চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

জোড়া শতকে তামিমদের ডোবাল জিম্বাবুয়ে

সিকান্দার রাজা ও ইনোসেন্ট কাইয়ার সেঞ্চুরির কাছে হেরে গেল টাইগার দল। ৩০৪ রানের বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে জিম্বাবুয়ে ৫ উইকেটের জয় তুলেছে। একইসঙ্গে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে বাংলাদেশকে পেছনে ঠেলে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল স্বাগতিকরা।

শুক্রবার টসে হেরে আগে ব্যাট করা বাংলাদেশ লিটন দাস, তামিম ইকবাল, এনামুল হক বিজয় এবং মুশফিকুর রহিমের দারুণ ফিফটিতে ২ উইকেটে তোলে ৩০৩ রান। জবাবে স্বাগতিকরা ১০ বল হাতে রেখেই জয় নিশ্চিত করে।

Reneta June

ইনিংসের শুরুতেই বিপদে পড়েছিল জিম্বাবুয়ে। ৬২ রানে হারিয়েছিল ৩ উইকেট। প্রথম ওভারে স্বাগতিক লাইনআপে আঘাত হেনেছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান। ২ রানে প্রথম উইকেট হারায় জিম্বাবুয়ে। কাটার মাস্টারের অফস্টাম্পের বাইরে করা ব্যাক অব লেন্থ ডেলিভারি কভারের উপর দিয়ে মারতে গিয়েছিলেন রেগিস চাকাভা। বল অধিনায়কের ব্যাটের নিচের কানায় লেগে লেগ স্টাম্প উপড়ে ফেলে।

বিজ্ঞাপন

পরের ওভারে আরেক ওপেনার তারিসাই মুসাকান্দাকে ফেরান পেসার শরিফুল ইসলাম। অফ স্টাম্পের বেশ বাইরে ফুল লেন্থ বলটি ঠিকমতো ব্যাটে লাগাতে পারেননি ৪ রান করা মুসাকান্দা। বৃত্তের ভেতর সহজ ক্যাচ নেন মোসাদ্দেক।

তৃতীয় উইকেটে কোণঠাসা থেকে দলকে উদ্ধারের প্রাথমিক কাজটা করেন ইনোসেন্ট কাইয়া ও ওয়েসলি মাধভেরে। দুই ব্যাটার ৫৫ রান যোগ করেন।

অদ্ভুত রানআউটে মাঠ ছাড়েন মাধভেরে, ভাঙে তৃতীয় উইকেট জুটি। অনসাইডে ফ্লিক করেছিলেন কাইয়া। সহজেই দুজনে দৌড়ে নেন এক রান। বদলি ফিল্ডার তাইজুল প্রথম চেষ্টায় বল ধরতে পারেননি। তাতে আর রান নেয়ার সুযোগ ছিল না। কাইয়া দৌড়ানোর সংকেত না দিলেও অযথাই দৌড় দেন মাধভেরে। বোলিং প্রান্তে তাইজুলের থ্রোয়ে বল পাওয়া মিরাজ ধরে স্টাম্পে লাগান। মাধভেরে ২৭ বলে ২ চারে ১৯ করে ফেরেন।

এরপর উইকেটে জমে যান কাইয়া ও রাজা। তিন ক্যাচ মিসও এতে বড় ভূমিকা রাখে। তাসকিনের করা ২৭তম ওভারের শেষ বলে রাজার সহজ ক্যাচ ফেলে দেন তাইজুল। ৪৩ রানে রাজা জীবন পান। সুযোগ কাজে লাগিয়ে তুলে নিয়েছেন ম্যাচজয়ী শতক।

ম্যাচের ৩৩তম ওভারে শরিফুলের করা প্রথম বলে জীবন পান কাইয়াও। ৬৮ রানে থাকা অবস্থায় থার্ডম্যানে ক্যাচ দিলেও তাসকিন তালুতে নিতে পারেননি। একই ওভারের শেষ বলে কাইয়ার ফিরতি ক্যাচ তালুবন্দি করতে ব্যর্থ হন শরিফুল। বল পায়ে লাগায় তিনি আঘাত পেয়ে খানিকক্ষণ মাঠে শুয়ে থাকেন।

