চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Cable

পানিতে ডুবে ৩১ মাসে ২ হাজার ৫৬৮ শিশুর মৃত্যু

Nagod
Bkash July

দেশের বিভিন্ন জেলায় পানিতে ডুবে গত ৩১ মাসে (২০২০ জানুয়ারি-২০২২ আগস্ট) দুই হাজার ৫৬৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। যা শতকরা হিসেবে ৮৬ শতাংশ।

Reneta June

বর্তমানে পানিতে ডুবার পরিস্থিতি অনুধাবন করার জন্য একটি বৃহৎ জরিপ করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের ঊর্ধ্বতনরা বলছেন, পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যুর বিষয়ে কাজ করতে আন্তরিক সরকার। এছাড়াও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতা তৈরি দরকার।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমির অধীনে ২৭১ কোটি ৮৩ লাখ টাকার ‘ইনট্রিগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম-সেইফ ফ্যাসিলিটিজ’ প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার।

এই প্রকল্পের মোট বরাদ্দের ২৬২ কোটি ১৭ লাখ টাকা দেবে সরকার আর বাকি ৫৪ কোটি ২১ লাখ টাকা দিবে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সাহায্য সংস্থা রয়্যাল ন্যাশনাল লাইফবোট ইন্সটিটিউশন, আরএনএলআই এবং যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক সাহায্য সংস্থা ব্লুমবার্গ ফিলানথ্রোপিজ।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের (জিএইচএআই) সহযোগিতায় গণমাধ্যম উন্নয়ন ও যোগাযোগ বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘সমষ্টি’ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। এই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করেছে।

সমষ্টির তথ্য মতে, দেশে ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৩১ মাসে মোট দুই হাজার ৫৬৮ জন শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে।  যা শতকরা হিসেবে ৮৬ শতাংশ।

গত ৩১ মাসে পানিতে ডুবে মারা গেছে মোট দুই হাজার ৯৮৬ জন।  এদের মধ্যে শিশু (১৫-১৮ বছর) দুই হাজার ৫৬৮ জন। বাকিরা আঠারোঊর্ধ্ব যা শতকরা হিসেবে ১৪ শতাংশ।

সমষ্টির তথ্যে আরও জানা যায়,  ২০২২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ বছরের নীচে পানি ডুবে শিশু মারা গেছে ৩৮২ জন। যা ২০২১ সালে ছিল ৫৯৭ এবং ২০২০ সালে ছিল ২৬০ জন।২০২২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত পাঁচ থেকে নয় বয়সী শিশুদের মধ্যে পানিতে ডুবে মারা গেছে ২৭৪ জন। যা ২০২১ সালে ছিল ৩৮৭ ও ২০২০ সালে ২৬৮ জন।

২০২২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১০ থেকে ১৪ বছরের শিশু মারা গেছে ৮২ জন। যা ২০২১ ও ২০২০ সালে ছিল ১০৬ জন।২০২২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ১৫ থেকে ১৮ বয়সীদের মধ্যে মারা গেছে ৩৩ জন। যা ২০২১ সালে ছিল ৪৩ জন ও ২০২০ সালে ছিল ৩০ জন।

পানিতে ডুবে শিশু মৃত্যু প্রতিরোধে কাজ করছে দি সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চের (সিআইপিআরবি) ভাসা প্রকল্পের আঁচল ও সুইম সেভ।

‘আঁচল’-এ সুরক্ষিত ৮০ শতাংশ শিশু
আঁচল (শিশু যত্ন কেন্দ্র)-এমন একটি ইনজুরি ঝুঁকিমুক্ত পরিবেশ যেখানে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত একজন আঁচল মা (প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মহিলা) এবং আঁচল অ্যাসিসটেন্ট ( সহকারী) শিশুদের দেখভাল করেন। অন্যদিকে আঁচল থেকে গ্র্যাজুয়েট হয়ে আসা শিশুদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাঁতারু দিয়ে সাঁতার শেখায় সুইম সেফ (জীবনের জন্য সাঁতার)। গত এক যুগে কমপক্ষে ৭ লাখ শিশুদের সাঁতার শিখিয়েছে।

প্রজেক্ট ভাসার টিম লিডার (আঁচল) ডা. শাহনাজ পারভীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমরা ২৫-৩০ জন জন শিশুদের নিয়ে একজন আঁচল মা ও তার সহকারী দিয়ে দিবাযত্ন কেন্দ্র করেছি। সেখানে শিশুদের চিত্ত বিনোদনসহ লেখাপড়া করানো হয়। যে সময়টাতে মা-বাবারা দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত থাকে সেসময়ে সপ্তাহে ছয়দিন সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১ টা পর্যন্ত কার্যক্রম চালায় আঁচল। আঁচল শিশুদের প্রারম্ভিক বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, আঁচলের ৪০০টি শাখা এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১০ হাজার বাচ্চার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করে, স্কুলে যাওয়া ১১ থেকে ১৪ বয়সী শিশুদের পানিতে ডুবা প্রতিরোধে সচেতনামূলক কর্মসূচী গ্রহণ করে, এছাড়াও তিন হাজার কমিউনিটি ভলান্টিয়ারদের পানিতে ডুবা প্রতিরোধে উদ্ধার কার্যক্রম, দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া শেখানো হয়।

ডা. শাহনাজ বলেন,  এখন পর্যন্ত আমরা দেখেছি আঁচলের তত্ত্বাবধানে থাকা বাচ্চারা পানিতে ডুবে যাওয়া থেকে ৮০ শতাংশ সুরক্ষিত।

