এই খবরটি পডকাস্টে শুনুনঃ
খরার কারণে মধ্য ও পশ্চিম ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। গ্রীষ্ম শুরুর পর থেকে দক্ষিণ ইংল্যান্ড, উত্তর ইতালি ও মধ্য ইউরোপের বেশ কিছু এলাকায় খরার প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছে গ্লোবাল ড্রট অবজারভেটরি।
আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ের সম্মিলিত খরা সূচক অনুযায়ী, ইউরোপের প্রায় অর্ধেক ভূখণ্ড খরার কবলে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯ শতাংশ এলাকা সতর্কতা পর্যায়ে পৌঁছেছে। দক্ষিণ জার্মানি, হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও স্লোভাকিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল এর মধ্যে রয়েছে।
বুধবার ইউরোপীয় কমিশনের জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, দীর্ঘ সময়ের তীব্র গরম ও শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে লোয়ার, পো, রাইন ও দানিউব নদীর পানির স্তর রেকর্ড পর্যায়ে নেমে গেছে।
স্যাটেলাইট ছবি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে খরার প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বড় নদীগুলোর পানির পরিমাণ কমে যাওয়া, মাটির আর্দ্রতা হ্রাস এবং বিভিন্ন শহরের সবুজ এলাকার রং হলুদ ও বাদামি হয়ে যাওয়ার চিত্র ধরা পড়েছে।
ফ্রান্সের লোয়ার নদী
ফ্রান্সের সাউমুর শহরের কাছে লোয়ার নদীর ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করে নদীর আকৃতিতে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে।
আগের বছরের ছবিতে নদীর বিস্তৃত অংশ পানিতে ঢাকা থাকলেও সাম্প্রতিক ছবিতে নদীর ভেতরে বড় বড় চর এবং বালু ও নুড়িপাথরের এলাকা দেখা যাচ্ছে।
চলতি বছরের ৮ আগস্টের ছবিতে আগের তুলনায় নদীর ভেতরে অনেক বেশি অংশ শুকিয়ে উন্মুক্ত হয়ে থাকতে দেখা যায়। একই সময়ে আশপাশের কৃষিজমির রংও বাদামি ও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের তথ্যের সঙ্গেও এই চিত্রের মিল রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগস্টে লোয়ার নদীর পানির স্তর রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
গ্যারন নদীতেও পানির সংকট
দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের মোয়াসাকের কাছে গ্যারন নদীর আশপাশের ২১ মে ও ১ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করেও বড় পরিবর্তন দেখা গেছে।
মে মাসের ছবিতে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ও উদ্ভিদ সবুজ দেখা গেলেও আগস্টের ছবিতে বড় অংশ বাদামি ও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
গ্যারন অববাহিকায় পানির সংকটের মধ্যেই এই পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে টুলুজের কাছে নদীর প্রবাহ বছরের ওই সময়ের জন্য রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি চলে যাওয়ায় নদীর পানির স্তর ধরে রাখতে কর্তৃপক্ষ আগাম ব্যবস্থা নেয়। ১৯৯৩ সালে এই ব্যবস্থা চালুর পর এত দ্রুত এমন উদ্যোগ আর নেওয়া হয়নি।
রাইনের পানিতে নৌ চলাচল ব্যাহত
জার্মানির কাউব এলাকার কাছে রাইন নদীর ১ মে ও ২৯ জুলাইয়ের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করে নদীর ভেতরে বালু ও নুড়ির উন্মুক্ত অংশ বেড়ে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে।
মে মাসে নদীর বেশিরভাগ অংশ পানিতে পূর্ণ দেখা গেলেও জুলাইয়ের শেষের ছবিতে নদীর মাঝখান ও তীরের বিস্তীর্ণ অংশ শুকিয়ে উন্মুক্ত হয়ে গেছে। আশপাশের উদ্ভিদ ও কৃষিজমির রংও বদলে গেছে।
জার্মানিতে রাইন নদীর পানির স্তর রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। পানির স্তর এতটাই কমে গেছে যে নদীর একটি সংকীর্ণ অংশে নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং কয়েকটি জাহাজ আটকে পড়ে।
