১৯৯৮ সালের অস্কারজয়ী ডেনিশ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ইলেকশন নাইট’! মাত্র ১১ মিনিটের এই শর্টফিল্মটি প্রথম দর্শনে একটি সরল এবং রাজনৈতিক স্যাটায়ার! কিন্তু এর গভীরে গেলে গণতন্ত্র, বর্ণবাদ, মেরুকরণ এবং ব্যক্তিগত ভণ্ডামির এক তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গচিত্র তুলে ধরে। প্রায় তিন দশক পর আজকের বৈশ্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে সিনেমাটি দেখলে মনে হবে- এটি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক অস্বস্তিকর ভবিষ্যদ্বাণীই করে গিয়েছিল।
গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র পিটার নিজেকে উদার, মানবিক ও প্রগতিশীল ভাবতে ভালোবাসে। ভোটের দিনে তাকে একটি বারে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এসময় কথা প্রসঙ্গে মনে হয়, সে ভোট না দিয়েই এখানে চলে এসেছে! এরপরই ভোট দিতে বার থেকে ছুটে বের হয় পিটার। যাওয়ার পথে একের পর এক ট্যাক্সি চালকের মুখে উগ্র বর্ণবাদী বা চরমপন্থী মতাদর্শ শুনে সে বিচলিত হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ভোটকেন্দ্রে পৌঁছেও তার কথাবার্তায় এমন এক অবচেতন পক্ষপাত প্রকাশ পায়, যা তাকে অন্যদের চোখে একই ঘৃণার ধারক হিসেবে তুলে ধরে।
আজকের বিশ্ব রাজনীতিতে সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রবণতা হলো তীব্র মেরুকরণ। নির্বাচন মানেই এখন দুই বিপরীত মেরুর সংঘর্ষ; মধ্যপন্থা যেন ক্রমশ বিলীন। আমেরিকা থেকে ইউরোপ, দক্ষিণ এশিয়া থেকে লাতিন আমেরিকা- সবখানেই ভোটাররা এখন ‘আমরা বনাম ওরা’ এই দুই শিবিরে বিভক্ত। যা সিনেমার সেই ট্যাক্সি চালকদের উগ্র মতাদর্শেরই প্রতিফলন।
‘ইলেকশন নাইট’-এর ট্যাক্সি চালকেরা কেবল ব্যক্তি নয়, তারা প্রতীক। তারা সেই কণ্ঠস্বর, যা নির্বাচনের মৌসুমে আরও উচ্চকিত হয়। একেকজন একেক মতাদর্শের প্রতিনিধি; কিন্তু সবার মধ্যেই ঘৃণার সুর স্পষ্ট। সিনেমাটি দেখায়, গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতর থেকেও কীভাবে অসহিষ্ণুতা মাথা তোলে।
বর্তমান বিশ্বে অভিবাসন প্রশ্নটি অনেক দেশের নির্বাচনের কেন্দ্রবিন্দুতে। অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বা নিরাপত্তা; এই সবকিছুর দায় চাপানো হয় ‘অন্যদের’ ওপর। ডানপন্থী দলগুলোর উত্থান এই ভাষ্যকে আরও মূলধারায় নিয়ে এসেছে।
সিনেমায় দেখা যায়, একজন অভিবাসী চালকও আবার অন্য একটি জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বর্ণবাদী মন্তব্য করেন। এখানে নির্মাতা সূক্ষ্মভাবে দেখিয়েছেন- ঘৃণা কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; এটি একটি চক্র, যা সুযোগ পেলেই নতুন লক্ষ্য খুঁজে নেয়। আজকের রাজনীতিতেও আমরা দেখি, নিপীড়নের শিকার গোষ্ঠীর মধ্যেও পর মুহূর্তেই অন্যের প্রতি অসহিষ্ণুতা জন্ম নেয়।
সিনেমাটির সবচেয়ে শক্তিশালী মুহূর্ত আসে শেষ দৃশ্যে। ট্যাক্সিগুলো ছেড়ে সবশেষে পিটার যখন দৌড়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছায়, ততক্ষণে ভোটগ্রহণ শেষ হয়ে গেছে। সে ভোটকর্মীকে (যিনি কৃষ্ণাঙ্গ), তাকে বুঝিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ চায়। এমনকি বলে বসে “আপনাদের মতো মানুষের জন্যই” ভোট দিতে এসেছি! কিন্তু তার এই কথার মধ্যে সুপ্ত ঔদ্ধত্য এবং ‘উদ্ধারকর্তা’ ভাবকে বর্ণবাদী হিসেবে ধরে নিয়ে এক ব্যক্তি তাকে ঘুষি মারে!
এই দৃশ্য আজকের ‘পারফর্মেটিভ অ্যাক্টিভিজম’ বা লোকদেখানো উদারতার সঙ্গে আশ্চর্যভাবে মিলে যায়। সোশ্যাল মিডিয়ায় সমতার কথা বলা, মানবাধিকারের পক্ষে পোস্ট দেওয়া- এসব সহজ। কিন্তু নিজের ভেতরের পক্ষপাত, শ্রেষ্ঠত্ববোধ বা সুবিধাবাদকে প্রশ্ন করা কঠিন। ছোট্ট এই সিনেমাটি মনে করিয়ে দেয়, গণতন্ত্র শুধু ভোটের প্রক্রিয়া নয়; এটি আত্মসমালোচনারও অনুশীলন।
‘ইলেকশন নাইট’ আমাদের শেখায়- গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ব্যালট বাক্সে নয়, মানুষের মনোজগতে। আমরা যাদের ঘৃণা করি, তাদের থেকে নিজেদের আলাদা ভাবি; কিন্তু সংকটের মুহূর্তে আমাদের কথাবার্তাই প্রমাণ করে, আমরা সেই একই কাঠামোর অংশ। আজকের বিশ্বে যখন নির্বাচন মানেই উত্তেজনা, ধর্ম-বর্ণের বিভাজন; তখন ১৯৯৮ সালের এই ছোট্ট চলচ্চিত্রটি আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।
গণতন্ত্র টিকে থাকে সহনশীলতা, আত্মসমালোচনা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর। ‘ইলেকশন নাইট’ সেই মূল্যবোধগুলোকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায় এবং আমাদের জিজ্ঞেস করে, ভোটের আগে আমরা কি সত্যিই নিজেদের ভেতরের অন্ধকারকে জয় করতে পেরেছি?







