সবাই মিলে ‘তৃতীয় মাত্রা’র বিশেষ পর্ব উপস্থাপনার জন্য অনুরোধ করতে লাগলেন, আমাকে ঠেলে পাঠালেন স্টুডিওতে। মনে পড়লো দুই বছর আগে আমি শেষ উপস্থাপনা করেছিলাম। তৃতীয় মাত্রার বিশেষ পর্ব, বিজয় দিবস, রবীন্দ্র দিবস, নজরুল দিবস, ঈদ, পহেলা বৈশাখ কিংবা একুশে ফেব্রুয়ারি ইত্যাদি দিনে আমি উপস্থাপনা করতাম। জিল্লুর-এর মতো চুপচাপ শুনতাম এবং আলোচকদের আলোচনা উপভোগ করতাম। এবারও তাই ঘটলো। আমার একদিকে আছেন মাননীয় সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী আরেকদিকে প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী সুরের ধারা সংগঠনের অধ্যক্ষ এবং পরিচালক ড. রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। ভারত সরকারের কাছ থেকে পদ্মশ্রী পদক পেয়েছেন।
অনেকদিন পর তিনি দেশে এসেছেন। হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণের ‘রিহার্সেল’ চলছে। এসেই অনেক ব্যস্ততায় দিন কাটাচ্ছেন। তারপরও তিনি এসেছেন তৃতীয় মাত্রায় অংশগ্রহণ করতে। আমরা আজ আলোচনা করবো বৈশাখ নিয়ে। আমাদের হাজার বছরের ঐতিহ্য নববর্ষ নিয়ে। আমাদের সংস্কৃতি নিয়ে, আমাদের ভালোবাসা নিয়ে। আমাদের দেশ নিয়ে। দেশের মানুষ নিয়ে। আমাদের বেড়ে ওঠা নিয়ে। নতুন বছরে মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, প্রত্যাশা-এসব নিয়েই আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো। আমার বামপাশে বসেছেন সংস্কৃতি মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি। খুব বুদ্ধিদীপ্ত কথা বলেন। বন্যাও অনেকদিন পর ক্যামেরার সামনে কথা বলবেন।
স্টুডিওর লাইট জ্বলে উঠতেই আমি সচেতন হয়ে গেলাম। দুজনের পরিচয় দিয়েই নিতাই রায় চৌধুরীকে প্রশ্ন করলাম-সরকারের পক্ষ থেকে বৈশাখ উপলক্ষে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে? সংস্কৃতি চর্চায় আপনাদের ভূমিকা কী হবে? তিনি অসম্ভব মেধাবী ব্যক্তি। তিনি সুন্দরভাবে হাজার বছরের সংস্কৃতি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন।
তিনি বললেন, আমাদের সরকার এই স্বল্প সময়ে নানান পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমাদের সংস্কৃতিকে রক্ষার জন্য আমরা স্কুল- কলেজগুলোতে সংস্কৃতির শিক্ষক নিয়োগ করছি। ফলে শিশুকাল থেকেই বাচ্চারা আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে বড় হবে। আর যে শিশুটি সংস্কৃতি বুঝবে সে কখনো বিপথে যাবে না। তার ভেতরে সংস্কৃতির লালন হবে। আমরা আমাদের দায়বদ্ধতা থেকেই এই কাজ করছি। প্রাচীন আমল থেকেই আমাদের সভ্যতা, ঐতিহ্য, বর্তমান সময় পর্যন্ত মানুষের যে আচরণ দৃষ্টিভঙ্গি এর উৎকর্ষতা সাধন করলে আমাদের জীবনে এর প্রভাব পড়বে।
আমাদের দেশের সঙ্গে চুয়াল্লিশটি দেশের কালচারাল ডিপ্লোম্যাসি রয়েছে আরও বেশ কিছু দেশের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে যাচ্ছে। এতে করে আমাদের যে সংস্কৃতি বিনিময় সেটা বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বের নানা দেশের সঙ্গে আমরা আমাদের সংস্কৃতি বিনিময় করার ফলে তারা আমাদের সংস্কৃতিকে জানতে পারবে আবার আমরাও তাদের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারবো। এতে করে আমাদের নতুন প্রজন্ম সমৃদ্ধ হবে। আমাদের এই অঞ্চলে সভ্যতার বিকাশ ঘটে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। আমাদের সংস্কৃতির ঐতিহ্যও কম নয়। যে কারণে পৃথিবীর অনেক দেশের মানুষ তার ভাগ্য অন্নেষণের জন্য কিন্তু বাংলায় আসতো। সেই তুলনায় বাংলার মানুষ কিন্তু তেমন কোথাও যায়নি। তাই তো সোনার বাংলা বলা হতো। এখানে আসেনি কোন দেশ? ওলন্দাজ, ইংরেজ থেকে শুরু করে চাইনিজরা পর্যন্ত এসেছে। হিউয়েন সাং এসেছিলেন। ইংরেজরা একটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি খুলে এসেছিল বাংলায়। ইবনে বতুতা এসেছিলেন। তিনি তার গ্রন্থে লিখেছিলেন-বাংলায় আসার হাজারটি দরজা আছে কিন্তু বেরোনোর কোনো পথ নেই। কারণ এদেশে এত প্রাচুর্য, এত ঐতিহ্য ছিল যে, কেউ এখানে এলে আর যেতে চাইতেন না। আমাদের সেই ঐতিহ্যের দিকে আমরা ফিরে যেতে চাই।
