বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কোনো হঠাৎ তৈরি রাজনৈতিক ধারণা নয়, এটি দেশের দীর্ঘ ঐতিহাসিক সংগ্রাম ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতার ফল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ যে আত্মপরিচয় ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে, তারই আধুনিক রূপ হিসেবে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ গড়ে উঠেছে। এটি কোনো কৃত্রিম বা ল্যাবরেটরিতে তৈরি বিষয় নয়, বরং দেশের মাটির স্বতঃস্ফূর্ত সাংস্কৃতিক প্রকাশ।
আজ রোববার (৮ মার্চ) রাজধানীর সেগুনবাগিচাস্থ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘স্টেকহোল্ডার্স অফ বাংলাদেশ’ আয়োজন করা “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সাংস্কৃতিক বিনির্মাণ: অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ কোন পথে?” শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা এ বিষয়গুলো তুলে ধরেন।
বৈঠকে দেশের বর্তমান সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে দুটি বিপরীতমুখী কিন্তু নেতিবাচক প্রবণতার দিকে গুরুত্বারোপ করা হয়। একদিকে ‘কলকাতা-কেন্দ্রিক’ বাঙালি জাতীয়তাবাদকে অতি-প্রাধান্য দেওয়ার কারণে দেশের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্যে ভাষাকে বিকৃত করে ‘আরোপিত ইসলামীকরণ’ চালানোর চেষ্টা চলছে।
বক্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘স্বাধীনতা’কে ‘আজাদী’, ‘বিপ্লব’কে ‘ইনকিলাব’, কিংবা ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’কে ব্যঙ্গাত্মক নামে উল্লেখ করার প্রবণতা কোনো স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক বিবর্তন নয়, এটি চাপিয়ে দেওয়া প্রক্রিয়া। এ ধরনের প্রবণতা দেশের কয়েকশত বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে।
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, এমপি। তিনি বলেন, “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ভাষা বা জাতিগত সীমা অতিক্রম করে ভূখণ্ডভিত্তিক নাগরিক পরিচয়ের ওপর জোর দেয়। রাষ্ট্র এমন এক অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়তে চায় যেখানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার পাশাপাশি সনাতনী, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও সমান মর্যাদা পাবে।”
গোলটেবিলে প্যানেলিস্ট হিসেবে ছিলেন কণ্ঠশিল্পী রুমানা মোর্শেদ কনকচাঁপা, সঙ্গীতশিল্পী ও রাজনীতিবিদ মুহাম্মদ আসিফ আলতাফ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন, পলিটিক্যাল ইকোনমিস্ট ড. সফিকুর রহমান, এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্রিয়েটিভ ফিল্ডের শিমুল সালাহউদ্দিন।
স্টেকহোল্ডার অফ বাংলাদেশের মুখ্য সংগঠক ডা. সায়েম মোহাম্মদ বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি সংলাপের মাধ্যমে জাতীয় সংহতি সম্ভব, জোর করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে একটি মানবিক ও বাংলাদেশপন্থী নীতিমালা তৈরি করা আমাদের লক্ষ্য।”







