ফুটবলে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর নিয়ে প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কিংবা ফুটবল বিশ্বকাপে বিতর্ক লেগেই থাকছে। ১০৪ ম্যাচের বড় মহাযজ্ঞে সিদ্ধান্তগুলো কীভাবে নেয়া হচ্ছে এবং সেগুলো সঠিক হচ্ছে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গতরাতে সেরা ষোলোয় আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। অ্যান্ডি ডেভিস একজন ইংলিশ রেফারি, যিনি ব্যাখ্যা করলেন সিদ্ধান্তগুলো আসলেই বিতর্কিত ছিল কিনা।
আসরের কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিতের পথে আর্জেন্টিনা-মিশরের ম্যাচটি দিয়ে, ভিএআর প্রোটোকল এবং খেলার আইনের উভয় দিকের প্রক্রিয়ার পরীক্ষা ও ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করা যাক। অ্যান্ডি ডেভিস একজন সাবেক সিলেক্ট গ্রুপ রেফারি, যিনি প্রিমিয়ার লিগ এবং চ্যাম্পিয়নশিপ জুড়ে ১২টিরও বেশি মৌসুম ধরে এলিট তালিকায় কাজ করেছেন। এলিট স্তরে ব্যাপক অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি প্রিমিয়ার লিগে ভিএআরের ক্ষেত্রে কাজ করেছেন। বিশ্বকাপের ম্যাচে যে প্রক্রিয়ায় ভিএআর কাজ করে, তাকে কেন্দ্র করে গতরাতের ম্যাচ পর্যালোচনায় তিনি সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়েছেন।
মিশর এবং আর্জেন্টিনার ম্যাচে যা ঘটেছিল, সেটা পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে গভীরভাবে। মিশরীয় মোস্তফা জিকো ৫৮ মিনিটে এক অবিশ্বাস্য গোল করে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে দলকে ২-০ গোলের লিড এনে দিয়েছিলেন। তবে ভিএআরের হস্তক্ষেপে, গোলটি বাতিল করা হয়। কারণ গোল হওয়ার আগে মিশরীয় ডিফেন্ডার মারওয়ান আতেয়া আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করেছিলেন। গোল হওয়ার আগে ফাউল হওয়ায় মূলত গোলটি বাতিল করে দেয়া হয়।
ভিএআর পর্যালোচনা অনুযায়ী, গোল হওয়ার আগে আতেয়ার করা একটি সম্ভাব্য ফাউলের জন্য ভিএআর দ্রুত মাঠেই পর্যালোচনার সুপারিশ করে। কারণ তিনি একই সাথে লিসান্দ্রোর জার্সি ধরে রেখেছিলেন এবং পায়ে বুট দিয়ে চেপে দাঁড়িয়েছিলেন। পর্যালোচনা শেষে ফরাসি রেফারি ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির সিদ্ধান্তের সাথে একমত হন এবং গোল বাতিল করে দেন।
ভিএআরের হস্তক্ষেপ সঠিক ছিল এবং এ গোলটি বাতিল করার সিদ্ধান্তটিও যথাযথ ছিল। মিশরের আতেয়ার করা ফাউল, তাদের পাল্টা আক্রমণে গোল করায় সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। ফলে আক্রমণাত্মক অবস্থানে থেকেও আর্জেন্টিনা অসুবিধাজনক পরিস্থিতিতে পড়ে গিয়েছিল। সাধারণত খেলোয়াড়ের পায়ে বুটচাপা দিলে বা জার্সি ধরে টেনে ফেলে দিয়ে বল কেড়ে নিলে ফাউল গণ্য হয়। এধরনের ফাউলে সরাসরি গোল হলে, সেটা বাতিল করা অনিবার্য।
