মায়ের সঙ্গে ভাইকে দেখতে ভারতের ত্রিপুরায় যাওয়ার সময় বিএসএফ-এর গুলিতে মারা যান ১৪ বছর বয়সী স্বর্ণা দাস। পতাকা বৈঠক করে লাশ ফেরত আনা হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশের তরফ থেকে হত্যাকাণ্ডের শক্ত কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি।
নিহত স্বর্ণা মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের কালনীগড় গ্রামের বাসিন্দা পরেন্দ্র দাসের মেয়ে। সে স্থানীয় নিরোদ বিহারী উচ্চবিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়তো।
স্বর্ণার ভাই পিন্টু দাস বলেন, মা আর বোনের সীমান্তের ওপারে যাওয়ার কথা ছিল না। আমার বড় ভাই সকালে সীমান্তে এসে তাদের সঙ্গে দেখা করার কথা ছিল। কিন্তু দালালদের চাপে পড়ে মা আর বোন রাতের আঁধারে সীমান্তে গিয়েছিল। আমার বোন প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু দালালরা সেটা শোনেনি। সীমান্ত এলাকায় বাংলাদেশের ভেতরেই আমার বোনকে গুলি করা হয়েছে। মা তখন পাশে একটি ডোবায় ঝাঁপ দিয়ে প্রাণে বাঁচেন। বোনই তাকে ডোবার মধ্যে ঝাঁপ দিতে বলেছিল বলে মা আমাদের জানিয়েছেন।
পিন্টু জানিয়েছেন, তার মা সঞ্জিতা রানী দাস এখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। তাকে ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। বাবা পরেন্দ্র দাসও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সন্তানের লাশ নিয়ে আসার চেষ্টা করেছিলেন মা। কিন্তু জ্ঞান হারানোর কারণে লাশ নিয়ে আসতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘আমার মামা আর বড় ভাই ত্রিপুরায় বসবাস করে। মা আর বোন দুই দালালের সহযোগিতায় লালারচক সীমান্তে তাদের দেখতে গিয়েছিলেন৷
জানা গেছে, তাদের সঙ্গে আরও ছিলেন চট্টগ্রামের এক দম্পতি। রাত ৯টার দিকে তারা ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে গেলে বিএসএফ সদস্যরা গুলি চালান। এতে ঘটনাস্থলেই স্বর্ণা নিহত হয় এবং চট্টগ্রামের দম্পতি আহত হয়। সেই দম্পতিকে চিকিৎসার জন্য সিলেটের এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
হত্যাকাণ্ডের দুই দিন পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় কুলাউড়া উপজেলার চাতলাপুর চেকপোস্ট দিয়ে স্বর্ণার লাশ হস্তান্তর করে বিএসএফ। পিন্টু জানিয়েছেন, তারা চার ভাই বোন। তার বড় এক ভাই দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ত্রিপুরায় থাকেন। ওই ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েই মা আর বোন গুলির মুখে পড়েন।
স্বর্ণার হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিবাদের কথা জানা যায়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিষয়টি মিডিয়ায় দেখার পর আমরা প্রতিবাদ করেছি। এভাবে নিরীহ মানুষকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদ জানানোর জন্য আমরা সরকারকে বলেছি। সরকারের উচিত হবে এ ব্যাপারে শক্ত প্রতিবাদ করা, যাতে এমন ঘটনা আর না ঘটে।
১৫ বছর বয়সী ফেলানী খাতুন বিএসএফ-এর গুলিতে প্রাণ হারায় ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে। সেই ঘটনার সাড়ে ১৩ বছর পর স্বর্ণাকে গুলি করে হত্যা করা হলো। ফেলানী কুড়িগ্রামের অনন্তপুর সীমান্ত দিয়ে তার বাবার সঙ্গে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরছিল আর স্বর্ণা দাস মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্ত দিয়ে তার মায়ের সঙ্গে ভারতের ত্রিপুরায় অভিবাসী ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছিল।
