দশকের পর দশক ধরে বৈশ্বিক তেলবাজারের গতিপথ নির্ধারণ করেছে মধ্যপ্রাচ্য। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, পেট্রোলিয়াম রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন (ওপেক)-এর সিদ্ধান্ত এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সাধারণত অপরিশোধিত তেলের দামের ওঠানামা নির্ধারণ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের পর জ্বালানি বাণিজ্যের রুট পরিবর্তনের ফলে রাশিয়াও তেলবাজারে শক্তিশালী প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়।
সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তেল সংকট একটি নতুন বাস্তবতা সামনে এনেছে। বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী দেশটি কোনো আলোচনার টেবিলে ছিল না। সেই দেশ হলো চীন।
বিশ্লেষকদের মতে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং স্বাভাবিক তেল সরবরাহ পুনঃস্থাপনের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথে এগোচ্ছে, তখন তেলের পরবর্তী বাজারচক্র কোন দিকে যাবে তা অনেকটাই নির্ভর করতে পারে বেইজিংয়ের সিদ্ধান্তের ওপর।
এর কারণ, চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘সুইং বায়ার’ (পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রয় বাড়ানো বা কমানোর সক্ষমতাসম্পন্ন ক্রেতা) এবং একই সঙ্গে জ্বালানির সবচেয়ে বড় ‘সুইং অ্যাবজর্বার’-এ পরিণত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধ চলাকালে হরমুজ প্রণালীর কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় দৈনিক ১ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলেরও বেশি তেল সরবরাহ ঝুঁকির মুখে পড়ে। এতে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল প্রবাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ইতিহাস বলছে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে তেলের দাম ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ার কথা। ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধের সময় বৈশ্বিক সরবরাহের মাত্র ৭-৮ শতাংশ ব্যাহত হওয়ায় তেলের দাম ১৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে গিয়েছিল।
কিন্তু এবার সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগলেও তেলের দাম আশঙ্কাজনক মাত্রায় পৌঁছায়নি। ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছানোর যে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি।
ভারতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্রান্ট থর্নটন ভারতের তেল ও গ্যাস বিভাগের পার্টনার সৌরভ মিত্র বলেন, এর মূল কারণ ছিল চীনের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি।
তার ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ হরমুজ প্রণালীকে সংকুচিত করে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ কমিয়ে দিলেও বাজারে প্রত্যাশিত ধাক্কা দেখা যায়নি। কারণ চীন নীরবে তার জ্বালানি কৌশল পুনর্গঠন করেছিল।
বছরের পর বছর রাশিয়া ও ইরান থেকে ছাড়ে তেল কিনে চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেলের মজুত গড়ে তুলেছে। ধারণা করা হয়, দেশটির কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুতে বর্তমানে ১০০ কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল রয়েছে।
সংকটের সময় নতুন করে বাজারে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরিবর্তে চীনের পরিশোধনাগারগুলো নিজেদের মজুত তেল ব্যবহার করে। একই সঙ্গে দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সংকটকালীন সময়ে চীনের তেল আমদানি দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ ব্যারেল কমে যায়।
সৌরভ মিত্র বলেন, চীন কেবল কম তেল কিনেছে। তাদের কাছে আমদানি দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমানোর সক্ষমতা ছিল, যা প্রয়োজনে বাজারে অতিরিক্ত তেল সরবরাহের মতোই কাজ করেছে।
ফলে যখন বৈশ্বিক সরবরাহ চাপের মুখে ছিল, তখন বড় একটি চাহিদা বাজার থেকে অদৃশ্য হয়ে যায়। এতে তেলের দামের আরও বড় উল্লম্ফন ঠেকানো সম্ভব হয়।
চীনের প্রভাব শুধু মজুত তেলেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারের দ্রুত সম্প্রসারণ তেলের চাহিদা কমিয়ে দিচ্ছে। বর্তমানে চীনে বিক্রি হওয়া নতুন যাত্রীবাহী গাড়ির প্রায় অর্ধেকই বৈদ্যুতিক বা হাইব্রিড।
আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত বছর শুধু চীনের বৈদ্যুতিক যানবাহন বহরই দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেলের চাহিদা কমিয়েছে।
এছাড়া বেইজিং জ্বালানি রপ্তানির কোটা সীমিত করেছে এবং পরিশোধনাগারগুলোও উৎপাদন কমিয়েছে। ফলে অতিরিক্ত তেল কেনার প্রয়োজনীয়তাও কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব পদক্ষেপ মিলিয়ে চীন তেলবাজারে এক ধরনের ‘অদৃশ্য হাত’ হিসেবে কাজ করেছে। তেলের জন্য প্রতিযোগিতা বাড়ানোর বদলে দেশটি পিছিয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার চাপ কমেছে। এর সুফল পেয়েছে ভারতসহ অন্যান্য আমদানিনির্ভর দেশ।
তবে পরিস্থিতি দীর্ঘদিন একই থাকবে না। সংকট মোকাবিলায় ব্যবহৃত মজুত তেল একসময় পুনরায় পূরণ করতে হবে।
সৌরভ মিত্র বলেন, তেলের দাম আরও কমলে চীন আবার বড় ক্রেতা হিসেবে বাজারে ফিরতে পারে। সংকটকালে ব্যবহৃত মজুত একসময় পুনরায় পূরণ করতেই হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি চালু হলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে গেলে বৈশ্বিক বাজারে অতিরিক্ত তেলের সরবরাহ তৈরি হতে পারে। ইরানের রপ্তানিও বাড়লে বাজারে তেলের জোগান আরও বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু সেই অতিরিক্ত সরবরাহ বাস্তবে বাজারে চাপ তৈরি করবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে চীনের ওপর। যদি বেইজিং দ্রুত মজুত পুনর্গঠন শুরু করে, তাহলে অতিরিক্ত তেলের বড় অংশ সহজেই শোষিত হবে। অন্যথায় তেলের দামে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমুখী চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, কম তেলের দাম ভারতের আমদানি ব্যয় কমাতে সহায়তা করেছে। এর পেছনে চীনের কম ক্রয়নীতিরও ভূমিকা রয়েছে।
তবে সৌরভ মিত্রের মতে, ভারতের উচিত নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী করা।
তার মতে, ভারত ইতোমধ্যে সরবরাহের উৎস বৈচিত্র্যময় করেছে এবং উল্লেখযোগ্য কৌশলগত মজুতও গড়ে তুলেছে। তবে আরও বড় পরিসরে মজুত সক্ষমতা তৈরি করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন ধরে তেলবাজারের ব্যবসায়ীরা সংকেত খুঁজতেন রিয়াদ, মস্কো এবং ওয়াশিংটনের দিকে।
কিন্তু এখন তাদের সমান গুরুত্ব দিতে হতে পারে বেইজিংকে। বিশাল মজুত ব্যবহার, আমদানি কমানো, বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার এবং প্রয়োজনে আবার বড় ক্রেতা হিসেবে বাজারে ফেরার ক্ষমতা চীনকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যা খুব কম দেশেরই রয়েছে।
ফলে বৈশ্বিক তেলবাজারের পরবর্তী বড় পরিবর্তন হয়তো আর পারস্য উপসাগর থেকে ছেড়ে যাওয়া কোনো তেলবাহী জাহাজের মাধ্যমে আসবে না; বরং সেটি নির্ধারিত হতে পারে বেইজিংয়ে নেওয়া একটি ক্রয় সিদ্ধান্তের মাধ্যমে।







