বাংলাদেশকে কল্পনার মানসপটে চিত্রায়িত করতে গেলে সবার মনে যা ভেসে ওঠে তা হলো এদেশের সবুজ শ্যামল গ্রামীণ জনপদ। এদেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬৮ শতাংশেরও বেশি অর্থাৎ সাড়ে ১১ কোটিরও বেশি মানুষ বাস করে গ্রামে। তাই এদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক উন্নয়ন যে গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন ব্যতিরেকে অসম্ভব তা বলাই বাহুল্য।
বিগত ১৫ বছরে সরকারের গৃহীত যথাযথ কর্মসূচির ফলে আজ বাংলাদেশের গ্রামীণ জনপদেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ছোঁয়া অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। আওয়ামীলীগ সরকারের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার অন্যতম একটি অগ্রাধিকার হলো গ্রামে গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ করা যার প্রতিপাদ্য স্লোগান হলো- ‘আমার গ্রাম আমার শহর’।
বর্তমান সরকারের আমলে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশে রয়েছে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের অবদান। গ্রামীণ অঞ্চলে মানুষের জীবিকার উন্নতি হয়েছে, আয় বৃদ্ধি হয়েছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে যা সহজেই দৃশ্যমান। দেড় দুই দশক আগে গ্রামীণ জনপদের মানুষের জীবিকা ছিল বলতে গেলে শুধুমাত্র কৃষিনির্ভর কিন্তু বর্তমানে কৃষির পাশাপাশি অকৃষি খাতেও নানারকম সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের ফলে গ্রাম অঞ্চলেও জীবিকার বৈচিত্রায়ন ঘটেছে যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি সূচক।
গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি বড় দৃশ্যমান মাপকাঠি হলো দারিদ্র্যের হার হ্রাস পাওয়া, ২০০৫ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪০ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ২৫ দশমিক ১ শতাংশ, যা হ্রাস পেয়ে ‘২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ’ অনুযায়ী যথাক্রমে ১৮ শতাংশ এবং ৫ দশমিক ১ শতাংশে নেমে এসেছে। এই সরকারের লক্ষ্য এবং নির্বাচনী ইশতেহারে অঙ্গীকার হলো ২০২৮ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার আরও কমিয়ে ১১ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও উন্নয়ন বিষয়ক যে পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়েছে তার মধ্যে ১০টি বিশেষ অগ্রাধিকারমূলক খাত চিহ্নিত কড়া হয়েছে যেগুলি হলো; সামষ্টিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন (উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন), দারিদ্র বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস, প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা সম্প্রসারণ, তরুণ যুবসমাজ ও তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধি অর্জন, কৃষি, খাদ্য ও পুষ্টি, শিল্প উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, যোগাযোগ, অবকাঠামো উন্নয়নে বৃহৎ প্রকল্প, সুনীল (সামুদ্রিক সম্পদের) অর্থনীতি, এমডিজি অর্জন এবং এসডিজি বাস্তবায়ন কৌশল এবং বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০।
নির্বাচনী ইশতেহারে ঘোষিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের অগ্রাধিকারমূলক এই দশটি খাতের অধিকাংশ খাতই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে গ্রামীণ অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সাথে জড়িত। গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হল কৃষি উন্নয়ন। বাংলাদেশে ১৫ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সের কর্মক্ষম (শ্রমশক্তি) জনশক্তি সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৭ কোটি যার ৪৫% এরও বেশি মানুষ কৃষিখাতেই কাজ করে। এই সরকার কৃষি সেক্টরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে এবং এই সেক্টরে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করেছে। অনাবাদী সমস্যার সমাধান, বীজ এবং কীটনাশক সরবরাহ, প্রযুক্তিগত সাহায্য, মানসম্পন্ন মানব সম্পদ ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রোগ্রামগুলি কৃষির উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে, যা সম্প্রতি পরিসংখ্যান দেখলেই বোঝা যায়।
বিগত ২০২২-২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট কৃষি আবাদ হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৯৫ লক্ষ একর জমিতে, যেখান থেকে শুধু চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১৫ লক্ষ ৬৯ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি যা সর্বকালের রেকর্ড, গম উৎপাদন হয়েছে ১০ লক্ষ ৮৬ হাজার মেট্রিক টন, পাট ৮৪ লক্ষ ৩২ হাজার মেট্রিক টন, আলু প্রায় ১ কোটি দেড় লক্ষ মেট্রিক টন, এছাড়াও অন্যান্য শস্য উৎপাদন তো রয়েছেই। ২০২২-২০২৩ সালে দেশে মাছের উৎপাদন হয়েছিলো প্রায় ৪৮ লক্ষ মেট্রিক টনেরও বেশি। বর্তমান সরকারের অন্যতম একটি অঙ্গীকার হলো ‘সবার জন্য খাদ্য’।
এই লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সরকার নানাবিধ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এবং তার ধারা অব্যাহত রয়েছে। যেমন- কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষি যন্ত্রপাতির ক্রয়মূল্যের উপর ভর্তুকি প্রদান, সার, বীজ, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণে সুশাসন নিশ্চিত করা, পরিবেশ সহনশীল, উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন, অনাবাদী জমিতে কৃষি আবাদ সম্প্রসারণ ইত্যাদি। এসকল পরিকল্পনা ও কৌশল পুরাপুরি বাস্তবায়িত হলে দেশের সকল জনসংখ্যার জন্য খাদ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত হবে।
‘আমার গ্রাম আমার শহর’ এই স্লোগান বাস্তবায়নের পথ ইতিমধ্যেই অনেকখানি সফলতার সাথে এ সরকার পার করেছে। বর্তমানে প্রতিটি গ্রাম উপজেলা সদরের সাথে সড়ক দ্বারা সংযুক্ত এবং প্রতিটি উপজেলা জেলা ও জাতীয় মহাসড়কের সাথে সংযুক্ত। প্রতিটি গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ সুনিশ্চিত হয়েছে। উপজেলা সমূহের ৫০ শয্যা হাসপাতাল ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রতিটি ইউনিয়নে প্রতিষ্ঠিত কম্পিউটার ও ইন্টারনেট সেবা কেন্দ্রের মাধ্যমে গ্রামের মানুষ দেশ বিদেশের সাথে যোগাযোগ এবং সকল ধরণের ডিজিটাল সেবা গ্রহণ করতে পারছে।
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের যে ধারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা অব্যাহত থাকলে এবং এই সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের সুযোগ পেলে এদেশ হবে সমৃদ্ধির বাংলাদেশ এবং প্রতি গ্রামই হবে আধুনিক নগরের সকল সুযোগ সুবিধা সম্বলিত জনপদ।