জার্মানির অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন খাত আগেই সতর্ক করে জানিয়েছিল, কাউবের কাছে পানির গভীরতা আরও কমে গেলে নদীর কিছু অংশে বাণিজ্যিক ও পর্যটন নৌযান চলাচল অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে। পানির গভীরতা কম থাকায় বর্তমানে অনেক জাহাজকে স্বাভাবিকের তুলনায় কম পণ্য নিয়ে চলতে হচ্ছে।
ইতালির পো নদীতেও কমেছে পানি
ইতালির এমিলিয়া-রোমানিয়া অঞ্চলের বোরেত্তোর কাছে পো নদীর ২০২৩ ও ২০২৬ সালের আগস্টের স্যাটেলাইট ছবিতেও পানির পরিমাণ কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া গেছে।
২০২৩ সালের ছবিতে নদীর বেশ কিছু অংশ পানিতে ঢাকা থাকলেও ২০২৬ সালের ছবিতে সেখানে বালু ও নুড়িপাথরের বিস্তীর্ণ এলাকা দেখা যাচ্ছে।
জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, পো নদীর অববাহিকায় তীব্র পানিসংকট তৈরি হয়েছে। ইতালির বিভিন্ন এলাকায় সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য পানির ব্যবহার নিয়েও চাপ বাড়ছে।
দানিউবের পানিও কমছে
হাঙ্গেরি ও রোমানিয়ার বিভিন্ন অংশে দানিউব নদীর পানির স্তর কমে যাওয়ার প্রভাবও দৃশ্যমান হয়েছে।
জয়েন্ট রিসার্চ সেন্টারের মতে, দানিউবের পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় নৌ চলাচল, পানির সরবরাহ, কৃষিকাজ এবং জ্বালানি খাতের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট ও ২০২৬ সালের ৯ আগস্টের স্যাটেলাইট ছবি তুলনা করেও পানির স্তর কমে যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।
লন্ডনের সবুজ এলাকাও বিবর্ণ
ইংল্যান্ডেও খরার প্রভাব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। লন্ডনের হাইড পার্কসহ বিভিন্ন এলাকার স্যাটেলাইট ছবিতে গাছপালা ও ঘাসের প্রাণবন্ততা কমে যাওয়ার চিত্র দেখা গেছে। স্টোনহেঞ্জের আশপাশেও উদ্ভিদের অবস্থা খারাপ হয়েছে।
জুলাইয়ে ইংল্যান্ডে মাত্র ৬ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি গড়ের মাত্র ১০ শতাংশ। ১৮৩৬ সালে রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর এটি ছিল ইংল্যান্ডের সবচেয়ে শুষ্ক জুলাই।
মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের পরিবেশ সংস্থা জানায়, ইংল্যান্ডের ৭১ দশমিক ৩ শতাংশ এলাকা আনুষ্ঠানিকভাবে খরার আওতায় রয়েছে। এর মধ্যে পুরো গ্রেটার লন্ডনও রয়েছে। একই সময়ে জলাধারগুলোর পানি সংরক্ষণের হার নেমে এসেছে ৬৯ শতাংশে।
২০২৫ ও ২০২৬ সালের জুলাইয়ের হাইড পার্কের স্যাটেলাইট ছবি তুলনায় খরার তীব্রতার পার্থক্যও স্পষ্ট হয়েছে।
ভিয়েনার পার্কেও বাদামি হয়ে যাচ্ছে ঘাস
অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতেও তীব্র গরম ও পানির সংকটের প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন পার্কের স্যাটেলাইট ছবিতে ঘাসের রং পরিবর্তন এবং পানির স্বল্পতার চিত্র দেখা গেছে।
স্কাইস্যাটের উচ্চ রেজল্যুশনের স্যাটেলাইট ছবিতে ভিয়েনার অয়ের-ভেলসবাখ পার্কের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের গ্রীষ্মের দৃশ্যের বড় পার্থক্য ধরা পড়েছে।
২০২৫ সালের ২২ জুলাইয়ের ছবিতে পার্কের ঘাস ছিল গাঢ় সবুজ এবং গাছপালাও ছিল ঘন। বিপরীতে ২০২৬ সালের ২৮ জুলাইয়ের ছবিতে পার্কের বিস্তীর্ণ ঘাসের মাঠ হলুদ, বাদামি ও ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণে, ইউরোপের শহরগুলোর কেন্দ্রেও তাপ ও পানির চাপ এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টিপাত না হওয়া ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে মাটি শুকিয়ে যাচ্ছে এবং শহরের সবুজ এলাকাগুলো দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ইউরোপের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পূর্বাভাস অনুযায়ী, শুষ্ক আবহাওয়া সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।








