নেপাল ও তিব্বত সীমান্তবর্তী এলাকায় আকস্মিক ভয়াবহ বন্যায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ভূমিকম্পের পর লেন্দে খোলা নদীর উজানে থাকা বড় একটি হিমবাহ বা বরফের স্তূপ ধসে পড়ার কারণে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত।
রয়টার্স ও কাঠমান্ডু পোস্টের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বত সীমান্তবর্তী নেপালে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়া অন্যতম সম্ভাব্য কারণ। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও পলিমাটি নেমে এসে নদীর পানিপ্রবাহে ভয়াবহ স্রোত তৈরি করে।
মার্কিন স্যাটেলাইট প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবসের তোলা দুর্যোগের আগে ও পরের ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা এই ধারণা দিয়েছেন। ছবিতে দেখা গেছে, বন্যার পর ওই অঞ্চলের সবুজ পাহাড়ের বড় অংশ বাদামি ধ্বংসস্তূপ ও পলিমাটির নিচে ঢেকে গেছে। হিমবাহের অগ্রভাগের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার মাধ্যমেই ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। এর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পাথর ও পলিমাটিও নিচে নেমে এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্যোগের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই এলাকায় প্রচুর বরফ গলে থাকতে পারে। আগের দিনও উপত্যকার কিছু হিমবাহ বরফে ঢাকা ছিল। কিন্তু পরদিন সেগুলোর ওপর উন্মুক্ত বরফস্তর দেখা যায়। এতে ওই এলাকায় তুলনামূলক উষ্ণ আবহাওয়া থাকার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করছেন তিনি। তবে ঠিক কী কারণে হিমবাহের অংশটি ধসে পড়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দুর্যোগের কয়েক মিনিট আগে ওই অঞ্চলে একটি ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় এর সঙ্গে হিমবাহ ধসের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে তিব্বত অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হয়। মাত্র তিন মিনিট পর সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। তবে ভূমিকম্পই বন্যার মূল কারণ কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। এর উৎপত্তিস্থল ছিল নেপালের গোসাইকুন্ড হ্রদ থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার উত্তরে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের একটি ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে হিমবাহ ও ধ্বংসাবশেষমিশ্রিত বন্যার সৃষ্টি হয়। সংস্থাটির ভূতত্ত্ববিদ প্রকাশ পোখরেলও স্যাটেলাইট চিত্র পর্যালোচনা করে বলেছেন, নেপাল অংশে বরফ ও পাথরের বড় ধরনের ধস থেকেই আকস্মিক বন্যার সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা এ ধরনের ঘটনাকে ‘আইস-রক অ্যাভালাঞ্চ’ বা বরফ-পাথরের ধস হিসেবে বর্ণনা করছেন।
এই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসকে ২০১৫ সালের প্রাণঘাতী ভূমিকম্পের পর নেপালের সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত নেপালে অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনও শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম এলাকায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।








