ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুরু হতে বাকি সবে ২৮ দিন। প্রথমবার তিন দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো যৌথ আয়োজন করতে চলেছে গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। তিন দেশের ১৬ স্টেডিয়ামে হবে ১০৪ ম্যাচ। যে ভেন্যুগুলোতে আছে আনুধিকতার পাশাপাশি ঐতিহ্যের ছোঁয়া।
মেক্সিকোর ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে থেকে শুরু হয়ে সমাপ্তি হবে যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। আরও একবার ফুটবলীয় মহাযজ্ঞের সাক্ষী হতে চলেছে মেক্সিকো। টিভিতে যে দেশটিকে দেখানো হয় মাদক চোরাচালান কার্টেলদের স্বর্গরাজ্য হিসেবে। এবার তাকে আরও একবার নতুনভাবে চিনবে বিশ্ব। তৃতীয়বার বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চলেছে দেশটি। যেখানে তিনটি ভেন্যুতে হবে ১৩ ম্যাচ।
একটি ফুটবল মাঠ কখনোই শুধু কংক্রিটের এক প্রাণহীন খণ্ড নয়। আজতেকা স্টেডিয়াম তো একেবারেই নয়। এস্তাদিও আজতেকা বা আজতেকা স্টেডিয়ামের চেয়ে বেশি বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজন করার সৌভাগ্য হয়নি বিশ্বের অন্যকোন ভেন্যুর। এটি একমাত্র স্টেডিয়াম যেখানে পেলে এবং ম্যারাডোনা উভয়েই বিশ্বকাপ জিতেছেন। তৃতীয়বার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজন করতে চলেছে মাঠটি।

১৯৭০ সালে ফাইনালে ইতালিকে হারিয়ে পেলে আর ১৯৮৬ সালে একই মাঠে ওয়েস্ট জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতেছিল ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল ছাড়াও এ দুই বিশ্বকাপ মিলিয়ে আরও ১৭টি ম্যাচ হয়েছে বিখ্যাত স্টেডিয়ামটিতে। ২০২৬ বিশ্বকাপের মোট ৫টি ম্যাচ হবে ৮৩ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এ স্টেডিয়ামে। বিশ্বকাপ কেন্দ্র করে পুনর্গঠন করে মার্চে স্টেডিয়ামটি আবারও খুলে দেয়া হয়েছে।
৪৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার মেক্সিকোর আরেক স্টেডিয়াম এস্তাদিও গুয়াদালাহারা বা এস্তাদিও অ্যাক্রন বিখ্যাত আগ্নেয়গিরি সাদৃশ্য গোলাকার নকশার জন্য। মেক্সিকোর সাপোপানে অবস্থিত একটি অত্যাধুনিক ফুটবল স্টেডিয়াম, যেখানে হবে ৪ ম্যাচ। এটি মেক্সিকোর সাংস্কৃতিক রাজধানী গুয়াদালাহারার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ২০১০ সালে উদ্বোধন হওয়া স্টেডিয়ামটি মেক্সিকান ক্লাব সি. ডি. গুয়াদালাহারার হোম গ্রাউন্ড। বিশ্বকাপের জন্য ফিফা মান অনুসারে অভ্যন্তরীণ সুবিধা, হসপিটালিটি এলাকা ও মাঠ উন্নয়নে খরচ করেছে প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার।

মন্টেরের গুয়াদালুপে অবস্থিত ৫৩ হাজার ধারণক্ষমতার দেশটির আরেকটি স্টেডিয়াম এস্তাদিও বিবিভিএ, বসবে বিশ্বকাপের ৪টি ম্যাচ। স্টেডিয়ামটি অসাধারণ প্রাকৃতিক দৃশ্যের জন্য বিখ্যাত। কারণ গ্যালারির একটি নির্দিষ্ট অংশ থেকে দর্শকরা উপভোগ করতে পারবেন সেরো দে লা সিল্লা নামক বিশাল পর্বতের অপূর্ব দৃশ্য। যা একে এনে দিয়েছে পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর ভেন্যুর তকমা।
কানাডা প্রথমবার আয়োজন করতে চলেছে বিশ্বকাপ। টরেন্টোর বিএমও ফিল্ডে ৬ ও বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার স্টেডিয়ামে ৭টি ম্যাচ মিলিয়ে ১৩ ম্যাচ বসবে বরফের দেশটিতে। টরেন্টোর লেকফ্রন্টের এক্সিবিশন প্লেসে অবস্থিত টরেন্টো স্টেডিয়াম বা বিএমও ফিল্ড স্টেডিয়ামটি বিশ্বকাপে সবচেয়ে ছোট ধারণক্ষমতার ভেন্যু হিসেবে পরিচিত হবে। সাধারণত প্রায় ২৮ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার স্টেডিয়ামটিকে বিশ্বকাপের জন্য বিশেষভাবে সম্প্রসারণ করা হয়েছে।

