বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় দিবস উদযাপনের তালিকায় ফাতেহা-ই ইয়াজদাহম উল্লেখযোগ্য। কেবল ধর্মীয় নয়, এর সাংস্কৃতিক বিষয়টিও মুসলিম সমাজের জন্য জরুরী। যে কারণে এই দিবসের পরিচিতি ও উদযাপনের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা থাকা প্রয়োজন।
পরিচিতি
বড়পীর আব্দুল কাদের জিলানী জিলান শহরে জন্মগ্রহণ করেন, ১০৭৮ সালে। তিনি ‘গাউছুল আজম’ উপাধিতেও প্রসিদ্ধ। কেবল সুফিসমাজ নয়, বরং পুরো মুসলিম বিশ্বে তিনি অত্যন্ত প্রসিদ্ধ, শ্রদ্ধেয় এবং মান্যবর ব্যক্তিত্ব।
ছোটবেলায় যখন তিনি শিক্ষার উদ্দেশ্যে বের হলেন তখন সফররত অবস্থায় ডাকাতদলের আক্রমণে পড়েছিলেন। জামার আস্তিনে সংরক্ষিত তাঁর মায়ের দেওয়া ৪০টি মোহরের কথা তিনি অকপটে স্বীকার করে সততার আশ্চর্য নজির স্থাপন করেছিলেন। এই ঘটনা গল্পাকারে আমরা অনেকেই ছোটবেলায় পড়েছি। তাঁর এই সততার গল্প প্রতিটি মানুষকে সততার দিকে ধাবিত হতে উদ্বুদ্ধ করে।
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি বাগদাদ শহরেই স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। আব্বাসীয় খেলাফতের সময়, ১১৬৬ সালে তিনি ইন্তেকাল করেন। আরবি মাস অনুযায়ী তাঁর ইন্তেকাল তারিখ ১১ রবিউস সানি। রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখকেই ফারসি ভাষায় বলা হয় ‘ইয়াজদাহম’, ‘ফাতেহা’র পারিভাষিক অর্থ বিশেষ দোয়া, প্রার্থনা।
প্রতি রবিউস সানি মাসের ১১ তারিখ গাউছুল আজম আবদুল কাদের জিলানীর যে বাৎসরিক উরস বা তাঁকে স্মরণ করা, তাঁর জীবন বৃত্তান্ত বর্ণনা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকার আনুষঙ্গিক বিষয় নিয়ে আলোচিত, উদযাপিত অনুষ্ঠানকে বলা হয় ‘ফাতেহা-ই ইয়াজদাহম’।

বড়পীর
বাংলায় তিনি ‘বড়পীর’ নামে প্রসিদ্ধ। মানে, যিনি পীর হিসেবে সবার চেয়ে বড়। তিনি ওলিকুল সম্রাট। আল্লাহ তাআলার একজন প্রিয় বান্দা ও ওলী হিসেবে তিনি এতটাই নেয়ামতের অধিকারী হয়েছিলেন যে, শুকরিয়া আদায়ের নিমিত্তে তিনি বলেছিলেন, “আমার কদম সমস্ত ওলীদের কাঁধের উপর।
এটি মোটেও বাড়াবাড়ি বা অহংকারের বিষয় নয়, বরং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে প্রাপ্ত নেয়ামতের স্বীকৃতি ও শুকরিয়াস্বরূপ। এখনো পর্যন্ত কোনো আল্লাহর ওলী তাঁর এই ঘোষণাকে চ্যালেঞ্জ করেননি, বরং প্রত্যেকেই তাঁর কদমকে নিজেদের কাঁধের উপর বিশেষ নেয়ামত হিসেবে গণ্য করে থাকেন।
তিনি মহিউদ্দিন নামেও পরিচিত। মহিউদ্দিন অর্থ, দ্বীনের পুনরুজ্জীবন যিনি করেছেন। তাঁর ইলম, তাসাউফ, নসিহত দ্বারা ইসলাম পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। তাঁর সমসাময়িক আব্বাসী খেলাফতকে কেন্দ্র করে ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলেই এ কথার সত্যতা পাওয়া যাবে।
