মো. শফি উল্লাহ রিপন: হোটেল স্টাফদের দেখা নেই, ক্যাশ কাউন্টারের হাঁকডাক কিংবা বেলের ক্রিং ক্রিংও নেই, নেই সুসজ্জিত টেবিলে খাওয়ার ধুম। হোটেল বলতে যে পাঁচমিশালি কথার হট্টগোল, সেসবের কিছুই নেই সেখানে। ক্যাশিয়ার বিহীন কাউন্টারে রাখা একটি বক্সে ইচ্ছেমতো রেখে দেন টাকা। যে হোটেলের নাম ‘ইচ্ছে মতো দামের হোটেল’।
শনিবার (১৬ আগস্ট) দুপুর ১টার দিকে হোটেলে গিয়ে দেখা যায়, পরিবহন চালক, বিক্রয় প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, ক্ষুদ্র দোকান মালিকসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার গরীব, অসহায়, ক্ষুধার্ত মানুষ হোটেলের সামনে ভিড় করছেন এবং ইচ্ছে মতো খাবার খেয়ে নির্ধারিত বক্সে টাকা রেখে দিচ্ছেন। নুর আহাম্মদ নামের স্থানীয় একজন এই হোটেলটির মালিক।
আজকের খাবারের জন্য ডিম, সবজি ও ডাল রান্না করা হয়। যার বর্তমান বাজার মূল্য- মোটামুটি ৭০ থেকে ৮০ টাকা হওয়ার কথা, যদিও বেশিরভাগ মানুষ ১০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২০ টাকা পরিশোধ করছেন। কাউন্টারে কেউ না থাকায় কয়েকজনকে টাকা না দিয়ে চলে যেতেও দেখা যায়।
হোটেল কর্তৃপক্ষ বলেন, কেউ টাকা দিতে অপারগ হলে তাদের কাছ থেকে টাকা নেয়া হয় না।
প্রতিদিন দুপুর হলেই উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে এই হোটেলে এসে বসে পড়েন অসহায় মানুষ। এক বেলা ভালো পরিবেশে ভালো খাবার খেয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন তারা। আর এ খাবারের বিনিময়ে দিতে হয় না নির্ধারিত কোন মূল্য।
পথশিশু, শ্রমজীবী এবং নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের জন্য এমন আয়োজন করা হয়েছে ফেনী জেলার বিলোনিয়া সড়কের পরশুরাম দক্ষিণ বাজারে চৌমুড়ি সংলগ্ন রাস্তার পাশে। ইচ্ছে মতো দামের হোটেল নাম হলেও এটি ইতোমধ্যেই পরশুরামবাসীর কাছে ‘গরীবের হোটেল’ নামে পরিচিতি পেয়েছে।
গত ১ আগস্ট থেকে চালু হওয়া ‘ইচ্ছে মতো দামের হোটেল’-এ দুপুরের খাবারে প্রতিদিন ইচ্ছেমতো ভাত, সবজি, ডাল দিয়ে খাবার শেষে নির্ধারিত বক্সে ইচ্ছে মতো টাকা পরিশোধ করার সুযোগ রযেছে। হোটেলের ক্যাশে কেউ না থাকলেও একটি বক্স রাখা, যেখানে লেখা ‘ইচ্ছেমতো টাকা রেখে দেন’।

হোটেল কর্তৃপক্ষ একেক দিন একেক তরকারি রান্না করেন। সপ্তাহে দুই দিন ডিম, দুই দিন মুরগির মাংস, দুই দিন মাছ রান্না করেন। সপ্তাহে প্রতি শুক্রবার রান্না হচ্ছে বিরিয়ানী।
হোটেল পরিচালনার দায়িত্বে থাকা আবুল কালাম বলেন, প্রতিদিন ১৫০ জনের জন্য খাবার রান্না করা হয়। শতাধিক লোকের কাছে খাবার বিক্রি করে সাধারণত ৪০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ দুই হাজার ২০০ টাকা পেয়েছেন।
হোটেল মালিক নুর আহাম্মদ বলেন, কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। যতদিন বেঁচে থাকবো, ততদিনই এমন মহৎ কাজ করে যেতে চান বলেও জানান তিনি।
নুর আহাম্মদ একজন সরকারি চাকরিজীবী, গ্রামের বাড়ি ফুলগাজী উপজেলায়। হোটেলটি পরিচালনা করেন তার ভাতিজা মীর হোসেন ও আবুল কালাম। যদিও মালিক নুর আহাম্মদ এই মানবিক কাজে নিজেদের পরিচয় দিতে রাজি হননি।
হোটেলে খেতে আসা ওমর ফারুক নামের একজন অটোচালক বলেন, তিনি পরশুরাম বাজারে অটো চালান। বাড়িতে গিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হয় না। তাই তিনি উদ্বোধনের পর থেকে এই হোটেলে দুপুরের খাবার খান।
তিনি বলেন, তার হিসেবে প্রতিবেলা ৬০ থেকে ৭০ টাকা দাম হলেও ২০ থেকে ৩০ টাকা করে দিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার মুরগীর মাংস খেয়ে তিনি ৩০ টাকা দিয়েছেন আজকে ডিম খেয়ে বিশ টাকা দিয়েছেন।

পরশুরাম হাসপাতাল রোড়ের ফল ব্যবসায়ী মো. ইয়াসিন বলেন, প্রতিদিন বাড়িতে গিয়ে দুপুরের খাবার খেতে হলে তার ১০০ টাকার উপরে খরচ হয়। তিনি গত কদিন ধরে ইচ্ছেমতো দামের হোটেলে দুপুরের খাবার খাচ্ছেন, এতে তার অনেক উপকার হচ্ছে।
পরশুরাম উপজেলা বিআরডিবির চেয়ারম্যান আবু তালেব রিপন বলেন, নিত্যপণ্যের উর্ধ্বগতিতে বিপাকে নিম্ন-আয়ের মানুষ। নিত্যপণ্যের বাজারের এই অবস্থায় ফুটপাতের হোটেলগুলোতে ডিম, ভর্তা, ডাল দিয়ে এক বেলা খেলেও বিল হয় ৫০ থেকে ৬০ টাকা। মাঝারি মানের রেস্টুরেন্টে এক বেলা ভাত, মাছ কিংবা মাংস খেতে খরচ করতে হয় ১০০ থেকে ৩০০ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে পরশুরাম এই প্রথম চালু হলো ইচ্ছেমতো দামের হোটেল দুপুরের খাবার খাইয়ে ইচ্ছে মতো দাম পরিশোধ করছেন, এটা পরশুরামের জন্য অকল্পনীয়।
হোটেলের পরিচালক আবুল কালাম জানান, গরীব, হতদরিদ্র ও নিম্ন-আয়ের মানুষজনের কথা চিন্তা করে তারা পরশুরামে হোটেলটি চালু করেছেন। ভবিষ্যতে সেবামূলক কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সকলের কাছে দোয়া ও সহযোগিতা চেয়েছেন।







