জাতিসংঘের কপ-৩০ জলবায়ু সম্মেলন দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। বিভিন্ন বিষয় এখনও অমীমাংসিত। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এখনো মেলেনি। দেশগুলোর দেওয়া প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবে যা করতে হবে তার মধ্যে বড় ফারাক। দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি ও প্রয়োজনীয় বাস্তব পদক্ষেপের মধ্যে অনেক ব্যবধান। এগুলো আলোচনায় বারবার উঠে আসছে।
প্রথম সপ্তাহে যারা জাঁকজমকপূর্ণ ভাষণ দিয়েছিলেন, সেই বিশ্বনেতারা অনেক আগেই চলে গেছেন। আলোচনার দায়িত্ব এখন কূটনীতিকদের কাছে।
বেলেম এর পুরনো বিমানঘাঁটির ওপর নির্মিত অস্থায়ী কাঠামোতে এই আলোচনা চলছে। প্রচণ্ড গরমের পর তীব্র বৃষ্টিতে স্বস্তি দিয়েছে আলোচকদের।
তেল, গ্যাস ও কয়লা থেকে দূরে যাওয়ার পথনকশা
দুই বছর আগে দেশগুলো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসবে। ব্রিটেন, কলম্বিয়া, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, জার্মানি ও কেনিয়া এই দেশগুলো চায় সম্মেলন একটি বিস্তারিত ‘পথনকশা’ তৈরি করা হোক। এতে যেমন তেল উত্তোলনে ভর্তুকি কমানো বা গ্যাসোলিন ব্যবহারে সহায়তা কমানোর প্রস্তাব থাকতে পারে। এতে থাকতে পারে: তেল-গ্যাস উত্তোলনে ভর্তুকি কমানো এবং পেট্রোল ব্যবহারে সহায়তা কমানো। ছোট দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো বলছে তারা ডুবে যাচ্ছে, তাই এমন পথনকশা খুব জরুরি।
তবে সৌদি আরব ও রাশিয়ার মতো তেল-গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো এর বিরোধিতা করতে পারে বলে ধারণা করছেন কেউ কেউ।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা প্রথম দিনেই এই পথনকশার কথা বলেছিলেন। কিন্তু ব্রাজিল নিজেই সম্প্রতি অ্যামাজনের মোহনায় নতুন তেল অনুসন্ধানের অনুমতি দিয়েছে যা সেই পথনকশার লক্ষ্যকে চ্যালেঞ্জ করে।
যুক্তরাষ্ট্র নিজে আলোচনায় নেই, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে দ্রুত জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং অন্য দেশগুলোকে তা কিনতে চাপ দিচ্ছে।
রাস্তায় হাজারও মানুষ
ব্রাজিলের বেলেম শহরে হাজারও মানুষ পরিবেশ রক্ষার দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। তারা গান, নাচ ও ফোলানো বিশাল পৃথিবীর মডেল নিয়ে র্যালি করেছে। হাতে বিশাল ফোলানো পৃথিবীর মডেল সব মিলিয়ে তারা দাবি জানাচ্ছে যে, অ্যামাজনের প্রান্তে অনুষ্ঠিত হওয়া এই বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশগুলো যেন পৃথিবী রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
কিন্তু সম্মেলনের আলোচনা কক্ষের পরিবেশ অনেকটাই ভিন্ন। সেখানে আশা জাগানো কিছু এখনও দেখা যায়নি।
কিছু দেশ তেল, গ্যাস ও কয়লা থেকে বৈশ্বিক রূপান্তরের জন্য একটি বিস্তারিত ‘পথনকশা’ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু প্রধান সাইমন স্টিয়েল শনিবার বলেন, প্রতিটি দেশের জনগণ ও অর্থনীতি এই সম্মেলন থেকে ফল চায়। আগামী দুই দিন বিভিন্ন দেশের মন্ত্রীরা আসবেন বিষয়গুলো সমাধানে এগিয়ে যেতে।
বিশ্ব তাপমাত্রা বাড়ছে প্রতিশ্রুতিতে ঘাটতি
দশ বছর আগে ২০১৫ সালে প্যারিসে দুইশ দেশ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে। প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে এবং সম্ভব হলে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখবে।
কিন্তু এর পর থেকে দূষণ আরও বেড়েছে। পৃথিবী শিল্পপূর্ব সময়ের তুলনায় এখন প্রায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি গরম। বর্তমান নীতি চললে এই শতাব্দীর শেষে তা ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত যেতে পারে।
তেল, গ্যাস ও কয়লা পোড়ানোর ফলে উৎপন্ন কার্বন ডাই-অক্সাইড—যা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান চালক এ বছর রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছানোর পথে। পৃথিবীর তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেছে, আর বিজ্ঞানীরা অনুমান করছেন যে বর্তমান নীতিগুলো অনুসরণ করলে শতাব্দীর শেষে তাপমাত্রা প্রায় ২ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে।
বেলেম আলোচনার প্রধান বিষয়
প্রথম সপ্তাহে বিশ্বনেতারা বক্তব্য দিয়ে চলে গেছেন। এখন কূটনীতিকরা প্রচণ্ড গরম আর বৃষ্টির মধ্যে অস্থায়ী হলগুলোতে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কীভাবে বেশি তহবিল দেওয়া যায়; পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তিতে বাণিজ্য বাধা কীভাবে কমানো যায়; দেশগুলো প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করছে কিনা তা নিয়েই আলোচনা। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো বেশি জোর দিচ্ছে- কারণ তারা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে।
ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা পথনকশার কথা বললেও দেশটি নতুন তেল খোঁজার অনুমতি দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন আলোচনায় নেই, কিন্তু প্রচুর জীবাশ্ম জ্বালানি উৎপাদন করছে এবং অন্য দেশগুলোকে তা কিনতে বলছে।
ব্রাজিলের নেতৃত্ব শান্তিপূর্ণ পরিবেশ
আলোচনার প্রধান ব্রাজিলিয়ান কূটনীতিক আন্দ্রে করেয়া দো লাগো চান: নতুন নতুন প্রতিশ্রুতির বদলে আগের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন। অযথা শেষ মুহূর্তের তর্ক-বিতর্ক বন্ধ করা। শুক্রবার তিনি একদল আদিবাসী বিক্ষোভকারীর সাথে শান্তিপূর্ণভাবে কথা বলে প্রবেশপথ খোলার ব্যবস্থা করেন।
এই বছরের পরিবেশ: খোলামেলা ও গণতান্ত্রিক
মিশর, ইউএই ও আজারবাইজানের মতো এখানে কঠোরতা নেই। এখানে বিক্ষোভ করার অনুমতি আছে। মানুষ মুক্তভাবে কথা বলছে। বড় আকারের আন্দোলন সহজেই হচ্ছে। বড় মিছিলটি পুলিশ অনুমোদিত পথ ধরে হয়েছে। যদিও সম্মেলন কেন্দ্র পর্যন্ত তাদের আসতে দেওয়া হয়নি। এখানে বিভিন্ন সংগঠন, ইউনিয়ন ও কর্মীরা আন্দোলনে স্বাধীনভাবে অংশ নিচ্ছেন।








