‘গ্রেট ব্ল্যাক ওয়ান’ বা ‘মহা-কালো’ খ্যাত পৃথিবীর পঞ্চম সর্বোচ্চ আটহাজারি পর্বত শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু শিখর অভিযানের গল্প শোনালেন এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী বাবর আলী।
রোববার (১৭ মে) সকালে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে অভিযান পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন ও পতাকা প্রত্যর্পণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স। এতে পর্বতারোহী বাবর আলী ছাড়াও পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠান ‘ভিজুয়াল নিটওয়ার লি. এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ নুর ফয়সাল উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের ক্লাবের সভাপতি ফরহান জামান বলেন, ‘বিশ্বের পঞ্চম শীর্ষ পর্বত মাকালুতে বাবরের সৌজন্যে উড়ল আমাদের গর্বের লাল-সবুজ পতাকা। ব্যাপারটা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য বিশাল গর্বের। আমরাও যে পর্বতারোহণ নামক স্পোর্টসে দারুণ কিছু করে দেখাতে পারি, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ বাবর। সামনের দিনগুলোতেও ওর কাছ থেকে দারুণ সব আরোহণের দেখা পেতে উন্মুখ হয়ে আছি। যথাযপথ পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সে পর্বতারোহণ নামক এই স্পোর্টসের মাধ্যমে দেশকে অনন্য জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।’
সংবাদ সম্মেলনে বাবর বলেন, ‘যদিও এ বছর আমার ইচ্ছে ছিল কারাকোরাম হিমালয়ে অবস্থিত বিশ্বের নবম উচ্চতম শৃঙ্গ নাঙ্গা পর্বত আরোহণের। কিন্তু অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় টাকার স্বল্পতা ও নানান কারণে আমি শেষ মুহুর্তে পাখির চোখ করি মাউন্ট মাকালুকে। পূর্বে আরো বেশ কয়েকটা আট হাজার মিটার আরোহণ করলেও এই পর্বতের মতো ঠান্ডা আর হাওয়ার কামড়ের মুখোমুখি কোথাও হতে হয়নি। এই ভয়াবহ ঠান্ডা আর হাড় হিম করা বাতাসের জন্য এই পর্বতে কাটানো প্রতিটা মিনিটই ছিল এক অর্থে কঠিন। আর মাকালু পর্বত আবহাওয়ার দিক থেকেও খুবই রহস্যময় আচরণ করেছে পুরো অভিযানজুড়েই।
তিনি বলেন, এখানের আবহাওয়া খুব দ্রুতই পরিবর্তিত হয়। এর সাথে মানিয়ে নেওয়াটা সহজ নয় অনেকাংশেই। এছাড়া এই অভিযানেই আমি হারিয়েছি আমেরিকান বন্ধু শেলি জোহানসেনকে। চূড়া আরোহণ শেষে নেমে আসার পথে তুষারধসে পড়ে প্রাণ হারান শেলি। আমার আরেক বন্ধু রাশিয়ান কন্সট্যান্টিন শিকার হয়েছে তুষারক্ষতের। ওর সাথে এই অভিযানে সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছি আমি। হাত-পায়ের বেশ অনেকগুলো আঙুল তুষারক্ষতের কারণে হারিয়েছে ও। পর্বত মাঝে মাঝেই খুবই অন্যায্য আচরণ করে। সব মিলিয়ে এই পর্বত আরোহণের অনুভূতি খুবই মিশ্র।
বাবর আলী বলেন, লাল-সবুজ পতাকা হাতে আরোহণের আনন্দ যেমন আছে, তেমনি এই দুর্ঘটনাগুলো নিয়ে অসম্ভব খারাপ লাগাও আছে। যাহোক, প্রতিটা পর্বত চূড়ায় লাল-সবুজ পতাকা হাতে এই মাটির কেউ দাঁড়ালে, দেশটাও তাঁর সাথে কিছুটা হলেও উপরে ওঠে বলে আমি বিশ্বাস করি। আশা করি, পরের পর্বতারোহীরাও সেই ধারা অব্যাহত রাখবে। তবে পর্বতে যাওয়াটা তো কোন খেয়ালি ব্যাপার কিংবা দিবাস্বপ্ন নয়। এর পেছনে দীর্ঘ সাধনা আর প্রস্তুতির ব্যাপার আছে।
তিনি আরও বলেন, প্রস্তুতির ব্যাপারটাতে সবাই যাতে আরো বেশি মনোযোগ দেয়, সেই প্রত্যাশা থাকবে আমার। আর আমি চাই ১৪টি আটহাজারি শৃঙ্গের সবকটিতেই চড়তে। সবেমাত্র ৫টি হলো, বাকি আছে আরও ৯টি। আশা করি পর্যাপ্ত পৃষ্ঠপোষকতা পেলে লাল-সবুজ পতাকা হাতে বাকি ৯টি পর্বতের চূড়ায়ও আমি দাঁড়াতে পারব।’
গত ২ মে বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৪৫ এ বাবর আলী নিজের পঞ্চম আটহাজারি পর্বত হিসেবে স্পর্শ করেছেন পৃথিবীর পঞ্চম উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট মাকালু শিখর। নেপালের মহালাঙ্গুর হিমালয়ে অবস্থিত ৮ হাজার ৪৮৫ মিটার (২৭ হাজার ৮৩৮ ফুট) উচ্চতার এই পর্বতে এটিই প্রথম বাংলাদেশি সফলতা। দেশে ফিরেই ‘এক্সপিডিশন মাকালু: দ্য ফিফথ ফ্রন্টিয়ার’ শীর্ষক এই ঐতিহাসিক অভিযানের গল্প শোনালেন বাবর আলী।


