বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংকটির এখন কোন লিকুইডিটি ক্রাইসিস নেই। ব্যক্তি গ্রাহকরা চেক নিয়ে আসলে টাকা দিতে পারছেন না এমন পরিস্থিতি এখন আর নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক গত ৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংককে ২০০ কোটি টাকার লিকুইডিটি সাপোর্ট দিয়েছে। তার আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাপোর্ট ছাড়াই ব্যাংকটি ঘুরে দাঁড়ানোর সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঋণ আদায় এবং নতুন আমানত সংগ্রহে ব্যাংকটি সাফল্য দেখিয়েছে।
বিগত এক বছরে পুনঃতফসিল ও নগদ আদায়সহ ব্যাংকটি মোট ঋণ আদায় করেছে ৯০ কোটি টাকা। ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত একুশ হাজারেরও বেশি নতুন আমানত হিসাব খুলতে সক্ষম হয়েছে যেখানে নতুন আমানত এসেছে ২৮৫ কোটি টাকার বেশি।
চ্যানেল আই অনলাইনকে এমনটাই জানিয়েছেন ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. মোশারফ হোসেন এবং গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীকালের কঠিন সময়ে ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে নেতৃত্ব দেয়া মোহাম্মদ জিয়াউল করিম (বর্তমান ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর)।
জিয়াউল করিম বলেন, ব্যাংকিং খাত বর্তমানে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করলেও সুশাসনের দিক থেকে সমগ্র ব্যাংকিং খাত এখন সোনালী সময় পার করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধান এবং অভিভাবকত্বে ব্যাংক সমূহে এখন সর্বোচ্চ সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। বিগত ১৫ বছরের ধকল কাটিয়ে ব্যাংক খাত এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এসময় তিনি বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিমিটেডের নানা সংকট-সাফল্য ও সম্ভাবনার দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
প্রশ্ন: দেশের ব্যাংক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি এখন কেমন?
জিয়াউল করিম: গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাংক খাত এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। গণমাধ্যমও স্বাধীন। বাংলাদেশ ব্যাংক এখন ব্যাংক খাতে বিগত আমলে যে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই ব্যাংক খাতের ক্ষতির প্রকৃত চিত্র ফুটে উঠবে।
প্রশ্ন: কিন্তু দেশের অনেক ব্যাংকেই তো টাকা নেই। ক্রাইসিস…
জিয়াউল করিম: হ্যাঁ এটা সত্য। অনেক ব্যাংকেই পর্যাপ্ত লিকুইডিটি নেই। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে এবং বাংলাদেশ ব্যাংক হতে তারল্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে । ফলে বর্তমানে পূর্বের মতো তীব্র তারল্য সংকট কোন ব্যাংকেই নেই। এছাড়া ব্যাংকগুলো নিজেদের মতো করে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন আমরা বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের কথা বলতে পারি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হতে জানুয়ারি মাস পর্যন্ত আমরা নিজেদের মতো চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম বাংলাদেশ ব্যাংক হতে কোন তারল্য সহায়তা গ্রহণ না করে। ব্যক্তি আমানতকারীদের সকল চেক আমরা আমাদের কাউন্টার হতে পরিশোধ করতে পেরেছি। সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক হতে ২০০.০০ কোটি টাকার তারল্য সহায়তা পেয়েছি। এই টাকারও সম্পূর্ণ ব্যবহার আমাদের এখনো করতে হয়নি।
প্রশ্ন: এটি আপনারা কিভাবে করছেন? এস আলম গ্রুপভুক্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে আপনারাও তো একটি
জিয়াউল করিম: হ্যাঁ এটা ঠিক যে আমাদের ব্যাংক এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। কিন্তু আমাদের বিশেষ শক্তি হচ্ছে আমাদের ব্যাংকের মালিকানা ৫১% সরকার এবং সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে। ফলে আমাদের গ্রাহকগণ আমাদের উপর আস্থা রেখেছেন এবং আমরা নতুন আমানত পাচ্ছি। আমরা এই কয়দিনে ২২ হাজারেরও বেশি নতুন হিসাব খুলতে সক্ষম হয়েছি এবং ৩০০ কোটি টাকার মতো নতুন আমানত এসেছে।
প্রশ্ন: এটা কিভাবে সম্ভব হল?