‘সুরের ধারা’ এক হাজার শিল্পী নিয়ে প্রতি বছর চ্যানেল আই-এর সঙ্গে আয়োজন করে ‘হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ’। আর এই পুরো আয়োজনে নেতৃত্ব দেন রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। তার সাংগঠনিক শক্তি যে কেমন সেটা তিনি বারবার প্রমাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এই আয়োজন হয়েছে বেশ কয়েক বছর ধরে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে শিল্পী বাছাই থেকে শুরু করে পুরো প্রক্রিয়াটা নিজেই তদারকি করেন তিনি। শিল্পীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তৈরি করার মতো একটি দুরূহ কাজ তিনি সম্পন্ন করেন। দিনরাত পরিশ্রম করতে পারেন ক্লান্তিহীন। ঢাকা শহরে যারা রমনা বটমূলে যেতে চান না তাদের জন্য হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ একটু সহজ প্রাপ্তি হয়।
রেজওয়ানা চৌধুরীর কাছে আমার প্রশ্ন এই যে, সারা দেশ থেকে যে শিল্পীরা হাজার কণ্ঠে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন আপনার কি মনে হয় সারা দেশে যে প্রতিভা ছড়িয়ে আছে আমরা হয়তো তাদেরকে সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারি না? বন্যা স্বাভাবিকভাবে জবাব দিলেন-সংস্কৃতি হচ্ছে প্রাচীন একটি চলমান ধারা। এটি পানির মতো প্রবহমান। আর তাই সেখানে নতুন নতুন বিষয় যুক্ত হয়। যেমন প্রচীনকালে নববর্ষ ছিল একটা সামাজিক উৎসব। এখন আমাদের এই উৎসবগুলো নগরায়িত হয়েছে।
দেশব্যাপী এখন নববর্ষের উৎসব হয়। সেখানে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক উৎসবগুলো ধরা দেয়। লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ থেকে শুরু করে ঘোড়দৌড় পর্যন্ত হয়ে থাকে। সেখানে আমরা এই নগরে সংগীতের আয়োজন করছি। মানুষকে আনন্দ দেয়ার চেষ্টা করছি। এখানে অনেক সাধারণ শিল্পীরা আসে। কেউ না শিখেই আসে আবার অনেকে প্র্যাকটিস করেই আসে। অনেক বয়স্ক শিল্পী আসেন। যারা কোনোদিন গান শেখেননি। কিন্তু আমরা তাদেরকে সম্মান দিয়ে অংশগ্রহণের সুযোগ দিই। আবার অনেক মেধাবী ছেলেমেয়েও থাকে তাদেরকে পরামর্শ দিই যেন সে প্র্যাকটিস করে। কোনো ভালো ওস্তাদের কাছে শিখতে পারে। চ্যানেল আইও অনেক ইভেন্ট করে সেরা কণ্ঠ, বাংলার গান, ক্ষুদে গানরাজ এসব ইভেন্টেও দেখেছি অনেক ছেলেমেয়ে এসেছে যারা জীবনে হারমোনিয়াম ধরেনি। তাদের ভেতর থেকেও কিন্তু মেধাবীরা বেরিয়ে এসেছে। সুরের ধারা একটি সংগঠন। এখানে অনেক ছেলেমেয়ে গান শিখে থাকে। আমরা চেষ্টা করি নতুন নতুন ছেলেমেয়েকে আমাদের এখানে সুযোগ দিতে। যেন একটি বাচ্চা সংগীতের ভেতর থাকে। তাহলে সে বড় হয়ে কোনো অন্যায় কাজ করবে না। তার মন হবে স্বচ্ছ।
আসলেই আমাদের সকলের চেষ্টাই এমন। আমরা সবাই যার যার দিক থেকে আমাদের সংস্কৃতির উৎকর্ষ সাধনের জন্য অবশ্যই কাজ করে যাবো- এই প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হলো এই তৃতীয় মাত্রা।
মাননীয় মন্ত্রী অথবা দেশবরেণ্য শিল্পী, রাজনীতিবিদ এদের নিয়ে নিয়মিত তৃতীয় মাত্রা উপস্থাপনা করেন জিল্লুর রহমান। এদের সবাইকে যদি প্রতীক হিসেবে ধরি তাহলে আমাদের সবার লক্ষ্যই এক। উৎসবে হোক, আনন্দে হোক, বিষাদে হোক কিংবা দুর্যোগে হোক আমরা সবাই যে যার অবস্থান থেকে দেশের কথা বলছি। নিজে দেশের জন্য কাজ করছি। অন্যকে দেশের জন্য কাজ করতে উৎসাহিত করছি। কারণ আমরা এগিয়ে গেলে দেশ এগিয়ে যাবে।








