বিশ্বখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান নির্মাতা বেলা তার আর নেই। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০১১ সালে ‘দ্য তুরিন হর্স’ এর মধ্য দিয়ে সিনেমা নির্মাণ থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন এই কালজয়ী স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা। এরপর যদিও দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য নির্মাণ করেছিলেন তিনি, কিন্তু আর পূর্ণদৈর্ঘ্য নির্মাণ করেননি। এই সিনেমাটির প্রিমিয়ার হয় ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বার্লিনালে উৎসবে প্রদর্শনের আগে হাঙ্গেরিয়ান কিংবদন্তী এই নির্মাতার সঙ্গে কথা বলেছিলেন কনস্টান্টি কুজমা। সেই উৎসবেই ‘দ্য তুরিন হর্স’ জিতে নেয় জুরি গ্র্যান্ড প্রিক্স। আজ তার মহাপ্রয়াণে ফিরে দেখা সেই সাক্ষাৎকার।
আপনার ‘দ্য তুরিন হর্স’ শুরু হয় ১৮৯৯ সালে ইতালিতে ঘটে যাওয়া ফ্রেডরিখ নীটশের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে। সেই ঘটনার পর থেকেই শুরু হয় ‘দ্য তুরিন হর্স’। সিনেমাটি আসলে কী নিয়ে? নীটশের সঙ্গে এর সম্পর্ক কোথায়?
বেলা তার: এই সিনেমার ধারণা খুবই সরল। আমরা জানতে চেয়েছি- ওই ঘটনার পর ঘোড়াটির কী হয়েছিল? সিনেমাটি নীটশেকে নিয়ে নয়, কিন্তু সেই ঘটনার আত্মা পুরো সিনেমার ওপর ছায়ার মতো বিস্তৃত। নীটশে এখানে উপস্থিত একজন চরিত্র নন, বরং একটি নৈতিক ও দার্শনিক প্রতিধ্বনি।
আপনার বেশিরভাগ সিনেমাই বর্তমান সময়কে ঘিরে। এখানে অতীতে ফিরে যাওয়ার ভাবনাটা কেন? এটা কি ঐতিহাসিক সিনেমা?
বেলা তার: আমার সিনেমাগুলো সবসময়ই সময়াতীত। এই সিনেমাটিরও কোনো নির্দিষ্ট সময় নেই। ১৮৯৯ সালের সঙ্গে একমাত্র সংযোগ নীটশে। তাই একে ঐতিহাসিক বলা যাবে না। শুধু সময়ের কারণে আমি আমার কাজের ভাষা মোটেও বদলাইনি।
নীটশের দর্শনে শিল্পের একটি বড় জায়গা আছে। তিনি শিল্পকে নান্দনিক অভিব্যক্তি হিসেবে দেখেছেন। আপনি কি মনে করেন, শিল্পে ‘বার্তা’ খোঁজার প্রবণতা ভুল?
বেলা তার: আমার সিনেমায় সাধারণত কোনো ‘বার্তা’ থাকে না। ক্যামেরা একজন পর্যবেক্ষক—সে মুহূর্তের আবহ ধারণ করে, জীবনের প্রতিক্রিয়া দেখায়। আমি দর্শককে কিছু বোঝাতে চাই না, আমি শুধু আমার চোখে দেখা পৃথিবীটি দেখাতে চাই। সিনেমা সাহিত্য নয়—এখানে শুধু লেন্সের সামনে যা আছে, সেটাই দেখানো যায়। একে ভান করা যায় না।
কিন্তু আপনি তো ঠিক করেন কী দেখাবেন…?
বেলা তার: হ্যাঁ, কারণ আমরা ডকুমেন্টারি বানাচ্ছি না। আমরা একধরনের কল্পকাহিনি তৈরি করি। কিন্তু সেটিও জীবনেরই আয়না।
আপনার সিনেমায় আকস্মিকতা বা কাকতালীয় ঘটনার ভূমিকা কতটা?
বেলা তার: আমার সিনেমায় কিছুই আকস্মিক নয়। আমি কাকতালীয়তায় বিশ্বাস করি না। আমি পুরো সিনেমাটা আগেই জানি, চোখ বন্ধ করলে আমি ছবিটা দেখতে পাই। চিত্রনাট্য, সেট, অভিনেতা— সব জানা থাকে। পরিবর্তন যা করি, তা শুধু অভিনেতাদের স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত থাকার সুযোগ দিতে।
তাহলে এডিটিংয়ের ভূমিকা কতটা?