তাঁর জীবনী রচনা আরেক আশ্চর্যের বিষয়। তাঁর নির্ভরযোগ্য জীবনীগ্রন্থ ‘বাহজাতুল আসরার’ রচনার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, হাদিস শরীফ যেভাবে সনদের মাধ্যমে সংকলিত হয়েছে, সেভাবে তাঁর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ও ঘটনা বিশ্বস্ত সূত্রে বা সনদে বর্ণিত হয়েছে। যে কারণে তাঁর জীবনের কোনো ঘটনা বা বর্ণনা নিয়ে সন্দেহ পোষণের সুযোগ সীমিত। এভাবে সনদের মাধ্যমে, বিশ্বস্ত সূত্রে আর কোনো আল্লাহর ওলীর জীবনী রচিত হয়েছে কি-না সন্দেহ।
তাঁর জীবনী কেবল তাঁর ভক্তবৃন্দ বা কাদেরিয়া তরিকার ব্যক্তিবর্গ লিখেছেন তা নয়। বরং, মুসলিম বিশ্বের অনেক প্রসিদ্ধ হাদিসের ইমাম, তাফসিরবিশারদ তাঁর জীবনী লিখেছেন। যেমন: হাদিসশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্ব আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. তাঁর জীবনী রচনা করেছেন।
তাঁর অসংখ্য কারামত রয়েছে। মায়ের পেটে থাকাবস্থায় মায়ের কুরআন তেলাওয়াত শুনে শুনে ১৮ পারা হিফজ করার ঘটনা আমরা অনেকেই জানি। তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন রমজানের প্রথম দিন। জন্মগ্রহণ করার পর থেকে ইফতারের আগ পর্যন্ত তিনি মায়ের দুধ মুখে দেননি, অর্থাৎ ভূমিষ্ঠ হওয়ার সাথে সাথে শরীয়তের প্রতি তাঁর একনিষ্ঠতা প্রকাশ পেয়েছে। তিনি এমন আল্লাহর ওলী যিনি জন্মলগ্ন থেকেই শরীয়তের প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্য প্রদর্শন করেছেন।

শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অবদান
আবদুল কাদের জিলানী ছিলেন শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ব। শিক্ষার উদ্দেশ্যে অত্যল্প বয়সেই তিনি ঘর থেকে বের হয়েছিলেন বাগদাদের দিকে। বাগদাদ ছিল তৎকালীন বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানের কেন্দ্রবিন্দু। যে কারণে তিনি বাগদাদে শিক্ষার্থী হিসেবে কাটিয়েছেন বছরের পর বছর। শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি জিলান শহরে স্থায়ীভাবে না ফিরে বাগদাদেই বসতি গেড়েছিলেন। এ থেকেই তাঁর শিক্ষানুরাগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিদ্যাপীঠ মিশরের আল আজহার থেকে শুরু করে যত প্রসিদ্ধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় সবখানেই গাউছে পাকের একাডেমিক আলোচনা জারি রয়েছে। শুধু তাই নয়, তাঁকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা সর্বোপরি বিদ্যাপীঠ। মুসলিম বিশ্বের এমন কোনো জায়গা বোধহয় পাওয়া যাবে না যেখানে তাঁর কোনো ভক্ত নেই বা তাঁর নামে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই।
বাংলাদেশেও তাঁর অসংখ্য ভক্ত অনুরাগী রয়েছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত কাদেরিয়া তরিকার অন্তর্ভুক্ত অনেক সিলসিলা জারি রয়েছে বাংলাদেশে। এই সিলসিলার হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তন্মধ্যে অন্যতম, ঢাকা মোহাম্মদপুর অবস্থিত কাদেরিয়া তৈয়েবিয়া আলিয়া কামিল মাদ্রাসা। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনো পর্যন্ত শিক্ষা বিস্তারে ব্যাপক অবদান রেখে চলেছে।
বাংলায় ফাতেহা-ই ইয়াজদাহম
