সিঙ্গাপুরের স্টেট কোর্টে দাখিল করা নথিগুলো থেকে জানা গেছে, একটি মানি লন্ডারিং মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ১০ জনের সাথে একটি বিস্তৃত বিরাট নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকতে পারে, যারা ১ দশমিক ৮ বিলিয়নে ডলারেরও বেশি মূল্যের সম্পদের মালিক।
সিঙ্গাপুরের পুলিশের সূত্রে এশিয়াওয়ান জানিয়েছে, এই সন্দেহভাজনদের মধ্যে কেউ কেউ দেশের বাইরে অনলাইন জুয়া, কেলেঙ্কারি এবং অবৈধ অর্থ লেনদেনের সাথে জড়িত সংগঠিত অপরাধ সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত। তাদের অনেককে নজরদারিতে রেখেছে পুলিশ।
সিঙ্গাপুরের সরকার গত মাসে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আকারের অভিযান চালায় অর্থ পাচারকারীদের বিরুদ্ধে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ উপায়ে অর্থ পাচার করে যারা সিঙ্গাপুরে এনেছে তাদের বিরুদ্ধে এই অভিযান চালানো হয়। ব্যাপক এই অভিযানে এক বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলারের সমপরিমাণ সম্পদ ও নগদ মুদ্রা জব্দ করাসহ ১০ জন বিদেশি নাগরিককে আটক করে পুলিশ।
এই মামলার প্রসিকিউটররা জানান, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা কেবল একে অপরের সাথেই নয় বরং কিছু সন্দেহভাজনদের সাথেও জড়িত, যারা সিঙ্গাপুর থেকে পালিয়ে গেছে এবং কয়েকজন বিদেশে অবস্থান করছে।
১৫ আগস্টের ওই অভিযানের পর গত ১ সেপ্টেম্বর পুলিশ আরেকটি অভিযান পরিচালনা করে। বিদেশি কর্তৃপক্ষের গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা গোপন কিছু সম্পদের সন্ধান করেছিল।
এখন পর্যন্ত পুলিশ এই সিন্ডিকেটের সাথে যুক্ত দুই ব্যক্তিকে শনাক্ত করেছে- এক্স এবং ওয়াই।
ওয়াই:৬ সেপ্টেম্বর আদালতে বলা হয়, ‘ওয়াই’ হল ওয়াং বাওসেনের চাচাতো ভাই। তিনি একজন ৩১ বছর বয়সী চীনা নাগরিক যিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবৈধ জুয়া থেকে অর্থ অর্জনের সাথে সম্পর্কিত দুটি অর্থ পাচারের মামলায় অভিযুক্ত।
কমার্শিয়াল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট (সিএডি) দ্বারা দাখিল করা হলফনামায় তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স বর্তমানে পলাতক ওয়াই এর অবস্থান ও ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে। এখানে তার ১০০ মিলিয়নেরও বেশি মূল্যর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
তদন্তকারী অফিসার বলেন, সিঙ্গাপুর পুলিশ ফোর্স বর্তমানে পলাতক ওয়াই এর অবস্থান ও ক্রিয়াকলাপ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার চেষ্টা করছে।
ওয়াং বাওসেনের ১৮ মিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশ তার স্ত্রী হি হুইফাং-এর মালিকানাধীন সম্পদের নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে। যিনি সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত দুটি সংস্থার পরিচালক – হুইক্সিয়া টেকনোলজি এবং হুইক্সিয়া টেকনোলজি ইনভেস্টমেন্ট। এর একটির মূল্য ১৪ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
কমার্শিয়াল অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্ট (সিএডি) দ্বারা দাখিল করা হলফনামায় তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, ওয়াং বাওসেনের সিঙ্গাপুরে কোন চাকরি নেই। তবে চীনে তার পরিবারের চা বাগানের ব্যবসা।
দ্য স্ট্রেইটস টাইমস গত ৩ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, কম্বোডিয়ার হংলি জুয়া সিন্ডিকেটের সদস্যদের সাথে ওয়াং বাওসেনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৪ বছর বয়সী ওয়াং বিঙ্গাং এবং ৩৬ বছর বয়সী ওয়াং কেলিন ২০১৩ সালে ফিলিপাইনে ‘হংগ্লি৩০০’ অনলাইন জুয়া ওয়েবসাইট প্রতিষ্ঠা করে যা মূলত ‘লাইভ’ ভিডিও অনলাইন জুয়া পরিচালনা করে থাকে। ২০১৪ সালের প্রথম দিকে ওয়েবসাইটের আর্থিক ক্রিয়াকলাপে সহায়তা করার জন্য ওয়াং বাওসেনকে নিয়োগ করা হয়েছিল।
ওয়াং বিঙ্গাং সেন্টোসা গল্ফ ক্লাবের সদস্য। অভিযুক্ত ১০ জনের মধ্যে অন্তত চারজনও এই ক্লাবের সদস্য।

এক্স: প্রসিকিউটররা বলেছেন, অভিযুক্তদের মধ্যে একজন হল ভ্যাং শুইমিং যিনি সন্দেহভাজন এক্সের সাথে যোগাযোগ করেছিলেন। ৪২ বছর বয়সী তুর্কি নাগরিক ভ্যাং বর্তমানে একটি জালিয়াতির অভিযোগ এবং চারটি অর্থ পাচারের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন। তদন্তকারী বলেছেন, সন্দেহভাজন এক্সকে শনাক্ত করা যায়নি তবে তিনি চলমান তদন্ত এবং চীনে অনলাইন জুয়া কার্যক্রমের জন্য ‘ওয়ান্টেড’।
তদন্তকারী বলেছেন, গত ৩১ আগস্ট পুলিশ ৩ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সম্পদের তথ্য পেয়েছিল যা ভ্যাং এর নামে কেউ একজন স্থানান্তরিত করেছিল।
ভ্যাং এর ভাই ওয়াং সন্দেহভাজনদের একজন। দুই ভাইয়ের ‘হেং বো বাও ওয়াং’ নামক জুয়া সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। যার একটি ঘাঁটি ছিল কম্বোডিয়ায়। চীনা কর্তৃপক্ষের মতে, গ্রুপটি বেশ কয়েকটি অনলাইন ক্যাসিনো তৈরি এবং রক্ষণাবেক্ষণ করেছে।
সিন্ডিকেটটি ২০২২ সালের মে মাসে ভেঙে দেওয়া হয়। এই গ্রুপের সাথে জড়িত নয়জন সন্দেহভাজন যারা বিদেশে বসবাস করছিল, তারা পলাতক আছে। তাদের মধ্যে ওয়াং এবং ভ্যাং রয়েছে। পুলিশ বলেছে, ১০ অভিযুক্তের মধ্যে সু হাইজিন এবং সু বাওলিন দুই ভাইয়ের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

ওয়াং একজন সেন্টোসা গল্ফ ক্লাবেরও সদস্য এবং কম্বোডিয়ান কোম্পানি ‘এস.সি.ডাব্লু.ডি কন্সট্রাকশন’ এর আটজন পরিচালকের একজন। কোম্পানির নামের অক্ষরগুলো পরিচালকদের উপাধিগুলোর সাথে মিলে যায়: সু, চেন, ওয়াং এবং ডেং। সিঙ্গাপুরে গ্রেফতার হওয়া ১০ জনের একজন ওয়াং দেহাই একই কোম্পানির পরিচালক।







