রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা দুই কোটি ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। কিন্তু এতো বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য খোলা স্থান কিংবা জনপরিসরের দেখা পাওয়া বড়ই দুস্কর। কোথাও কারো সঙ্গে দেখা করে দুটো কথা বলার জায়গার বড়ই অভাব। ঢাকার মানুষ তাহলে কোথায় যাবে?
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেস্তোরাঁ শিল্পের বিকাশ হওয়ার পেছনে এটা একটা অন্যতম কারণ। গোছালো পরিবেশে কিছুটা সময় বন্ধু, পরিজনদের সঙ্গে দেখা করার, আড্ডা দেওয়ার, কথা বলার বা গেট টুগেদারের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে। আবার অনেকের আর্থিক সামর্থ্য কিংবা ব্যয় করার অভ্যস্ততা পরিবর্তন হওয়ায় নতুন ধরনের রেস্তোরাঁর শিল্প দ্রুত বিকাশ হচ্ছে। বেইলি রোড, খিলগাঁও, সাত মসজিদ রোড, ধানমন্ডি, বনানী এখন রেস্টুরেন্ট হাব।

এসব এলাকার একেকটা ভবনের প্রায় পুরোটা জুড়ে রেস্টুরেন্ট। কিন্তু রেস্টুরেন্ট করার উদ্দেশ্য থেকে এ সব ভবন তৈরি করা হয়েছি কি? আবাসিক ভবনে দিব্যি রেস্টুরেন্ট চলছে। আমরা সবাই সেখানে যাচ্ছি। আমাদের ছেলেমেয়েদের সেখানে নিয়ে যাচ্ছি। সুন্দর করে সাজানো গোছানো সব রেস্টুরেন্ট। সুবেশী সব কর্মী। ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে আন্তরিকভাবে তারা কথা বলেন। এত এত আয়োজন, কোথাও কোনো কৃপণতা নেই। তার মাঝে শুধু মানুষের নিরাপত্তারই কোনো আয়োজন নেই। সেখানেই সবটা কৃপণতা।
আমাদের নগর এলাকাগুলো এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুকূপ। সড়ক-ফুটপাত, মসজিদ-উপাসনালয়, আবাসিক ভবন-শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন-বিপণিবিতান কিংবা খাবারের রেস্টুরেন্ট—এই নগরে কোনো কিছুই আর আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নগর এলাকায় বিভিন্ন অগ্নিকাণ্ড কিংবা ভবন বিস্ফোরণে এই চরম সত্যটা আমাদের এসব নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

রাজধানীর বেইলি রোডে গতকাল একটি ভবনে আগুনে ৪৬ জনের মৃত্যুর ঘটনার পর সামনে আসছে নানা মর্মস্পর্শী ঘটনা। কেউ ভবনটির রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়েছিলেন পরিবারসহ, কেউ গিয়েছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। কেউ কেউ ভবনটিতে কাজ করে সংসার চালাতেন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভবনটিতে আগুন লাগে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার দিকে। শুক্রবার বেলা ৩টা পর্যন্ত ১৭ ঘণ্টায় জানা গেছে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন ৪৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আরও জানিয়েছেন, ১২ জন চিকিৎসাধীন। তারা কেউ শঙ্কামুক্ত নন।
অন্যদিকে ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, ভবনটিতে কোনো অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে ভবন কর্তৃপক্ষকে তিনবার চিঠি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সূত্রে জানা যায়, বেইলি রোডের যে ভবনে আগুন লেগেছে ওই ভবনের কেবল ৮ তলায় আবাসিক এর অনুমোদন নেয়া হয়েছে। বাকি এক থেকে সাত তলা পর্যন্ত বাণিজ্যিক অনুমোদন নেওয়া হলেও সেখানে কেবল অফিস কক্ষ ব্যবহারের জন্য অনুমোদন ছিল। কিন্তু রেস্টুরেন্ট শোরুম বা অন্য কিছু করার জন্য অনুমোদন নেয়া হয়নি।