ম্যাচের শেষদিকে মিশর দুটি পৃথক ফাউলের আবেদন জানায়। যার মধ্যে একটি ঘটেছিল দ্বিতীয়ার্ধের অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আর্জেন্টিনার গোল করার ঠিক আগে। দুটি ঘটনাই আর্জেন্টিনার ডি-বক্স এলাকায় ঘটেছিল। আর্জেন্টিনার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার পেনাল্টি অঞ্চলে মিশরের হামদি ফাথিকে ধরে ফেললে মিশরীয় ডিফেন্ডার মাটিতে পড়ে যান। রেফারি কোন ফাউলের সিদ্ধান্ত দেননি সেক্ষেত্রে। এছাড়া, ম্যাচের শেষ মুহূর্তে মোহাম্মেদ সালাহ দাবি করেন, আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে আক্রমণ করার সময় তাকে জুলিয়ান আলভারেজ ফাউল করেছেন। কিন্তু আবারও, রেফারি মনে করেননি যে কাজটি ফাউলের পর্যায়ে পড়ে।
ভিএআর বিষয়টি যাচাই করে মাঠে রেফারির উভয় সিদ্ধান্তকেই সঠিক বলে ঘোষণা করেছে। ভিএআর পর্যালোচনা অনুযায়ী, মাঠের যে স্থানে ম্যাক অ্যালিস্টারের প্রাথমিক ঘটনাটি ঘটেছিল, সেটি একটি দ্বৈত পরিস্থিতি তৈরি করে। যেকোনো ইতিবাচক হস্তক্ষেপের ফলে একদিকে যেমন আর্জেন্টিনার গোলটি বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তেমনই মাঠের বিপরীত প্রান্তে একটি পেনাল্টিও দেয়া হতে পারত। আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের খেলোয়াড়দের তুলনামূলক তৎপরতা, এবং উভয় সিদ্ধান্ত যাচাই করে বাতিল করা হয়েছিল। বিবেচনা করে ভিএআর এই বিষয়ে সন্তুষ্ট ছিল যে, কোনটিই হস্তক্ষেপের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেনি।
এছাড়া বল ছাড়া অবস্থায় ফাথির জার্সি ধরে অ্যালিস্টার একটি ঝুঁকি নিয়েছিলেন। যা ছিল সামান্য, দীর্ঘস্থায়ী ছিল না এবং মিশরের বলের দখল নেয়ার ক্ষমতার উপর এর কোন উল্লেখযোগ্য প্রভাবও পড়েনি। সেক্ষেত্রে এটি গুরুতর ফাউল এবং পেনাল্টি কিকের জন্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ করেনি।
একইভাবে, সালাহকে পেনাল্টি না দেয়ার সিদ্ধান্তটিও একই ছিল। আলভারেজের চ্যালেঞ্জটি ফাউল ছিল না। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, ডিফেন্ডারের কাছ থেকে একটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ প্রত্যাশা করা হয়, এবং এ সংঘর্ষের ধরনটি ছিল বুটের সাথে বুটের সংঘর্ষ, যেখানে সালাহ মাটিতে পড়ে গিয়েছিলেন।
মিশরের গোলটির আগে দেয়া ফাউলটির সাথে এর তুলনা করা হয়েছে। তবে মূল পার্থক্য হল, আগের ঘটনাটিতে মিশরের খেলোয়াড়ের বুট আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়ের বুটের ওপর চাপা দেয়া হয়েছিল। সালাহর ঘটনাটি বিস্তারিতভাবে দেখলে বোঝা যায়, এটি বুটের সাথে বুটের সংঘর্ষ, যেখানে উভয় খেলোয়াড়ের গতিই এই সংস্পর্শ তৈরি করেছে, বরং এখানে একজনের বুট আরেকজনের বুটের উপর চাপা দেননি।
ম্যাচে আর্জেন্টিনা ৮০ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও দুর্দান্ত এক প্রত্যাবর্তনে জয় তুলে নেয়। ম্যাচের ১৫ মিনিটে ইয়াসির ইব্রাহিমের গোলে লিড পেয়েছিল মিশর, ৬৭ মিনিটে জিকোর গোলে ব্যবধান দিগুণ করে তারা। তবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ৩-২ গোলে ম্যাচ জিতে নেয়। ৭৯ মিনিটে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, ৮৪ মিনিটে লিওনেল মেসি এবং ৯০ মিনিটের পর যোগ করা সময়ে তৃতীয় মিনিটে এনজো ফের্নান্দেজ গোল করেন। ম্যাচ শেষে মিশরের খেলোয়াড়রা এবং কোচ কড়া ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ম্যাচ পাতানো ছিল দাবি করেছেন!