স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষ ১৭ হাজারের বেশি অস্থায়ী আসন যোগ করেছে। এখানে ম্যাচ দেখতে পারবেন ৪৫ হাজার দর্শক। প্রায় ১৫০ মিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার খরচ করে নতুন হসপিটালিটি এরিয়া, ভিআইপি লাউঞ্জ, রুফটপ প্যাটিও ও আধুনিক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। রেনোভেশন কাজ মার্চ ২০২৬এ সম্পন্ন হয়েছে। শেষ বত্রিশের একটি ম্যাচসহ মোট ৬ ম্যাচ হবে এই স্টেডিয়ামে।
পশ্চিম উপকূলের ভ্যাঙ্কুভারে অবস্থিত বিসি প্লেস ভ্যাঙ্কুভার আইকনিক স্টেডিয়াম রিট্র্যাক্টেবল ছাদের জন্য বিখ্যাত। ফলস ক্রিকের তীরে অবস্থিত। এর অবস্থান দর্শকদের দেবে অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা। এখানে ম্যাচ হবে ৭টি। ধারণক্ষমতা ৫৪,৫০০।
এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ১১ স্টেডিয়াম হবে মোট ৭৮টি ম্যাচ। সবচেয়ে বড় স্টেডিয়াম ডালাসের এটিএন্ডটি, হবে সেমিফাইনালসহ সর্বোচ্চ ৯ ম্যাচ। ধারণক্ষমতা ৯৩ হাজার।

জর্জিয়ার আটলান্টায় মার্সেডিজ ব্রেঞ্জ স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা ৭৫ হাজার। অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামটি নকশা ও দর্শকবান্ধব সুবিধার জন্য প্রশংসিত। একটি সেমিফাইনালসহ ৮ ম্যাচ হবে ভেন্যুটিতে।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্টেডিয়ামের মধ্যে ৭৩ হাজার ধারণক্ষমতার কানসাস সিটির অ্যারোহেড স্টেডিয়াম। ৭২ হাজার ধারণক্ষমতার হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়াম। ৭০ হাজার ধারণক্ষমতার লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়াম। ৬৬ হাজার ধারণক্ষমতার মিয়ামি হার্ড রক স্টেডিয়াম। ৬৫ হাজার ধারণক্ষমতার বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়াম। ৬৭ হাজার ধারণক্ষমতার ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম। ৬৮ হাজার ধারণক্ষমতার সান ফ্রান্সিসকোর বে এরিয়া স্টেডিয়াম বা লেভিস স্টেডিয়াম। ৬৮ হাজার ধারণক্ষমতার সিয়াটলের লুমেন ফিল্ড আছে।
১১ জুন শুরু হতে চলা বিশ্বকাপের পর্দা নামবে ১৯ জুলাই। আসরের ফাইনাল বসবে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। এখানে মোট ৮ ম্যাচ হবে, যার ৫টি গ্রুপ পর্ব, একটি শেষ বত্রিশের, একটি শেষ ষোলো এবং ফাইনাল অনুষ্ঠিত হবে। স্টেডিয়ামের ধারণক্ষমতা প্রায় ৮৯ হাজার ৫০০।

এবারের বিশ্বকাপ শুধু খেলা নয়, তিন দেশের ফুটবল ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও উন্মাদনার মিলনমেলা। ১৬টি ভেন্যু মিলিয়ে এটি হবে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও ব্যয়বহুল বিশ্বকাপ আয়োজন। এজন্য অপেক্ষায় থাকতে হবে আরও কিছুদিন।








