ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, প্রশমন ও প্রতিকার নিশ্চিত করতে সমন্বিত নীতি, জবাবদিহি এবং সচেতনতা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন বক্তারা।
বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) আয়োজিত “ডিজিটাল উন্নয়ন ও প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ, প্রশমন ও করণীয়: প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা” শীর্ষক জাতীয় পরামর্শ সভায় এ আহ্বান জানানো হয়।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ সভা সঞ্চালনা করেন উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. এস এম মোরশেদ।
সভায় স্বাগত বক্তব্য দেন এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএনএনআরসির প্রধান নির্বাহী এ এইচ এম বজলুর রহমান।
আলোচনায় অংশ নেন আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন, এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ব্যারিস্টার খলিলুর রহমান, সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম, বিটিআরসির উপপরিচালক মো. ফারহান আলম, জিএফএ কনসালটিং গ্রুপের নাগরিকতা কর্মসূচির ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এক্সপার্ট মো. নুরুল ইসলাম এবং বিআইডিএসের রিসার্চ ফেলো তাহরিনা তাহরীমা চৌধুরী প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে, সেবা গ্রহণকে করেছে দ্রুততর। কিন্তু একই সঙ্গে অনলাইনে ব্ল্যাকমেল, পরিচয় জালিয়াতি, ছবি বিকৃতি, ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস, সাইবার হয়রানি ও ঘৃণাত্মক আক্রমণের মতো সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। নারী, শিশু, কিশোরী এবং ভিন্ন লিঙ্গপরিচয়ের মানুষ এ ধরনের সহিংসতার বেশি শিকার হচ্ছেন।
সূচনা বক্তব্যে এ এইচ এম বজলুর রহমান বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের এই সময়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার নতুন ও জটিল রূপগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে হবে। প্রতিরোধ, সুরক্ষা, দ্রুত প্রতিকার এবং ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক সহায়তা নিশ্চিত করতে এখনই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
সভায় বক্তারা নীতি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচার ও প্রতিকারপ্রাপ্তি সহজ করা, প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্ম ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজপর্যায়ে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া অ্যাকাউন্ট কমাতে জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক যাচাই এবং বাংলাদেশ-উপযোগী সেবার বিষয়টিও আলোচনায় আসে।
সভায় উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, ২০২৪ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের তথ্য অনুযায়ী, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারী নারীদের ৮৯ শতাংশ অন্তত একবার অনলাইন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন।
আলোচনায় প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিভিন্ন রূপ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সাইবার স্টকিং, সাইবার বুলিং, ডক্সিং, হ্যাকিং, অনলাইন হয়রানি, ইমেজভিত্তিক নির্যাতন, চাইল্ড গ্রুমিং, প্রযুক্তির সহায়তায় যৌন নির্যাতন এবং জেন্ডারভিত্তিক ঘৃণামূলক বক্তব্য।
বিটিআরসির উপপরিচালক মো. ফারহান আলম বলেন, গত বছর সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট অপসারণের জন্য ১৩ হাজার ২৩টি অভিযোগ পেয়েছে বিটিআরসি, যার মধ্যে ১২ হাজারের বেশি কনটেন্ট অপসারণ করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রায় ৯০ শতাংশই নারী। তিনি বলেন, নারীদের অনলাইন হয়রানি প্রতিরোধে পারিবারিক পর্যায় থেকেই সচেতনতা বাড়াতে হবে।
আইসিটি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন বলেন, প্রযুক্তির সহায়তায় সংঘটিত জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা মোকাবিলায় দেশে কয়েকটি আইন রয়েছে। তবে এসব আইন সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে আরও বেশি জানাতে হবে।
সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগীরা আইনি সহায়তা না চাইলে পুলিশের পক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই অভিযোগ করার সংস্কৃতি ও আইনি সহায়তা চাওয়ার বিষয়ে সচেতনতা জরুরি।
এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ব্যারিস্টার খলিলুর রহমান বলেন, অনলাইন ব্যবহার করে কী ধরনের সহিংসতা ও প্রতারণা ঘটতে পারে, সে বিষয়ে ব্যবহারকারীদের সচেতন করা প্রয়োজন।
সভায় বক্তারা জানান, সহিংসতার শিকার নারীরা পুলিশের Cyber Support for Women সেবার হটলাইন ০১৩২০-০০০৮৮৮, ফেসবুক পেজ Police Cyber Support for Women (PCSW) এবং ই–মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ জানাতে পারেন।
আলোচনায় আরও উঠে আসে, অনলাইনে নারীরা সবচেয়ে বেশি ডক্সিংয়ের শিকার হন, অর্থাৎ অনুমতি ছাড়া তাদের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করে হুমকি দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, এ ধরনের সহিংসতা একজন নারীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রভাব ফেলে, তাই প্রশাসনিক ও সামাজিক উভয় পর্যায়েই আরও শক্ত প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
মো. নুরুল ইসলাম বলেন, সামাজিক লজ্জা ও ভয় অনেক নারীকে অভিযোগ করা থেকে বিরত রাখে। ভুয়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে নারীদের হয়রানির প্রবণতা রোধে অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে পরিচয় যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ বিষয়ে ব্যাপক প্রচারও জরুরি।
সভায় আরও বক্তব্য দেন সোহরাব হাসান, শামীমা আক্তার, শাহনাজ মুন্নী, শাহনাজ শারমীন, জেবা মোবাশ্বিরা, মোহাম্মদ আবদুল হক, মো. কাউসার উদ্দিন, মঈন আহমেদ, আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রফেসর ড. হাকিকুর রহমান, শারমীন ইসরাইল, ড. মো. নুরুজ্জামান, এস এম সেলিম, সিকান্দার আলী, মাহমুদুল হাসান, ইঞ্জিনিয়ার সাফায়েত হোসেন, লাকি আক্তার, নুসরাত চৌধুরী ছোয়া, মহাফুজা হক নীলাসহ অনেকে।
আলোচনায় ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, ডেটা সুরক্ষা আইন, এবং আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ-উপযোগী নীতিগত সমন্বয়ের বিষয়ও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংলাপের মাধ্যমে দেশভিত্তিক সেবা নিশ্চিত করা গেলে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও অনলাইন সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব।