দেশে প্রতিবছর ছোট-বড় ২০ হাজারের উপরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান মতে, ২০২২ সালে ২৪ হাজার ১০২টি, ২০২১ সালে ২১ হাজার ৬০১টি, ২০২০ সালে ২১ হাজার ৭৩টি, ২০১৯ সালে ২৪ হাজার ৭৪টি এবং ২০১৮ সালে ১৯ হাজার ৬৪২টি আগুন লাগার ঘটনা ঘটে।
২০০০ সালে ঢাকার চৌধুরী নিট ওয়্যারে আগুন, ২০০১ সালে মিরপুরের ম্যাক্রো সোয়েটারে আগুন, ২০০৫ সালে নারায়ণগঞ্জের শান নিটিং অ্যান্ড প্রসেসিং লিমিটেডে আগুন, ২০০৬ সালে চট্টগ্রামে কে.টি.এস টেক্সটাইল মিলে আগুন, ২০১০ সালে গাজীপুরের গারিব এন্ড গারিব সোয়েটার ফ্যাক্টরীতে আগুন, একই বছর আশুলিয়ার হামীম গ্রুপের দ্যাটস ইট স্পোর্টস ওয়্যারে আগুন, ২০১২ সালে আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনস লিমিটেডে আগুন, ২০১৬ সালে টঙ্গীর টাম্পাকো ফয়েলস কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ, ২০১৭ সালে গাজীপুরের মাল্টিফ্যাবস কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণ, ২০২১ সালে নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুড ফ্যাক্টরিতে আগুন, ২০২২ সালে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কন্টেইনার ডিপোতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ এগুলো বিগত কয়েক বছরের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। অগ্নিকাণ্ডের এক-তৃতীয়াংশ ঘটনা ঘটেছে আবাসস্থলে। শিল্প কারখানা এবং পোশাক কারখানায়ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কম ঘটেনি। এছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রংপুরে বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে এবং সবচেয়ে কম সিলেট বিভাগে।

২০১৫ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক প্রতিবেদন অনুসারে, ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ হারে নগরায়ণ হচ্ছে (রেট অব আরবানাইজেশন)। যদিও বিগত কয়েক দশকে এ হার কিছুটা কমতির দিকে, কিন্তু নগরায়ণের মাত্রা (লেভেল অব আরবানাইজেশন) এখনো আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৯৭৪ সালে নগরায়ণের মাত্রা ছিল মাত্র ৮ দশমিক ৭৮ শতাংশ (পরিকল্পনা কমিশন, ২০১৩)।
২০১১ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে ২৩ দশমিক ৩০ শতাংশে উন্নীত হয় (পরিকল্পনা কমিশন, ২০১৩, বিবিএস, ২০১৪)। আরেকটি হিসাব অনুসারে, ২০১১ সালে বাংলাদেশে নগরায়ণের মাত্রা ছিল ২৫ থেকে ২৮ শতাংশের মধ্যে (বিবিএস, ২০১৪, পরিকল্পনা কমিশন, ২০১৫)। ২০১৭ সালে তা ছিল ৩৫ দশমিক ৮ শতাংশ (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, ২০১৮)। এ ধারাবাহিকতা অনুসারে ধারণা করা হচ্ছে যে ২০২৫ সালের মধ্যে এ দেশে নগরায়ণের মাত্রা ৫০ শতাংশে পৌঁছবে (বাংলাদেশ আরবান ফোরাম, ২০১২)।
২০৫০ সালের মধ্যে শহরে বসবাসরত জনগণের সংখ্যা ৫৬ শতাংশে উন্নীত হবে (ইউএন, ২০১৪)। উল্লেখ্য, একটি নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের নগরগুলোয় বসবাসরত জনগণের সংখ্যার গড় পরিবর্তনকে বলা হয় নগরায়ণের হার (রেট অব আরবানাইজেশন)। অন্যদিকে একটি দেশের মোট জনসংখ্যা এবং নগরগুলোয় বসবাসরত নাগরিকদের অনুপাতকে নগরায়ণের মাত্রা (লেভেল অব আরবানাইজেশন) বলা হয়।
রাজধানীতে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা শহর এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত ভবনের মিশ্র ব্যবহারের কারণে একই ভবনের বিভিন্ন তলায় রেস্টুরেন্ট, পোশাক শো-রুম, রাসায়নিক গুদাম, শিল্পকারখানা ও আবাসিক বসবাস। সব মিলিয়ে যেকোনো মুহূর্তেই যেকোনো ধরনের অগ্নিকাণ্ডে জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির শঙ্কা আছে ভয়ানক। বিগত বছরগুলোতে জলাশয়-জলাভূমি ভরাট করে এবং ইমারত নির্মাণের আইন ও বিধিবিধান উপেক্ষা করে ভবন নির্মিত হয়েছে। এসব ভবনে বসবাসকারী মানুষেরা ভূমিকম্প বা ভূমিধসসহ যেকোনো দুর্যোগে জীবনের ঝুঁকিতে রয়েছেন।