জিয়াউল করিম: ২০১৯ সাল হতে এ পর্যন্ত আমাদের ব্যাংকে ঋণ নিয়ে কোন অনিয়ম হয়নি। ২০১৯ সাল হতে এ পর্যন্ত বিতরণকৃত ঋণ ১% পারসেন্ট এরও কম শ্রেণীকৃত হয়েছে। ব্যাংকের ঋণ-রিকভারিও মোটামুটি সন্তোষজনক। ফলে আমাদের গ্রাহকগণ এখনো পর্যন্ত আমাদের প্রতি আস্থাশীল রয়েছে।
প্রশ্ন: বর্তমানে ব্যাংকারদের মধ্যে কি কোন অস্থিরতা বিরাজ করছে?
জিয়াউল করিম: আপনারা জানেন, দীর্ঘ ১৫ বছরের অধিক সময় হতে ব্যাংকসমূহ নানা ধরনের অনিয়মের আষ্টপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়েছে। এই প্রক্রিয়ার সাথে অসংখ্য ব্যাংকার জড়িয়ে পড়েছেন। যেহেতু বর্তমানে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র বের করার কাজ চলছে তাই কিছু কিছু ব্যাংকারের মনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এখানে প্রভাবশালী ব্যাংকারগণ স্বেচ্ছায় নিজেরা উপকৃত হওয়ার আশায় এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়েছেন। কিন্তু এমন অনেক ব্যাংকার আছেন যাদের ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও এই প্রক্রিয়ায় তারা জড়িয়ে পড়েছেন। তবে অনিয়মের প্রকৃত সুবিধাভোগী যারা তাদেরকে খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে ফেলার কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক ব্যাংকারের পক্ষে নিজ নিজ অবস্থান হতে যথাযথ ভূমিকা পালন করা সম্ভব হয়নি। আশা করা যায়, তদন্তকারী সংস্থাসমূহ এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবেন।
প্রশ্ন: তদন্তের ক্ষেত্রে একটি প্রচলিত নিয়ম হলো অনুমোদন ফাইলে যার স্বাক্ষর থাকবে তাকে দায় নিতে হবে; তাই নয় কি?
জিয়াউল করিম: ফাইলে যার স্বাক্ষর থাকবে তিনি দায়ী। তবে তদন্ত কর্মকর্তার কাজ হবে অনিয়মের টাকা যাদের কাছে পৌঁছেছে অর্থাৎ টাকার সর্বশেষ গন্তব্য যেটি সেটি খুঁজে বের করতে হবে এবং তাদেরকেও আইনের আওতায় আনতে হবে। অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাত হতে পাচারকৃত টাকার সর্বশেষ উপকারভোগীকে আইনের আওতায় আনতে না পারলে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে অনিয়মের ধারা তৈরি হয়েছে তা রোধ করা যাবে না। বিদ্যমান ব্যবস্থায় অসংখ্য ব্যাংকার চাকরি হারাচ্ছেন। কিন্তু ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম বন্ধ হচ্ছে না। তাই নতুন করে বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে হবে।
প্রশ্ন: ব্যাংকিং খাতের কঠিন সময়ে আপনাদের নেতৃত্বে চলা কমার্স ব্যাংকের পরিস্থিতি এখন কেমন?
জিয়াউল করিম: বর্তমান কঠিন পরিস্থিতি হতে উত্তরণের জন্য আমরা একটি টিম হিসেবে কাজ করার চেষ্টা করছি। সবাই যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করার চেষ্টা করছি। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টার কারণে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক লিকুইডিটি ক্রাইসিস থেকে বের হয়ে গেছে। বাইশ হাজারেরও বেশি নতুন আমানত হিসাব খোলা এটি প্রমাণ করে যে আমাদের প্রতি গ্রাহকদের আস্থা রয়েছে। ফলে গ্রাহকদের আস্থা সাথে নিয়ে ব্যবসা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই পরিস্থিতি হতে শীঘ্রই উত্তরন করতে পারব বলে আমরা বিশ্বাস করি।
প্রশ্ন: এখনকার কঠিন পরিস্থিতি থেকে ব্যাংক খাতের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা কী?
জিয়াউল করিম: ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য রাজনৈতিক কমিটমেন্ট দরকার। বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। ব্যবসা করার ক্ষেত্রে ব্যাংকসমূহ যেন স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ব্যাংক সমূহের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোন অবস্থাতেই অভ্যন্তরিণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে না পড়ে।