ফেলানী হত্যাকাণ্ডের পর তার লাশ দীর্ঘ সময় ঝুলে ছিল কাঁটাতারের বেড়ায় কাঁটাতারে ঝুলে থাকা কিশোরী ফেলানীর লাশ প্রবল আলোড়ন তুলেছিল দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে। কিন্তু এ রকম আলোড়নের পরও শাস্তি হয়নি ফেলানীকে হত্যাকারী বিএসএফ সদস্যের। বিএসএফের আদালত তাকে বেকসুর খালাস দেয়। এরপর মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্টে গড়ালেও অপরাধীর কঠোর সাজা হয়নি।
তাহলে সীমান্তে এই ধরনের হত্যা বন্ধের বিষয়ে আলোচনা সম্পর্কে ফেলানী-হত্যা মামলার আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোর্তিময় বড়ুয়া বলেন, আমার মনে হয়, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এখনো ঠিক করতে পারেনি তাদের কোনটা আগে করা প্রয়োজন। ঠিক আছে, এক্ষুনি প্রতিবাদ করেনি, কিন্তু এই ঘটনায় তাদের শক্ত প্রতিবাদ জানানো উচিত। বিগত সরকার নানা ধরনের বাহানায় এসব হত্যাকাণ্ডে কোনো প্রতিবাদ করেনি। এটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য অসম্মানের। আন্তর্জাতিক নানা জায়গায় এ বিষয়ে আমাদের সোচ্চার হওয়ার সুযোগ আছে। বিশ্বের যেসব দেশের সঙ্গে স্থল সীমান্ত আছে, সেখানে সীমান্ত দিয়ে একটু আধটু মানুষ আসা যাওয়া করে। কিন্তু কোথাও নিরস্ত্র মানুষকে এভাবে গুলি করে মারা হয় না।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) প্রায় নিয়মিতই সীমান্তে গুলি চালিয়ে বাংলাদেশীদের হত্যা করছে। দুই বৈরী প্রতিবেশী দেশের সীমান্তে গোলাগুলি কিংবা হত্যাকাণ্ড বিরল নয়৷ কিন্তু পরস্পরকে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধু দাবি করে আসা দুই দেশের সীমান্তে একটি দেশ কর্তৃক নিয়মিতভাবে অন্য দেশের নাগরিককে গুলি করে হত্যা করার ঘটনা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ছাড়া বিশ্বের আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না৷।
বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসেব অনুয়ায়ী, ২০২৩ সালে ৩১ জন বাংলাদেশি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বা নির্যাতনে নিহত হয়েছেন। ২০২১ ও ২০২২ সালে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৮ ও ২৩। আসকের হিসেবে, এর আগে ২০০৯ থেকে ২০২০ পর্যন্ত ১১ বছরে ৫২২ জন বাংলাদেশি বিএসএফের গুলিতে বা নির্যাতনে মারা গেছেন। এ বছরও ১৫ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দফায় দায়িত্ব পাওয়া স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন গত ১৩ আগস্ট পিলখানায় গিয়ে বলেছিলেন, বিজিবির মতো ফোর্সকে সীমান্তে পিঠ দেখাতে বলা হয়েছিল। সীমান্তে বাংলাদেশের লোক মারে, আর বিজিবিকে ফ্ল্যাগ মিটিং করতে বাধ্য করা হয়। সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, আমি বিজিবিকে বলেছি, পিঠ দেখাবেন না। এনাফ ইজ এনাফ, আর নয়৷
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেন, এভাবে তারা গুলি করে মানুষ মারবে আর আমরা কোনো প্রতিবাদ করবো না সেটা তো হয় না। সরকারকে অবশ্যই এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানাতে হবে। ১ সেপ্টেম্বর রাতে যে মেয়েটিকে গুলি করে হত্যা করা হলো, তার হাতে তো কোনো অস্ত্র ছিল না। তাহলে তাকে কেন গুলি করে মারতে হবে? কেউ যদি অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে, তাকে গ্রেপ্তার করুন, আদালতে সোপর্দ করুন। বিচার হবে। মারতে হবে কেন? অন্য কোনো দেশের সীমান্তে তো এভাবে মানুষকে হত্যা করা হয় না। তাহলে তারা আমাদের ভালো প্রতিবেশী কীভাবে হলেন? এগুলো বিশ্লেষণের সময় এসেছে।
সোর্স: ডয়চে ভেলে








