মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শান্তির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সাম্প্রতিক সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে। একই সময়ে লেবানন সীমান্তেও উত্তেজনা প্রশমনের আভাস দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু ঠিক এমন এক মুহূর্তে বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলের বিমান হামলা নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই হামলা শুধু একটি সামরিক অভিযান নয়; বরং এটি এমন এক পদক্ষেপ, যা ওয়াশিংটন-তেহরান সমঝোতা এবং ইসরায়েল-লেবানন শান্তি প্রচেষ্টাকে একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ফলে প্রশ্ন উঠছে; মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বাস্তবতা গড়ে ওঠার পথে কি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু?
অনলাইন সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ওয়েবসাইট এলেথো নিউজে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক ত্রিতা পার্সি লিখেছেন, গত রোববার বৈরুতের দাহিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলার পর আঞ্চলিক কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। হামলার সময় নির্বাচন ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর অল্প সময় পরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার কথা ছিল।
তার ধারণা, ইরান সম্প্রতি এমন একটি প্রতিরোধ নীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিল, যার আওতায় লেবাননের ভূখণ্ডে ইসরায়েলি হামলার জবাবে সরাসরি প্রতিক্রিয়া জানাবে তেহরান। বৈরুতে হামলার মাধ্যমে ইসরায়েল সেই বার্তাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাল্টাপাল্টি ঘটনা নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান সরাসরি ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত হানে, যা দুই দেশের মধ্যে সংঘাতের নতুন মাত্রা যোগ করে। পরবর্তী সময়ে উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপ নিলেও পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নেওয়ার আগে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ইরান এখন লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতার ওপর একটি কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাইছে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের শক্তির ভারসাম্যে নতুন পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এদিকে হামলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ভিডিও প্রকাশ করলে তা আরও বিতর্কের জন্ম দেয়। সমালোচকদের মতে, শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার ঠিক আগে এমন পদক্ষেপ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে।
পশ্চিমা কূটনীতিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈরুতে হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় চলমান শান্তি উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, এই ধরনের সামরিক পদক্ষেপ আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের পরিবর্তে নতুন করে সংঘাত উসকে দিতে পারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। তিনি মনে করেন, সীমিত পরিসরের একটি ঘটনার জবাবে বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ শান্তি প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বর্তমানে ওয়াশিংটন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি। একদিকে ইরান ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা প্রত্যাশা করছে, অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা উদ্বেগও মার্কিন প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে রয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সংযম ও কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রাখা জরুরি। অন্যথায় সাম্প্রতিক সংঘাত ও পাল্টাপাল্টি হামলা পুরো অঞ্চলের শান্তি প্রক্রিয়াকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।
বৈরুতে সাম্প্রতিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।







