বিশ্বকাপে গ্রুপপর্বে প্রতিটি দলের বাকি একটি করে ম্যাচ। যেখানে সূচিতে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, প্রতিটি গ্রুপের শেষ সব ম্যাচ একই সাথে গড়াবে। যা চলে আসছে বছরের পর বছর ধরে, প্রতিটি ফুটবল টুর্নামেন্টে। কিন্তু কেন গ্রুপপর্বে একই গ্রুপের শেষ ম্যাচ একসাথে হয়? পেছনে আছে কলঙ্কিত এক ইতিহাস, যা ‘ডিসগ্রেস অব গিহন’ তথা ‘গিহন কলঙ্ক’ হিসেবে পরিচিত।
ইতিমধ্যে তিনের দুই আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো, জার্মানি, আর্জেন্টিনাসহ ৭ দেশ নকআউটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। গ্রুপপর্বে প্রথম দুটি রাউন্ডে ম্যাচ আলাদা সময়ে খেলা হয়। প্রতিটি গ্রুপের শেষ রাউন্ড যে একই দিনে একই সময়ে শুরু হয়, তা চার দশকেরও বেশি আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কারণে।
এই প্রথাটি, বিশ্বকাপ এবং অন্যান্য ফুটবল কাপের খেলার একটি সাধারণ অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত একটি ম্যাচের পর চালু করা হয়েছিল এ নিয়ম। যার সূত্রপাত ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে।
১৯৮২ বিশ্বকাপে, গ্রুপপর্বে আলজেরিয়া এবং চিলির ম্যাচ শেষ হয় একদিন আগে। পরেরদিন ওয়েস্ট জার্মানি এবং অস্ট্রিয়ার মধ্যে গ্রুপে দ্বিতীয় ম্যাচ। আগের ম্যাচের ফলাফল জানা থাকায়, পরের পর্বে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সমীকরণ সম্পর্কে উভয় ইউরোপীয় দলই অবগত ছিল। গ্রুপের শীর্ষে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়ার পয়েন্ট সমান ৪ ছিল। অন্যদিকে ওয়েস্ট জার্মানির একটি জয় ও একটি হারের পর পয়েন্ট ছিল ২, সেই হারটি ছিল আলজেরিয়ার বিপক্ষেই। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ওয়েস্ট জার্মানি যদি ২ কিংবা ১ গোলে জয় পায়, আলজেরিয়া বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেবে, এবং দুটি ইউরোপীয় দেশই পরের পর্বে খেলার টিকিট কাটবে, এমন ছিল সমীকরণ।
গিহনের এল মোলিনন স্টেডিয়ামে ম্যাচের দশ মিনিটে হর্স্ট হ্রুবেশের গোলে পশ্চিম জার্মানি এগিয়ে যায়। ঠিক এটি ছিল উভয় দলের জন্যই সুবিধাজনক। এরপর থেকেই মাঠের দর্শক থেকে শুরু করে রেফারি, ধারাভাষ্যকার সবার চোখে একটি বিষয় ধরা পড়ে, যা ছিল খেলোয়াড়দের মনোভাব। কোন দল ম্যাচজুড়ে আর কোন আক্রমণ চালায়নি। যখন যে দলের পায়ে বল যাচ্ছিল, তখন সেই দলের খেলোয়াড়রা একে অপরকে শুধু পাস দিচ্ছিলেন। এভাবে শেষ হয় ম্যাচ। ওয়েস্ট জার্মানি ১-০ গোলে জেতে, ফলে অস্ট্রিয়াকে সঙ্গী করে পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট কাটে এবং আলজেরিয়া বাদ পড়ে যায়।

এ ম্যাচ পরে ‘গিহনের কলঙ্ক’ নামে পরিচিতি পায় এবং বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত ম্যাচগুলোর মধ্যে একটি হিসেবে রয়ে যায়। তবে কোন দলই ফিফার কোন নীতিমালা ভঙ্গ করেনি, বা ম্যাচে এমনকিছু ঘটেনি যেটা সরাসরি ফিফার মূলনীতির বিপরীতে যায়।

আলজেরিয়ানদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও, ফিফা রায় দেয় যে কোন নিয়ম ভঙ্গ করা হয়নি এবং ফলাফল বাতিল করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর প্রতিক্রিয়া এতটাই তীব্র ছিল যে, ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতি প্রতিরোধের জন্য একটি বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। সেটি হল বর্তমানে প্রচলিত গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচে একই গ্রুপের সব দল একই সময় খেলবে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপ থেকে গ্রুপপর্বের শেষ ম্যাচ একই সাথে খেলা হচ্ছে, যা নিশ্চিত করে যে দলগুলো আগের কোন খেলার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে কৌশল নির্ধারণ করতে পারবে না।
খেলাটি পরিচালনা করা রেফারি বব ভ্যালেন্টাইন ২০২২ সালে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘খেলা শুরু হওয়ার প্রায় ২০ মিনিট পর থেকে আমার কিছুটা অন্যরকম অনুভূতি হতে শুরু করে। আঁচ করতে পারছিলাম কোন সমস্যা ঝামেলা আছে এখানে।’







