরব, সাউথ কোরিয়ার খেলাও বরুণের অনেক ভালো লেগেছে। বরুণ বিকাশ দেওয়ানের প্রিয় টিম ব্রাজিল। আর ফুটবল আদর্শ ব্রাজিলের সাবেক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার দুঙ্গা। বললেন, ‘কাজী সালাউদ্দিন ভাই দুঙ্গাকে দেখেই এই পজিশনে আমাকে তৈরি করেছিলেন। দুঙ্গাকে সবসময় ফলো করতাম। শেষ পর্যন্ত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবেই মাঠে থেকেছি।’
আজ ক্যামেরুন ও ব্রাজিলের ম্যাচে চোখ রাখবেন বরুণ। তার ভাষায় ব্রাজিল সব দিক দিয়ে এগিয়ে থাকলেও ক্যামেরুন তো বরাবরই মাঠে নাছোড়বান্দা। পরাজয়কে মানতে চায় না, শেষ মিনিট পর্যন্ত লড়াই করে। কিন্তু ব্রাজিলের বড় শক্তি কৌশল। তবু ব্রাজিলকে অনেক অনেক পরীক্ষা দিতে হবে। কেননা ক্যামেরুন আজ জাপানকেই বুকে ধারণ করবে বলে আমার বিশ্বাস। জাপান পারলে তারাও পারবে- এমন উপলব্ধি থেকে সরবে না। ব্রাজিল-ক্যামেরুন ম্যাচ হতে পারে প্রাণময় এক ম্যাচ।