অন্যদিকে ধরুন ঢাকা শহরের মধ্যে ভয়াবহ আগুন লেগেছে। ফায়ার ব্রিগেড পৌঁছে কোথাও পানির উৎস খুঁজে পাচ্ছে না। ভাবছেন শহরজুড়ে পানি আছে, আসলে কিন্তু নেই। পুকুর নেই, খাল নেই, কোথাও কোথাও ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি ঢোকার রাস্তা নেই। পরিস্থিতি কল্পনা করার কথা বলা হলেও, এই ঢাকা শহরে অহরহ ঘটছে এমন ঘটনা। কোনও একটি আগুনের ঘটনা একটু তীব্র হলেই নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারার কারণ হিসেবে প্রথম শোনা যায় ‘পানি সংকট’-এর কথা। ফলশ্রুতিতে, কাছাকাছি কোথাও পানির সহজলভ্য উৎস না পেয়ে আগুন নেভাতে সময় লেগে যায় ফায়ার সার্ভিসের।
বাংলাদেশে বেশিরভাগ ভবন ও বাসাবাড়িতে অগ্নি নিরাপত্তার বিষয়টিকে প্রাধান্য দেয়া হয় না এবং এ কারণেই এ ধরণের দুর্ঘটনার সময় ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা যায় না। অগ্নি নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোন ভবন বা বাসাবাড়িতে অগ্নি দুর্ঘটনা ঠেকাতে বা এর ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে হলে ভবন নির্মাণ পর্যায় থেকেই নিতে হবে প্রস্তুতি। এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে অনেকাংশেই ভবনে অগ্নি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
ডাক্ট লাইন ও ক্যাবল হোল সিল করা: আধুনিক বহুতল ভবনগুলিতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, হিটিং, বিদ্যুৎ এবং গ্যাস সংযোগের জন্য যে পাইপগুলো টানা হয়, সেগুলো যায় ডাক্ট লাইন এবং ক্যাবল হোলের ভেতর দিয়ে। এই ডাক্ট লাইন ও গর্ত দিয়ে ধোঁয়া এবং আগুন খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে। এজন্য ডাক্ট লাইন ও ক্যাবল হোলগুলো আগুন প্রতিরোধক উপাদান দিয়ে ভাল করে বন্ধ করে দিতে হবে। আগুন প্রতিরোধী উপাদান ব্যবহার: একটি ভবন নির্মাণের সময় কী ধরণের।
ভূমিকম্প এবং আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনা ঠেকাতে এ ধরণের উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্ষেত্রে দরজা এবং দেয়াল আগুন প্রতিরোধী হলে ভাল হয়। এছাড়া ঘরের সিলিং, রান্নাঘরের আসবাবপত্র আগুন প্রতিরোধী পদার্থে নির্মাণ এবং আগুন প্রতিরোধী তার ব্যবহার করলে আগুন লাগলেও সেটি ছড়িয়ে পড়ার ভয় থাকে না। অ্যালার্ম সিস্টেম বসানো: প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়ার পরও যদি কোন ভবনে আগুন লাগে তাহলে সেক্ষেত্রে ক্ষয়ক্ষতিয়ে কমিয়ে আনার একটা উপায় হচ্ছে ফায়ার এবং স্মোক অ্যালার্ম সিস্টেম বসানো এবং সেটি ঠিক মতো কাজ করে কিনা তা নিয়মিত পরীক্ষা করা। জরুরী বহির্গমন পথ নিশ্চিত করা ও ব্যবহার: যেকোন ভবনেই আগুন লাগলে সেটি থেকে বের হয়ে আসার জন্য বাইরে একটা জরুরী বর্হিগমন পথ থাকতে হবে। এটা হতে হবে এমন একটি পথ যেখানে আগুন এবং ধোয়া প্রবেশ করতে পারবে না। কারণ কোন ভবনে আগুন লাগলে বা ভূমিকম্প হলে ওই ভবনের লিফট ব্যবহার না করার পরামর্শ দেয়া হয়। ফায়ার এক্সটিংগুইশার রাখা ও ব্যবহার করা: প্রতিটি ভবনেই অগ্নি নির্বাপন সিলিণ্ডার বা ফায়ার এক্সটিংগুইশার থাকাটা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে এগুলো ব্যবহার করতে জানতে হবে ভবনে। কোন একটি ভবনে আগুন লাগার পর সেটি ছড়িয়ে পড়তে কিছুটা হলেও সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে যদি অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা দিয়ে সেটি নিভিয়ে ফেলা যায় তাহলে বড় ধরণের দুর্ঘটনা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।

মোদ্দাকথা হলো, আমাদের জীবনকে নিরাপদ করতে ভবনমালিক কিংবা ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকদের আইন প্রতিপালনে বাধ্য করার জন্য রাষ্ট্রের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিভিন্ন সেবাদানকারী সংস্থা, উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলোকে দায়িত্ব পালনে বাধ্য করাও রাষ্ট্র ও সরকারের দায়িত্ব। বিভিন্ন ভবন বিস্ফোরণ, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ভবনমালিকের দায় নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়, কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী, যাঁদের তদারকির গাফিলতিতে আমাদের জীবন এভাবে অনিরাপদ ও মূল্যহীন হয়ে পড়েছে, তাঁদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনাও অত্যন্ত জরুরি।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