সিআইপিআরবি জানায়, গবেষণার অংশ হিসেবে ৫৫ হাজার ৭৯০টি শিশুবেষ্টনী (প্লে-পেন) এবং ৩ হাজার ২০৫টি ডে-কেয়ার সেন্টার (‘আঁচল’) ৭ উপজেলার ৫১টি ইউনিয়নে স্থাপন করা হয়। গবেষণার ২ বছর ধরে প্রায় ১২ লাখ জনগোষ্ঠীর দুর্ঘটনাজনিত আঘাত বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে ১ বছর থেকে ৪ বছর বয়সী ১ লাখ ২২ হাজার ২৩ শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ গবেষণার ৭০ হাজার শিশুকে ডে-কেয়ার সেন্টার ও শিশুবেষ্টনী বা উভয় কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।

‘সুইম সেফ’-এ সুরক্ষিত ৯০ শতাংশ শিশু
সুইম সেফের ডেপুটি টিম লিডার মো. শাফকাত হোসেন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ২০০৫ সালে সুইম সেফের কার্যক্রম শুরু হয়। আমরা দেখেছি বরিশাল, পিরোজপুর ভোলায় শিশুদের মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি থাকায় ২০১৬ সালে আমরা এখানে ভাসা প্রকল্পের কাজ শুরু করি। আমরা দেখেছি সুইম সেফের তত্ত্বাবধানে থাকা বাচ্চারা ৯০ শতাংশ সুরক্ষিত। আমরা এখন পর্যন্ত তিন বছরে ছয় থেকে দশ বয়সী ৩০ হাজার বাচ্চাদের সাঁতার ও উদ্ধার কাজ শিখিয়েছি। গত এক যুগে প্রায় ৭ লাখ শিশু বাচ্চা সাঁতার শিখেছে।

তিনি বলেন, আমরা ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সাঁতার শেখানোর জন্য ৬৫টি পুকুর নির্বাচন করি। পুকুরগুলো সাড়ে ১২ মিটার। সাঁতারের দলে ১৫ জন থাকলেও সুরক্ষার জন্য এক ব্যাচে ৫ জন নিয়ে সাঁতার শেখানো হয়।

শাফকাত বললেন, ছয় থেকে দশ বয়সী শিশুরা যদি ২৫ মিটার সাঁতার পারে, ৩০ সেকেন্ড পানিতে ভেসে থাকতে পারে এবং ভুক্তভোগীকে পানিতে না নেমে যদি উদ্ধার করতে পারে তাহলে তাকে আমরা সুইম সেভ গ্র্যাজুয়েট হিসেবে অ্যাখায়িত করি।

বিশেষজ্ঞদের বৃহৎ জরিপের তাগিদ
বর্তমানে পানিতে ডুবার পরিস্থিতি অনুধাবন করার জন্য একটি বৃহৎ জরিপ করতে হবে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা, যার মাধ্যমে পানিতে ডুবার ফলে মৃত্যু, পঙ্গুত্ব ও সামাজিক প্রভাবের ব্যাপকতা পরিমাপ করা যাবে।

বেসরকারি সংগঠন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) উপনির্বাহী পরিচালক ডা. আমিনুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ভাসা প্রকল্পটি পানিতে ডুবে মৃত্যু কমানোর লক্ষ্যে দেশের বরিশাল বিভাগে নেওয়া একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পানিতে ডুবার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি লক্ষ্য রেখে, যথাযথ ও টেকসই কার্যক্রম কাজে লাগিয়ে এই প্রকল্পটি বিভিন্ন সেক্টরের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণ নির্ভর কর্মকৌশল তৈরি করেছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানালেন, পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর মতো ভয়াবহ সমস্যা স্থায়িত্বশীল সমাধানের লক্ষ্যে গণমাধ্যম ও বেসরকারি সংগঠনসহ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে সরকার আন্তরিক।নদীর পাড়ের শিশুরা এই ঝুঁকি নিয়েই বাঁচে। এসব সমস্যার মূল কারণ হলো আর্থিক তারতম্য। এসব প্রতিরোধ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

দেশে ১৬টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় আট হাজার শিশু-যত্নকেন্দ্র
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, শিশুর সুরক্ষা এবং মৃত্যুঝুঁকি কমিয়ে আনতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘ইনটেগ্রেটেড কমিউনিটি বেইজড সেন্টার ফর চাইল্ড কেয়ার, প্রটেকশন অ্যান্ড সুইম- সেইফ ফেসিলিটিজ’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে সারা দেশে ১৬টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় আট হাজার শিশু-যত্নকেন্দ্র পরিচালনা করা হবে। এসব যত্নকেন্দ্রে কাজ পাবে ১৬ হাজার গ্রামীণ নারী। প্রতিটি যত্নকেন্দ্রে ২৫ শিশুকে ভর্তি করা হবে। একই সঙ্গে ৬-১০ বছর বয়সী শিশুদের সাঁতার শেখানো হবে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: গবেষণা মোতাবেক পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিপূর্ণ সময় অর্থাৎ সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিশুরা এসব কেন্দ্রে থাকবে। কেন্দ্রে পাঁচ ঘণ্টা থাকার সময় শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের সহায়ক নানা শিক্ষা ও বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ ৪৫ উপজেলায় এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী দুই লাখ শিশু কার্যক্রমটির আওতায় আসবে।

একইসঙ্গে এ ৪৫ উপজেলায় ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী তিন লাখ ৬০ হাজার শিশুকে সাঁতার শেখানো হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতাভুক্ত অঞ্চলের দুই লাখ মা-বাবাকে সচেতন করা হবে, যেন তারা শিশুযত্ন, সুরক্ষা এবং বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারেন। এটার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে আমরা যদি সফল হই, তাহলে সারা দেশেই এটি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

BSH
Bellow Post-Green View