বাংলাদেশ ডাক আইন হালনাগাদ ও সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আধুনিক ডাকব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই আইনটি নতুনভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে, যার নাম হবে ‘ডাকসেবা অধ্যাদেশ, ২০২৫’। এটি কার্যকর হলে ১৮৯৮ সালের পুরনো পোস্ট অফিস আইন বাতিল হবে।
শনিবার (২৫ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক বিবৃতিতে টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এ তথ্য জানান।
তিনি লিখেছেন, নতুন আইনে ডিজিটাল রূপান্তর, আধুনিক ঠিকানা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত স্থানান্তর (মাইগ্রেশন) পরিস্থিতিতে ঠিকানা ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা এবং ডাক বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতা জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নতুন আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ডাকের অধীনে একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি নিয়ন্ত্রণ উইং গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এই উইং ডাক ও কুরিয়ার খাতের লাইসেন্স প্রদান, তদারকি এবং শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে থাকবে। পাশাপাশি লাইসেন্সবিহীনভাবে ডাক বা কুরিয়ার ব্যবসা পরিচালনা করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত প্রশাসনিক জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে প্রচলিত ডাকটিকিটের পাশাপাশি ডিজিটাল ডাকটিকিট বা ই-স্ট্যাম্পিং চালু করা হবে। গ্রাহকরা অনলাইনে অর্থ পরিশোধ করে কিউআর কোড বা বারকোডযুক্ত ডিজিটাল টিকিট ব্যবহার করতে পারবেন, যা আইনি দিক থেকে প্রচলিত টিকিটের সমান মর্যাদা পাবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং সকল ডাক ও কুরিয়ার কার্যক্রমে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নতুন আইন ডাকসেবাকে জরুরি সেবা হিসেবে ঘোষণা করছে, যাতে জাতীয় সংকটের সময় ডাক পরিবহন ও জনবল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চলাচলের অনুমতি পায়। ডাক বিভাগের নেটওয়ার্ককে জাতীয় অবকাঠামো হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে, যাতে সরকারি যোগাযোগ, পরীক্ষার খাতা, সরকারি নথি ও সংবেদনশীল পার্সেল পরিবহনে ডাকসেবার ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়।
একই সঙ্গে ‘চিফ কন্ট্রোলার অফ স্ট্যাম্পস’ দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হবে, যা ডাক ও রাজস্ব স্ট্যাম্পের প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে ডাক ও কুরিয়ার পার্সেল পরিবহনে ইলেকট্রনিক অগ্রিম তথ্য (EAD) প্রদান বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে, এবং প্রেরক-প্রাপকের পরিচয় যাচাইয়ের (KYC) বিধান রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ডাকের আর্থিক সেবা— ডাক জীবন বীমা ও ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংক—কে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। এসব সেবা এখন রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির আওতায় পরিচালিত হবে, যা জনগণের সঞ্চয়কে আরও নিরাপদ করবে। এছাড়া প্রবাসী ও অনিবাসী ভোটারদের ভোট প্রদানে পোস্টাল ব্যালট ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনে একটি জাতীয় ঠিকানা আর্কাইভিং ব্যবস্থার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মাধ্যমে প্রতিটি নাগরিক ও পরিবারের ডিজিটাল ঠিকানা সংরক্ষণ, জিও-ফেন্সিং এবং ফ্যামিলি-ট্রি ম্যাপিং করা হবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন বা স্থানান্তরের ফলে হারানো ঠিকানাগুলো পুনরায় চিহ্নিত ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেন, এই পরিবর্তনগুলো ডাক বিভাগের ডিজিটাল রূপান্তরকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এটি শুধু ডাক ব্যবস্থাকেই আধুনিক করবে না, বরং দেশের আর্থিক সেবা, প্রশাসনিক যোগাযোগ ও নাগরিক তথ্য ব্যবস্থাপনাকেও আরও সুরক্ষিত, স্বচ্ছ ও কার্যকর করে তুলবে।