উপমহাদেশে ‘ফাতেহা-ই-ইয়াযদাহম’ পালনের অগ্রপথিক হিসেবে বাবা আদম শহীদ (রহ.)- কে গণ্য করা হয়।
জনশ্রুতি রয়েছে, ১১৭৪ খ্রিস্টাব্দে গাউসে পাকের অষ্টম ওফাত দিবসে বাবা আদম শহীদের নির্দেশক্রমে তার খলিফা হজরত মুয়াবিন আল-বসরির মাধ্যমে মুন্সীগঞ্জের তৎকালীন খানকায় ‘ফাতেহা-ই-ইয়াযদাহম’ ঘটা করে পালিত হয়। সেখানে গরু জবাই করা হয়েছিল বিধায় রাজা বল্লাল সেন তার খলিফা হজরত মুয়াবিন আল-বসরিকে কূপে নিক্ষেপ করে হত্যা করে এবং মূলত এ কারণেই রাজা বল্লাল সেন ও বাবা আদম শহীদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়।
কেবল উপমহাদেশেই নয় বরং সমগ্র বিশ্বের সুফি-সম্প্রদায়ভুক্ত সমাজ দিবসটিকে গুরুত্বের সাথেই নানান ধর্মীয় পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে উদযাপন করে থাকেন। তবে সকলের সাথে বাঙালি মুসলমানদের ভিন্নতা হচ্ছে, তারা দিবসটিকে নিজেদের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে ‘ফাতেহা-ই-ইয়াযদাহম’ পরিভাষায় সাদরে বরণ করেছেন এবং তার স্থায়িত্বও নিশ্চিত করতে পেরেছেন- যা মুনতাসীর মামুনের ‘স্মৃতিময় ঢাকা’ গ্রন্থে উঠে এসেছে।
তিনি লিখেছেন, গত শতকের শেষ দশকে নবাব সলিমুল্লাহ মুসলমানদের প্রধান আরেকটি উৎসব হিসেবে ফাতেহা-ইয়াজদহম তুলে ধরেন। এ উপলক্ষে ঢাকা শহরের প্রতিটি পঞ্চায়েতকে তিনি টাকা দিতেন। এই টাকা ব্যয় করা হতো দুটি খাতে। প্রথমে মহল্লা সাজানো, দ্বিতীয় মিলাদ পড়ানো। এ মিলাদেরও বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল- এটি পরিচিত ছিল ‘ভাটিয়ালি মৌলুদ’ নামে। হয়ত ভাটিয়ালি সুরে পড়ানো হতো বলেই এই নাম। নাছির আহমেদ, সলিমুল্লাহর সময়ে এক ‘স্পেশাল মিলাদ’ এর কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়াও ফাতেহা-ইয়াজদমের সময়, পঞ্চায়েতসমূহ চকের মসজিদ সুন্দরভাবে সাজিয়ে উচ্চস্বরে সেখানে মিলাদ পড়াবার বন্দোবস্ত করতো।

কবি সুফিয়া কামাল তার ‘একালে আমাদের কাল’ স্মৃতিগ্রন্থে ফাতেহা-ই-ইয়াযদাহমকে মুসলিম সমাজের সংস্কৃতিরূপে উল্লেখ করে লিখেছেন- বড়পীর সাহেবের ওফাত-দিবস রবিউসসানীর ১১ তারিখে শিরনী হতো। গোসল করে পাক সাফ হয়ে সে শিরনী রাঁধতে হত। সারা পাড়ার মানুষ সে শিরনী পাক সাফ হয়ে খেয়ে যেতো।
এমনভাবে অনুসন্ধান চালালে বিখ্যাত আরও অনেকের স্মৃতিকথাতেই বাঙালি মুসলমানের সংস্কৃতির অংশ হিসেবে ফাতেহা-ই-ইয়াযদাহমকে অনড় অবস্থানে পাওয়া যাবে। এক্ষেত্রে এ তথ্যটি উল্লেখ করা অপরিহার্য, বৃটিশ সরকারের আমলে মুসলমানদের জন্য যে গুটিকয়েকদিন ছুটির জন্য বরাদ্দ ছিল তন্মধ্যে একটি হলো ফাতেহা-ই-ইয়াযদাহম। এতে চূড়ান্তভাবে সন্দেহমুক্ত হয়ে বলা যায়, ইংরেজ আমলে নিজেদের বিপর্যস্ত সময়েও বাঙালি মুসলিম সমাজ নিজেদের সাংস্কৃতিক অংশ হিসেবে দিবসটিকে সমাদর করতে কোনোরূপ কার্পণ্য করেনি।
আজও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সহিত পালিত হচ্ছে ফাতেহা-ই ইয়াজদাহম। ঢাকা, চট্টগ্রাম সহ সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় দিবসটি নানাবিধ পদ্ধতিতে উদযাপিত হচ্ছে।








