বাংলাদেশের সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) বিপুল সমর্থনে জয় পাওয়ার পর নয়াদিল্লি সতর্ক উষ্ণতায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলা ভাষায় দেওয়া এক বার্তায় বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান। তিনি একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিবেশী বাংলাদেশের প্রতি ভারতের সমর্থনের অঙ্গীকার করেন এবং দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
তবে কূটনৈতিক ভাষার আড়ালে ছিল সতর্কতা। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ‘জেন জি’ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। তার দল আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশের অনেকেই অভিযোগ করেন, দিল্লি দীর্ঘদিন ধরে ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠা হাসিনাকে সমর্থন দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তে হত্যা, পানি বণ্টন বিরোধ, বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মতো পুরনো ক্ষোভ। বর্তমানে ভিসা সেবা প্রায় বন্ধ, আন্তঃসীমান্ত ট্রেন ও বাস চলাচল স্থগিত এবং ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইট উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
দিল্লির দ্বিধা: কীভাবে সম্পৃক্ততা?
দিল্লির সামনে প্রশ্ন এখন বিএনপি সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক করবে কি না, তা নয় বরং কীভাবে করবে। উত্তর-পূর্ব ভারতের বিদ্রোহ ও উগ্রবাদের প্রশ্নে নিজেদের ‘লাল দাগ’ নিশ্চিত রেখে, একই সঙ্গে উত্তপ্ত রাজনৈতিক বক্তব্য প্রশমিত করাই ভারতের চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের মতে, সম্পর্ক পুনর্গঠন সম্ভব তবে প্রয়োজন সংযম ও পারস্পরিকতা। লন্ডনের এসওএএস ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, বিএনপি রাজনৈতিকভাবে অভিজ্ঞ ও তুলনামূলক মধ্যপন্থী দল। তবে তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দিল্লির কাছে বিএনপি অচেনা নয়। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক দ্রুত শীতল হয়ে পড়ে। সেই সময় পারস্পরিক অবিশ্বাস ও উত্তেজনা বাড়ে।
২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র জব্দের ঘটনা যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অস্ত্র জব্দের ঘটনা ভারতের উদ্বেগ বাড়ায়। অভিযোগ ছিল, অস্ত্রগুলো ভারতীয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জন্য আনা হয়েছিল।
অর্থনৈতিক সম্পর্কও স্থিতিশীল ছিল না। টাটা গ্রুপ-এর প্রস্তাবিত ৩ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ গ্যাসের মূল্য নিয়ে জটিলতায় আটকে যায় এবং শেষ পর্যন্ত ২০০৮ সালে ভেস্তে যায়।
হাসিনায় ভারতের বিনিয়োগ
এই অভিজ্ঞতার কারণেই ভারত পরবর্তীতে শেখ হাসিনার ওপর কৌশলগতভাবে বেশি নির্ভরশীল হয়ে ওঠে। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা হাসিনা বিদ্রোহ দমন, সংযোগ বৃদ্ধি এবং চীনের বদলে ভারতের সঙ্গে কৌশলগত সমন্বয় জোরদার করেন যা দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে বর্তমানে দিল্লিতে নির্বাসিত হাসিনা ২০২৪ সালের নিরাপত্তা দমন-পীড়নের ঘটনায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি। জাতিসংঘের তথ্যমতে, ওই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন, যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। তাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অস্বীকৃতি সম্পর্ক পুনর্গঠনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পাকিস্তান ফ্যাক্টর
পাকিস্তান ১৯৭১ সালে পরাজিত ভারতের পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রতিদ্বন্দ্বী—এ সমীকরণে সংবেদনশীল হলেও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
হাসিনার পতনের পর ঢাকা দ্রুত ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্ক উষ্ণ করতে শুরু করে। ১৪ বছর পর ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। দীর্ঘ ১৩ বছর পর পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন। সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও আলোচনায় ফিরেছে; ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাণিজ্য বেড়েছে ২৭ শতাংশ।
দিল্লিভিত্তিক প্রতিরক্ষা অধ্যয়ন ও বিশ্লেষণ ইনস্টিটিউট-এর গবেষক স্মৃতি পট্টনায়েক বলেন, বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ—পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেই পারে। তবে হাসিনার আমলে সম্পৃক্ততা প্রায় অনুপস্থিত ছিল; এখন দোলক যেন উল্টো দিকে বেশি দুলছে।
‘নতুন স্বাভাবিক’ নাকি নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা?
ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, ভারত বড় প্রতিবেশী হিসেবে উদ্যোগ নিতে পারে। বাংলাদেশ একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন সম্পন্ন করেছে—এখন গঠনমূলক সম্পৃক্ততা জরুরি।
নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো সম্পর্কের প্রধান ভিত্তি। দুই দেশ নিয়মিত সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ টহল ও প্রতিরক্ষা সংলাপ করে। প্রতিরক্ষা ক্রয়ে ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ভারতীয় ঋণসুবিধাও চালু রয়েছে।
তবু সীমান্তের উত্তপ্ত বক্তব্য, রাজনৈতিক মঞ্চ ও টেলিভিশন আলোচনায় উসকানিমূলক মন্তব্য—এসব দুই দেশের জনমনে সন্দেহ বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা যদি ভারতবিরোধী আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে এবং দিল্লি যদি উত্তেজনাপূর্ণ বার্তা কমায়, তবে সম্পর্ক ‘নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ থেকে বেরিয়ে বাস্তববাদী অংশীদারত্বে ফিরতে পারে।
সামনে পথ কোন দিকে?
৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক সব মিলিয়ে বিচ্ছিন্নতা টেকসই নয়। বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার; আবার এশিয়ায় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার ভারত।
বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের অবিশ্বাস সত্ত্বেও বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা ও তারেক রহমানের সংযত অবস্থান ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এখন দেখার বিষয় সম্পর্ক পুনর্গঠনে প্রথম পদক্ষেপ নেয় কে?
অনেকের মতে, বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতেরই এগিয়ে আসা উচিত। শেষ পর্যন্ত, কূটনৈতিক পুনর্গঠন নির্ভর করবে কথার চেয়ে আস্থার ওপর বেশি।