জীবন পাওয়ার সুযোগ কাজে লাগিয়ে প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নিয়েছেন কাইয়া। তার খানিকপর রাজাও পান চতুর্থ ওয়ানডে সেঞ্চুরি। সফরকারী বোলারদের বিপক্ষে তারা অতি-আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে দলের জয়ের পথ প্রশস্ত করেন।

৪২তম ওভারে মোসাদ্দেক হোসেনের বলে শর্ট ফাইন লেগে শরিফুলের হাতে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন কাইয়া। ১২২ বলে ১১ চার ও ২ ছক্কায় ১১০ রানের ইনিংস খেলেন। রাজার সঙ্গে গড়েন ১৯৪ রানের বিশাল জুটি।

ম্যাচের ৪৩তম ওভারে আক্রমণে ফেরেন শরিফুল। তবে ক্যাচ নিতে গিয়ে আঘাত পাওয়ার ধকল সামলাতে পারেননি। দুই বল বাকি থাকতেই ব্যথায় ছটফট করতে থাকা পেসার আর ওভার শেষ করতে পারেননি।

মোসাদ্দেক ৪৪তম ওভারে চার ও পরের ওভারে তাসকিন পাঁচ রানের বেশি না দেয়ায় ক্ষীণ আশা তৈরি হয়েছিল। ৪৬ নম্বর ওভারে মোসাদ্দেক ৭ রান দিলে সমীকরণ দাঁড়ায় ২৪ বলে ২১ রান।

মোস্তাফিজের করা ৪৭তম ওভারের প্রথম বলে ছক্কা মারেন লুক জঙ্গে। পরের বলে লং লেগে ক্যাচ উঠালেও সহজ ক্যাচটি ছাড়েন তাসকিন। হয়ে যায় ২ রান। এখানেই ক্ষীণ আশার সমাপ্তি! তৃতীয় বলে বাউন্ডারি মারেন জঙ্গে। তাতে সমীকরণ দাঁড়ায় ২১ বলে ৯ রান।

মিরাজ যখন হাতে বল নেন তখন জিম্বাবুয়ের দরকার ১৮ বলে ৮ রান। প্রথম বলে ১৯ বলে ২ চার ও এক ছক্কায় ২৪ রান করা জঙ্গের ক্যাচ নেন আফিফ। এই ওভারে আসে ৫ রান। শেষ ১২ বলে স্বাগতিকদের দরকার পড়ে ৩ রান।

মোসাদ্দেকের হাতে দেয়া হয় বল। প্রথমটি ডট হলেও পরের বলে ছক্কা মেরে জিম্বাবুয়েকে জয়েরবন্দরে পৌঁছে দেন রাজা। ১০৯ বলে ৮ চার ও ৬ ছক্কায় তিনি ১৩৫ রানের অপরাজিত ইনিংসটি সাজান তিনি।

বাংলাদেশের হয়ে একটি করে উইকেট নেন মোস্তাফিজ, শরিফুল, মিরাজ ও মোসাদ্দেক।

আগে ব্যাট করে এই নিয়ে চতুর্থবার জিম্বাবুয়ের মাঠে ওয়ানডেতে ৩০০ রানের গণ্ডি পার করে লাল-সবুজের দল। শুক্রবারের সংগ্রহটি স্বাগতিকের বিপক্ষে তাদের মাটিতে তৃতীয় সর্বাধিক দলীয় রান বাংলাদেশের। যদিও তা জয়ের জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়নি।

এদিন তামিম-লিটনের ওপেনিং জুটিতে বড় সংগ্রহের দিকে ছোটে সফরকারীরা। চিরাচরিত ছন্দেই নিজেদের মেলে ধরে। তামিম এবং লিটন গড়ে ফেলেন ওপেনিংয়ে শতরানের জুটি। ছুঁয়েছেন দারুণ এক রেকর্ড।

বাংলাদেশের হয়ে ওপেনিংয়ে সবচেয়ে বেশি চারবার শতরানের জুটির রেকর্ড এতদিন ছিল কেবল তামিম ও সৌম্য সরকারের দখলে। সেটি ধরে ফেলেছেন তামিম ও লিটন। তাদের পাশেও এখন উদ্বোধনীতে চারটি শতরান জুটির রেকর্ড।

বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে এদিন ওয়ানডেতে ৮ হাজার রানের ক্লাবে ঢুকে পড়েছেন তামিম। প্রয়োজন ছিল ৫৭ রান। টাইগারদের ওয়ানডে অধিনায়ক ক্যারিয়ারের ৫৪তম ফিফটি তুলেছেন। পথে ছুঁয়েছেন কীর্তিটি। ২০০৭-২২ সালের মাঝে খেলে মাইলফলক ছুঁলেন তারকা ওপেনার।

ক্যারিয়ারে ২২৯ ম্যাচে ২২৭ ইনিংসে ৮,০০৫ রান এখন তামিমের। ৭৮.৫৫ স্ট্রাইকরেটে ৩৭.০৬ গড়ে রান করেছেন। পেয়েছেন ১৪টি শতক ও ৫৪টি অর্ধশতক। মাইলফলক ছুঁতে তামিম খেলেছেন ৮৭৭টি চারের মার, আছে ১০০টি ছক্কা।

১১৯ রানের ওপেনিং জুটির পর আউট হন তামিম। ৮৮ বলে ৮ চারে ৬২ রানে সিকান্দার রাজার বলে কাইয়ার হাতে ধরা পড়েন।

দ্বিতীয় উইকেটে দীর্ঘদিন পর ওয়ানডেতে সুযোগ পাওয়া এনামুল হক বিজয়ের সঙ্গে ৫২ রানের জুটি গড়েন লিটন। সেঞ্চুরির কাছাকাছি এসে তিনি দুর্ভাগ্যের শিকার হন। পায়ে টান লাগায় স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে ওপেনিং তারকাকে। ৮৯ বলে ৯ চার ও এক ছক্কায় ৮১ রানে থেকে লিটন গেছেন সাজঘরে। পরে আর নামতে পারেননি।

সিকান্দার রাজার করা ৩৪তম ওভারের প্রথম বলে এক রান নিতে পারলেও খোঁড়াতে থাকেন লিটন। পায়ে ব্যথা অনুভব করে শুয়ে পড়েন টাইগার তারকা। ফিজিও এসে প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পরে স্ট্রেচারে মাঠ ছাড়তে হয়।

তামিম যখন সাবলীল ব্যাটিংয়ে রানের গতি বাড়ানোর কাজ করছিলেন, ধীরস্থির থেকে আরেক প্রান্ত সামলেছেন লিটন। ৬২ রান করে তামিম আউট হলে খোলস ছাড়তে থাকেন। ফিফটি তুলে নেয়ার পর আক্রমণাত্মক মেজাজে ব্যাট করে সেঞ্চুরির আশাই জাগিয়েছিলেন।

লিটনের ড্রেসিংরুমে ফেরার পর মুশফিককে নিয়ে ঝড়ো ব্যাটিং করতে থাকেন বিজয়। ৪৭ বলে তুলে নেন ফিফটি। হজের জন্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ছুটিতে থাকা মুশফিকও ছন্দ ধরে রেখে মারমুখী ব্যাটিং করে যান।

৪৪তম ওভারের চতুর্থ বলে রিচার্ড এনগারাভার বলে ক্যাচ তুলে দিলেও ওয়েসলি মাধভেরে তা ফেললে ৭১ রানে জীবন পান বিজয়। এরপরও বেশিক্ষণ ক্রিজে থাকতে পারেননি। ৬২ বলে ৬ চার ও ২ ছক্কায় ৭৩ রান করে নিয়াউচির বলে মুসাকান্দার তালুবন্দি হন।

মুশফিককে নিয়ে দ্রুত রান তোলায় মনযোগী হন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। ক্রিজে এসে প্রথম দুই বলে বাউন্ডারি হাঁকান। মুশফিক ৪৯ বলে ৫ চারে ৫২ ও রিয়াদ ১২ বলে ৩ চারে ২০ রানে অপরাজিত থাকেন।

শেষ ১০ ওভারে বাংলাদেশ তোলে ৯০ রান। জিম্বাবুয়ের পক্ষে একটি করে উইকেট পান সিকান্দার রাজা ও নিয়াউচি।