বেলা তার: খুব বেশি নয়। আমাদের সম্পাদক শুটিংয়ের সময়ই সেটে থাকেন, পুরো প্রক্রিয়াটা অনুসরণ করেন।
লাসলো ক্রাসনাহোরকাইয়ের সঙ্গে আপনার দীর্ঘদিনের কাজ। তিনি কি ভিজ্যুয়ালে প্রভাব রাখেন?
বেলা তার: না। শব্দের দায়িত্ব তার, ছবির দায়িত্ব আমার। তিনি সাহিত্য তৈরি করেন, আমি সেটাকে সিনেমার ভাষায় অনুবাদ করি। তবে তার লেখা আমাকে আবেগগতভাবে পথ দেখায়।
‘দ্য তুরিন হর্স’-এর ভাবনাটা কীভাবে এলো?
বেলা তার: লাসলোর একটি ছোট গল্প ছিল— নীটশের ঘটনার পর ঘোড়াটির কী হয়, সেই প্রশ্ন নিয়ে। সিনেমাটি সেই প্রশ্নেরই আমাদের কল্পিত উত্তর।
আপনি প্রায়ই অ-পেশাদার অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেন। অভিনয় সম্পর্কে আপনার দর্শন কী?
বেলা তার: আমার কাছে অভিনয় মানে ‘অভিনয় করা’ নয়। আমি অভিনেতাদের বলি, ‘অভিনয় করো না’, কাজটা করো। সঠিক পরিবেশ তৈরি করাই পরিচালকের কাজ।
আপনি বলেছেন, দর্শক যেন সিনেমা দেখে খুব বেশি ‘ভাবতে’ না বসে। তাহলে সমালোচনার জায়গাটা কোথায়?
বেলা তার: সমালোচনা লেখা আমার কাজ নয়। কেউ ভালোবাসলে আমি খুশি, না ভালোবাসলেও মেনে নিই। আলো জ্বলে ওঠার পর সিনেমাটি আর আমার থাকে না- সেটা দর্শকের হয়ে যায়।
আপনার সিনেমায় আপনি মূলত কী দেখাতে চান?
বেলা তার: মানুষ।
আমরা অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু সমাজ বা পরিবেশ আমাদের থামিয়ে দেয়। আমি দেখাতে চাই- প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা আছে, সুখী হওয়ার অধিকার আছে। আমি মানুষকে পর্যবেক্ষণ করি না- আমি তাদেরই একজন।
মেইনস্ট্রিম সিনেমার সমস্যা কোথায়?
বেলা তার: সব সিনেমা একই ছকে চলে- অ্যাকশন, কাট, অ্যাকশন, কাট। কিন্তু গল্প শুধু কাজের মধ্যে নেই। কোণায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষও গল্প হতে পারে। আমি সিনেমার চেয়ে জীবনের কাছাকাছি থাকতে চাই।
আপনি কি নিজেকে হাঙ্গেরিয়ান সিনেমার অংশ মনে করেন?
বেলা তার: আমি হাঙ্গেরিয়ান- এতে গর্ব আছে। কিন্তু ইন্ডাস্ট্রির অংশ হতে চাইনি কখনও। আমি বরাবরই একটু আলাদা।
হাঙ্গেরির চলচ্চিত্র তহবিল পুনর্গঠন নিয়ে আপনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। কেন?
বেলা তার: সরকার কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে। আগে ছিল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এখন একজন সরকারি প্রতিনিধি সব নিয়ন্ত্রণ করবেন। সাম্প্রতিক মিডিয়া আইনের পর আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনের ওপর এক ধরনের ছায়া নেমে এসেছে।
‘দ্য তুরিন হর্স’-এর পর কী?
বেলা তার: এই সিনেমাটি আমার কাজের একটি বিশেষ জায়গায় দাঁড়িয়ে। ৩৪ বছর আগে আমার প্রথম ফিচার শুরু হয়েছিল। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এখানে এসে মনে হচ্ছে- বৃত্তটি সম্পূর্ণ হলো।








