নিভৃত পল্লী থেকে উঠে এসে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছে লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশন। বেশরগাতি গ্রামের এই উদ্যোগ আজ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কারিগরি প্রশিক্ষণ ও সামাজিক নিরাপত্তায় এক বিস্তৃত কর্মযজ্ঞে পরিণত হয়েছে।
২০০৩ সালে প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ মো. লতিফুর রহমান-এর হাত ধরে ক্ষুদ্র শিক্ষাবৃত্তি কার্যক্রম দিয়ে যাত্রা শুরু হয় এই ফাউন্ডেশনের। বর্তমানে তার দুই সন্তান সাবেক সচিব ড. মো. ফরিদুল ইসলাম এবং প্রবাসী সিপিএ মো. রফিকুল ইসলাম জগলু—এর নেতৃত্বে এটি একটি বহুমাত্রিক উন্নয়ন মডেলে পরিণত হয়েছে।

ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক মো. বোরহান উদ্দিন জানান, শুরুতে শুধু মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হলেও পরবর্তীতে এলাকার বহুমুখী সমস্যার সমাধানে সাতটি অঙ্গ সংগঠন গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি প্রশিক্ষণসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
দুর্যোগকালীন সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ‘উন্নয়ন স্বেচ্ছাসেবক কার্যক্রম (উসকে)’ নামে একটি সংগঠন গঠন করা হয়েছে, যা এনজিও বিষয়ক ব্যুরোতে নিবন্ধিত। এই প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সিডর-আইলা থেকে শুরু করে করোনাকালীন সংকটে ত্রাণ, খাদ্য ও অক্সিজেন সহায়তা প্রদান করা হয়েছে।

শিক্ষা খাতে ফাউন্ডেশনটির অবদান উল্লেখযোগ্য। প্রকল্প পরিচালক মো. অলিউল্লাহ জানান, ২০২৫ সালে গোল্ডেন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। এই সহায়তা পেয়ে অনেক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
এছাড়া বেকারত্ব দূর করতে কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে গড়ে তোলা হয়েছে বাগেরহাট সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক মো. ওলিউজ্জামান মিনা জানান, এখানে টেইলারিং, ড্রাইভিং, কম্পিউটার অপারেশন, গ্রাফিক্স ডিজাইন ও ইলেকট্রিক্যাল ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
নারীদের স্বাবলম্বী করতে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হচ্ছে। প্রশিক্ষক রোকাইয়া পারভীন সুমনা জানান, ৫৪ দিনের নিবিড় কোর্সের মাধ্যমে নারীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যসেবায়ও রয়েছে বড় অবদান। স্বাস্থ্য বিভাগের চিকিৎসক ডা. প্রদীপ কুমার বকসী জানান, প্রতি শনিবার ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা সেবা দেন এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা পেয়েছেন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নেও কাজ করছে ফাউন্ডেশনটি। লতিফ মাস্টার পাবলিক লাইব্রেরি এর সভাপতি মো. সালমান জানান, তরুণদের মাদকমুক্ত রাখতে ‘বাগেরহাট শিল্প সাংস্কৃতিক সংস্থা’ গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এলাকায় নির্মিত হয়েছে ‘বায়তুল লতিফ জামে মসজিদ’, ‘স্বপ্ননীড় এতিম ও বৃদ্ধাশ্রম’, ‘রকেট স্পোর্টিং ক্লাব’ ও ‘বেশরগাতি এগ্রো ফার্ম’। ভবিষ্যতে মিনি স্টেডিয়াম, আধুনিক মাদ্রাসা, গার্লস স্কুল, কমিউনিটি সেন্টার, হাসপাতাল ও দুগ্ধ কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক উদ্যোগ কীভাবে একটি গ্রামকে বদলে দিতে পারে, তার অনন্য উদাহরণ এখন বেশরগাতি। মানবিকতা, দায়বদ্ধতা ও শেকড়ের প্রতি টান থাকলে একটি জনপদকে আলোকিত করা সম্ভব লতিফ মাস্টার ফাউন্ডেশন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।








