এই বিশ্বকাপের এক চমকপ্রদ গল্প আফ্রিকার দ্বীপদেশ কেপ ভার্দে। গ্রুপ এইচ থেকে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠে দেশটি প্রমাণ করেছে ইচ্ছেশক্তি কতদূরে নিয়ে যেতে পারে। মাত্র ৫ লাখ মানুষের দেশ হওয়া সত্ত্বেও, তাদের ফুটবল দল গ্রুপপর্বের প্রথম দুই ম্যাচে ফুটবলের পরাশক্তি স্পেন ও উরুগুয়ের বিপক্ষে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। আজ শেষ ম্যাচে সৌদি আরবকে হারাতে পারলে এই দেশটির ফুটবল ইতিহাস আরও আলোকিত হতো। কিন্তু ড্র করেই সন্তষ্ট থাকতে হয়েছে। শেষপর্যন্ত অপরাজিত থেকে রানার্সআপ হয়ে দ্বিতীয় পর্বে ওঠার গৌরব অর্জন করেছে। এইতো কিছুদিন আগেও এই দেশের নাম কেউ জানতো না। কিন্তু ফুটবল তাদেরকে সারাবিশ্বে পরিচয় করে দিয়েছে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসেই দেশটি রীতিমতো বাজিমাত করেছে।
এদিকে কেপ ভার্দের মতো আজকের দিনটিও আনন্দময় হতে পারত ইরানের জন্য। কিন্ত তা হয়নি। গ্রুপ ‘জি’ থেকে বেলজিয়াম এবং মিশরের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা নিশ্চিত হয়েছে। ইরান এই গ্রুপে অপরাজিত হয়ে তৃতীয় স্থানে। কিন্ত আগামীকালের ফলাফলের উপর তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়া নির্ভর করছে। আজ ইরানের দুভার্গ্যই বলা যায়। খেলার ৫ মিনিটের সময় মিশর এগিয়ে গেলেও ৬ মিনিটে পেনাল্টি পায় ইরান। কিন্তু মেহদি তারেমি পেনাল্টি মিস করেন। অবশ্য এর কয়েক মিনিট পরেই অর্থাৎ, ১৪ মিনিটের সময় ইরানের রেজিয়ায়িন গোল শোধ করে ইরানকে উজ্জ্বীবিত করেন। এরপর দুপক্ষই গোল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। শেষদিকে ইরান বিশাল চাপ তৈরি করে।
এই ম্যাচের নাটকীয় সমাপ্তি হতে পারত। কেননা ইরানের সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে খেলার যোগ করা সময়ে। তুমুল এক আক্রমণ থেকে ইরানের শোজা খলিলজাদেহ গোল করেন, যা ইরানকে সরাসরি নকআউটে তুলে দেওয়া প্রতিধ্বনিত করে। কিন্তু ভিএআর পর্যালোচনার পর অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়ে যায়। খেলা শেষে তাই ইরানের খেলোয়াড়দের কাঁদতে দেখা যায়। এখন ইরানের নকআউটে ওঠার ভাগ্য সম্পূর্ণভাবে অন্য গ্রুপগুলোর ফলাফলের উপর নির্ভর করছে।
দেশের জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার কাজী কামাল বলছিলেন, ‘এবার বিশ্বকাপে আসা নতুন টিম এবং ছোট টিমগুলো দুর্দান্ত পারফর্ম করেছে। বিশেষ করে আফ্রিকার কেপ ভার্দে, এই অচেনা অজানা দেশটি এখন ফুটবলের কারণেই বিশ্বময় পরিচিত হয়ে উঠেছে। এই দেশকে কেউ চিনতো না। কিন্তু ফুটবল তাদেরকে গৌরোবান্বিত করেছে। কাজী কামাল ইরানের খেলাকেও খুব পজিটিভলি দেখছেন। তার মতে, একটি দেশ যুদ্ধের নির্মমতা আর নানান নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে যেভাবে প্রথম পর্ব শেষ করল, সেটি নিঃসন্দেহে গৌরবের। তবে ইরান সরাসরি দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে পারলে সেটা হতো আরও মর্যাদার। কিন্তু দুর্ভাগ্য তাদের। আজকের ম্যাচে ভাগ্যের সহায়তা তারা পায়নি। হয়ত ইরানকে দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতেও দেওয়া হবে না, এমনটিও হতে পারে।’
কাজী কামাল আশির দশকের নামকরা লেফট ব্যাক। আবাহনী ও মোহামেডানের হয়ে সেই ফুটবলের সোনালী দিনে মাঠ মাতিয়েছেন। জাতীয় দলের হয়েও খেলেছেন দীর্ঘদিন। পরিশ্রমী লেফট ব্যাক হিসেবে খ্যাত ছিলেন। কলাবাগানে থাকেন। কাজী কামাল বরাবরই ব্রাজিলের সমর্থক। একসময় ব্রাজিলের রোনাল্ডো ও রোনালদিনহো খুব পছন্দ করতেন। তাদের খেলা এনজয় করতেন। কিন্তু এখন মেসিই তার চোখে সেরা ফুটবলার।
কাজী কামাল বললেন, ‘বয়স হলেও মেসি মাঠে অনবদ্য। দারুণ খেলছেন। মাঠে মনে হয় মাঝে মাঝে হাঁটাহাঁটি করছেন। কোন চাপ নেই। কিন্তু পায়ে বল পাওয়ার পর পরই গোল দেওয়া ও গোল তৈরি করার যে স্টাইল সেটা ভীষণ মনোমুগ্ধকর। ছেড়েফুঁড়ে বের হওয়ার প্রবণতা তার। এখানেই মনে হয়েছে সে অন্যগ্রহের। সামনের ম্যাচে মেসিকে আরও আগ্রাসী দেখা যাবে। মেসি থামবে বলে মনে হয় না।’
বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন প্রসঙ্গে কাজী কামালের পর্যবেক্ষণ হল- দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে সবকিছু স্পষ্ট হবে। দ্বিতীয় রাউন্ডে বড় দলগুলো আরও গুছিয়ে খেলবে। সেসময় ছোট দলগুলো ব্যাকফুটে চলে যাবে। বললেন, ‘এবার কে চ্যাম্পিয়ন হবে বলা যেমন কঠিন তেমনি এটাও সত্য, বিগত দিনের চ্যাম্পিয়নরাই অবশেষে ফাইনালে যাবে। এর বাইরে মধ্য ও নিচের দলগুলো তেমন কিছু করতে পারবে না। তবে হ্যাঁ, এবার অনেক অঘটন ঘটবে। ব্রাজিলের ধাপে ধাপে উত্থান পজিটিভ মনে হয়েছে।’
দ্বিতীয় রাউন্ডে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ জাপান না হলে কাজী কামাল খুব খুশি হতেন। বললেন, ‘এশিয়ার এই দেশটি অনেক ভালো খেলছে। কিন্তু ব্রাজিলের সাথে পেরে ওঠা অত্যন্ত কঠিন কাজ।’







