শরীরে অর্ধেক ফুসফুস নিয়ে যখন একজন মানুষ জন্মগ্রহণ করেন, তখন বেঁচে থাকাটাই তার জন্য হয়ে ওঠে কঠিন। অন্য সবার মতো সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন-যাপন করাটাও প্রায় অসম্ভব। নিয়মিত শ্বাসকষ্টকে সঙ্গী করেই চলে বেঁচে থাকার লড়াই। এসব প্রতিকূলতাকে জয় করেই ক্রিকেটকে রাজকীয়ভাবেই বিদায় দিলেন স্টুয়ার্ট ব্রড।
ওভাল টেস্টের মাঝপথেই সবাইকে অবাক করে দিয়ে সব ধরনের ক্রিকেটকে বিদায়ের কথা জানান ব্রড। টেস্ট ইতিহাসে পঞ্চম সর্বাধিক ৬০৪ উইকেট শিকারি বোলার হয়ে কিংবদন্তিদের কাতারে নিজের নাম লিখিয়েছেন। ইংলিশ পেসার যেভাবে নিজের ক্যারিয়ার প্রায় ১৭ বছর টেনে নিতে গেছেন, তা যেন রূপকথার গল্পকেও হার মানাবে।
জন্মের সময় ফুসফুস সম্পূর্ণভাবে বিকশিত না হওয়ায় হাঁপানির সঙ্গে অবিরাম লড়াই করে চলেছেন ৩৭ বর্ষী ক্রিকেটার। স্কুলে পড়া অবস্থায় তার ভয়াবহ হাঁপানির সমস্যা দেখা দেয়। কিশোর বয়সে লজ্জায় নিজের অসুস্থতার কথা বন্ধুদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখতেন। সবাইকে বলতেন, অসুস্থতার কারণে স্কুলে আসতে পারিনি।
গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে সদ্য অবসর নেয়া ব্রড বলেছিলেন, ‘১৪ বছর বয়সে আমার হাঁপানির সমস্যা হয়েছিল। আমাকে দুই সপ্তাহের জন্য স্কুলে ছুটিতে থাকতে হয়েছিল। আমার বন্ধুদের বলিনি যে কেন আমি স্কুলে ছিলাম না। শুধু বলেছিলাম আমি খুব একটা ভালো ছিলাম না, যা চিন্তা করে এখন নিজেকে পাগল মনে হচ্ছে।’
বিস্ময়কর হলেও সত্যি, আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেকের পর দীর্ঘ সময় ব্রড তার শারীরিক সমস্যার কথা সবার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। ২০১৫ সালে অ্যাশেজ শুরুর আগে ক্যাম্পে সতীর্থদের সঙ্গে খোশ মেজাজেই ছিলেন সাবেক এ ক্রিকেটার। আড্ডার ছলে সব খেলোয়াড় নিজেদের একটি করে গোপন কথা ফাঁস করতে থাকেন। তবে শর্ত ছিল নিজেদের ভেতর কথাগুলো গোপন রাখা হবে। এ সময় ব্রড নিজের শারীরিক অবস্থার বিষয়টি ফাঁস করেন।
সতীর্থদের নিজের ঘটনা ফাঁসের বিবরণটি ২০২০ সালে একটি ব্রিটিশ পত্রিকায় লিখেছিলেন তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ৮৪৭ উইকেট পাওয়া এ বোলার। সবাইকে চমকে দেয়া সেই মুহূর্তটিতে তার নির্ধারিত সময়ের তিন মাস আগেই জন্মের বিষয়টিরও উল্লেখ রয়েছে।
‘যখন জন্মগ্রহণ করি, তখন আমি খুব অল্প ওজনের ছিলাম। মূলত মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার একটি ফুসফুস কখনোই পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। এ কারণেই আমি হাঁপানিতে আক্রান্ত এবং একটি ইনহেলার ব্যবহার করি।’
‘একজন ক্রীড়াবিদ হিসেবে শারীরিক সমস্যা আমাকে কখনো প্রভাবিত করেনি। কিন্তু আমার পুরো ক্যারিয়ারে অন্য সবার চেয়ে অর্ধেক ফুসফুস কম খেলেছি। এটা আপনি যখন চিন্তা করবেন, তখন খুবই আশ্চর্যজনক লাগবে।’
খেলাধুলা বা অন্যান্য শারীরিক কার্যকলাপে হাঁপানি প্রভাবিত করতে পারবে না, ছোটবেলায় বাবা-মায়ের কাছ থেকে এমন নিশ্চয়তা পেয়েছিলেন ব্রড। বিশেষকরে তার মায়ের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। সঠিক অনুশীলন, পরিবেশের সঙ্গে সচেতনভাবে মানিয়ে নেয়া এবং সঠিক শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণের কৌশলগুলো রপ্ত করতে পারাতেই তার ক্রিকেট ক্যারিয়ার দীর্ঘ হওয়ার ক্ষেত্রে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়নি।
বছর তিনেক আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টের সময় ব্রড প্রথম ইনিংসের উদ্বোধনী স্পেলে বোলিংয়ের সময় অস্বস্তিতে ভুগতে থাকেন। পরে ইনহেলারের জন্য ড্রেসিংরুমের দিকে ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছিলেন। তবে কোনো এক কারণে তিনি সহায়তা কর্মীদের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ইনহেলার পাননি।
কয়েক মুহূর্ত পর একজন পানির বোতল নিয়ে মাঠে আসেন। অবশেষে যখন তাকে ইনহেলার দেয়া হয়েছিল, তখন ডানহাতি পেসারকে যন্ত্রণায় কাতরাতে দেখা যায়। সৌভাগ্যক্রমে, ব্রডের অবস্থার অবনতি হয়নি এবং তিনি মাঠে থেকে খেলা চালিয়ে যান।








