কারাগার থেকে জামিনে মুক্ত হওয়ার পর আবারও চট্টগ্রামে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন আলোচিত সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, প্রকাশ্যে না থাকলেও তিনি একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে নগরীর বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদার ও ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করতেন।
পুলিশ ও র্যাব সূত্র জানায়, ডেভিড ইমন সরাসরি মাঠে না নেমে মোবাইল ফোন এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে পুরো চক্র পরিচালনা করতেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, ভাঙচুর, এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। অনেক ব্যবসায়ী নিরাপত্তার শঙ্কায় বিষয়টি প্রকাশও করেননি।
ডেভিড ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার মো. মুসার ছেলে। এলাকায় তার ছিল সাধারণ জীবনযাপন। কিন্তু শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ গ্রুপে যোগ দেওয়ার পর চট্টগ্রামে একের পর এক খুনে নাম জড়ায় তার। বিদেশি পিস্তল হাতে তার একাধিক ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরালও হয়েছে।
ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সাজ্জাদের সেকেন্ড ইন কমান্ড। দেশ ছেড়ে এখন বসবাস করছেন দুবাই। সেখান থেকেই ফোনে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের ফোন করে চাঁদাবাজি করছেন। তার কথামতো চাঁদা না দিলে ওই ব্যবসায়ীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে চলছে গুলি-হামলার ঘটনা।
ডিডিএন কার্যালয়ে হামলা
ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ হলো চট্টগ্রামের ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ডট নেট (ডিডিএন)-এর কার্যালয়ে হামলার নির্দেশ দেওয়া। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি প্রতিষ্ঠানটির কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। দাবি পূরণ না হওয়ায় গত জুলাই মাসে চন্দনপুরা এলাকায় অবস্থিত ডিডিএনের প্রধান কার্যালয়ে ৩০-৪০ জন সন্ত্রাসী হামলা চালায়। হামলাকারীরা অফিসে ভাঙচুর, লুটপাট এবং কর্মীদের মারধর করে। তদন্তে র্যাব জানায়, হামলার জন্য বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক ভাড়া করা হয়েছিল এবং অংশগ্রহণকারীদের জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ডেভিড ইমনকে প্রধান পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
এক মাসে দেড় কোটি টাকার চাঁদাবাজি
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে অন্তত তিনটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে মোবাইল ফোনে চাঁদা দাবি করে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীরা প্রায় দেড় কোটি টাকা আদায় করেন। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর কিংবা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হতো। অনেকেই আতঙ্কে বিষয়টি প্রকাশ করেননি।
সাংবাদিককে হত্যার হুমকি
চলতি বছরের মে মাসে চট্টগ্রামের এক সাংবাদিকের কাছে ডেভিড ইমনের পরিচয়ে ফোন করে ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়।
চাঁদা না দিলে গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিক থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ঘটনাটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
সহযোগীদের অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার
ডেভিড ইমনকে ধরতে অভিযান চলাকালে চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় তার দুই সহযোগীকে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, ওই অস্ত্রগুলো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহারের প্রস্তুতি চলছিল।

আত্মগোপনে থেকেও পরিচালনা করতেন চক্র
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার পর ডেভিড ইমন দীর্ঘদিন আত্মগোপনে ছিলেন। তবে অবস্থান পরিবর্তন করে তিনি মোবাইল ফোন ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের মাধ্যমে চাঁদাবাজি, হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন।
পুরোনো অপরাধের রেকর্ড
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র আইন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, মারামারি ও সংগঠিত অপরাধসহ একাধিক মামলা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তালিকায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
পুলিশের আশা, এই তদন্তের মাধ্যমে শুধু ডেভিড ইমনের সাম্প্রতিক অপরাধ কর্মকাণ্ডই নয়, তার নেতৃত্বাধীন পুরো সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজি নেটওয়ার্কের কার্যক্রমও উন্মোচিত হবে।
একাধিক মামলা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র আইন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত হওয়ার পর যশোরের ধুমধুমপুর এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে চট্টগ্রাম ও যশোর জেলা পুলিশের যৌথ অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারণা, জিজ্ঞাসাবাদে তার নেতৃত্বাধীন চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
তদন্তে যা খতিয়ে দেখা হচ্ছে
ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের পর তার সাম্প্রতিক অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তার নেতৃত্বাধীন চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি, অর্থের উৎস এবং সহযোগীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার আশা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া ডেভিড ইমনের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে বর্তমানে কারা সক্রিয় রয়েছেন, তাদের ভূমিকা কী ছিল এবং তারা কোথায় অবস্থান করছেন—এসব বিষয়েও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তদন্তের অংশ হিসেবে তার চক্রের ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রের উৎস, সরবরাহকারী এবং অস্ত্র সরবরাহের নেটওয়ার্কও অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
পুলিশ আরও যাচাই করছে, ডিডিএন ছাড়াও অন্য কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কাছে চাঁদা দাবি বা হামলার অভিযোগে ডেভিড ইমন ও তার সহযোগীরা জড়িত ছিলেন কি না। আত্মগোপনে থাকার সময় তিনি কোথায় কোথায় অবস্থান করেছেন এবং কারা তাকে আশ্রয় বা লজিস্টিক সহায়তা দিয়েছেন, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, “ডেভিড ইমনকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তার অপরাধচক্র সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। যাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজন হলে নতুন মামলা করা হবে এবং সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান আরও জোরদার করা হবে।”
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের পুলিশ সুপার (এসপি) মাসুদ আলম জানান, আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী রায়হানকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে জেলা পুলিশের একাধিক দল দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করে আসছিল। সেই অভিযানের ধারাবাহিকতায় যশোরের ধুমধুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, একই সময়ে নোয়াখালীতেও রায়হানকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে পৃথক একটি অভিযান পরিচালনা করা হয়। তবে অভিযানের সময় তিনি অল্পের জন্য পালিয়ে যান। তাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং খুব শিগগিরই তাকেও আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন এসপি।
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম আরও জানান, ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার এবং এ অভিযান ঘিরে বিস্তারিত তথ্য আগামী বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে। সেখানে গ্রেপ্তারের পেছনের গোয়েন্দা তৎপরতা, অভিযানের বিভিন্ন দিক এবং তার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তের অগ্রগতিও তুলে ধরা হবে।







