মোহাম্মদপুরে মা-মেয়েকে হত্যার পর স্বামীর পরামর্শে পোশাক পাল্টে নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে বহুতল আবাসিক ভবন থেকে বেরিয়ে যান ঘাতক আয়েশা। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে বের হয়ে এসেছে ৬ মাস আগে মোহাম্মদপুরের বসিলায় একটি বাসায় চুরি করেছিল আয়েশা।
আজ বুধবার দুপুরে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার দপদপিয়া ইউনিয়নের কয়ারচর এলাকা থেকে মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ আয়েশাকে গ্রেপ্তার করে। তিনি নরসিংদীর সলিমগঞ্জ এলাকার রবিউল ইসলামের মেয়ে। হত্যাকাণ্ডের পর নলছিটির দপদপিয়া ইউনিয়নের কয়ারচর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন এই তরুণী।
পুলিশের অভিযানে তার স্বামী জামাল সিকদার রাব্বিকেও আটক করা হয়েছে। জামাল ওই এলাকার জাকির সিকদারের ছেলে। জামাল ও আয়েশা ঢাকায় থাকেন। মা-মেয়ের হত্যাকাণ্ডের পরে তারা বাড়িতে আসেন।
গৃহিণী লায়লা আফরোজ ও তার মেয়ে নাফিসা আজিজকে হত্যার পর আয়েশা তার স্বামীকে ফোন করে বিষয়টি জানান। আয়শাকে পালাতে সহায়তা করেন তার স্বামী রাব্বী।
স্বামীর পরামর্শেই পোশাক পাল্টে নিহত নাফিসার স্কুল ইউনিফর্ম পড়ে মুখ ঢেকে বহুতল ওই আবাসিক ভবন থেকে বেরিয়ে আসেন আয়েশা।
বুধবার ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের এডিসি মোহাম্মাদ জুয়েল রানা এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, নলছিটির দাদা শ্বশুরের বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। খুনের পর আয়েশা তার স্বামী রাব্বীকে হত্যার বিষয়ে জানালে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে আসার কৌশল বলে দেন। বহুতল ওই আবাসিক ভবন থেকে বেরিয়ে আসার পর আয়েশাকে নিয়ে ঢাকা ছেড়ে পালিয়ে যান স্বামী রাব্বী।
এডিসি জুয়েল রানা জানান, মা-মেয়ে হত্যার ৬ মাস আগে মোহাম্মদপুরের বছিলার একটি বাসায় চুরি করেছিল আয়েশা। ওই সময় তার ব্যাপারে থানায় অভিযোগ করা হয়েছিল। সেই অভিযোগের সূত্র ধরে আয়েশার খোঁজ শুরু করে পুলিশ। অবশেষে সকালে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ঘটনার দিন বাসা থেকে টাকা-পয়সা, স্বর্ণালংকার ও একটি মোবাইল ফোন নিয়ে পালিয়ে যায় আয়েশা। ফোনটি প্রথমে জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় বন্ধ হয়ে যায়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার দিন সোমবার সকাল ১০টার দিকে মোবাইলের শেষ টাওয়ার লোকেশন ধরে অনুসন্ধান শুরু করে মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ। পরে ফোনটি সাভার এলাকায় চালু হলে পুলিশ সেখানে পৌঁছে আয়েশার শাশুড়িকে পায়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, আয়েশা ঝালকাঠির নলছিটি এলাকায় অবস্থান করছে।
পুলিশ জানায়, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চুরির ঘটনা নিয়ে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে জানিয়েছে গৃহকর্মী আয়েশা।প্রাথমিকভাবে আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদে সে জানিয়েছে, তাকে চুরির অপবাদ দেয়া হয়েছিল। সেই ক্ষোভে সে মা-মেয়েকে হত্যা করেছে।
পুলিশের সূত্র আরও জানায়, ঘটনার দিন বাসার মালামাল চুরি করে নেওয়ার সময় লায়লা আফরোজের কাছে আয়েশা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে লায়লা আফরোজ তাকে আটকে পুলিশে ফোন দিতে গেলে আয়েশা ধারালো ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে তাকে হত্যা করে।
মায়ের চিৎকার শুনে ঘুম থেকে উঠে মেয়ে নাফিজা বিনতে আজিজ দৌড়ে ড্রয়িংরুমে এসে মাকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পায়। ওই সময় গৃহকর্মী তাকেও ধারালো ছুরি দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে হত্যা করে।
মোহাম্মদপুর থানার ওসি (অপারেশন) মফিজ খান বলেন, যেকোনো অপরাধী ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে তার প্রমাণ সে নিজেই রেখে যায়। মোহাম্মদপুর থানা-পুলিশ ঘটনার দিন থেকেই সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে ঘাতক গৃহকর্মীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছে।
ঘাতককে গ্রেপ্তার অভিযানে নেতৃত্ব দেন তেজগাঁও বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন। তার সঙ্গে ছিলেন এসআই মাসুম, এসআই খোরশেদ, এসআই আক্কেল আলী, এসআই জসিম ও নারী কনস্টেবল শিল্পী।
পুলিশ জানায়, এ অপরাধীর সন্ধান পাওয়া ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ঘটনার মাত্র দুই দিনের মধ্যে গ্রেফতার হওয়ায় সাধারণ মানুষ স্বস্তি প্রকাশ করেছে এবং পুলিশ সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়েছে।
সোমবার সকালে শাহজাহান রোডের ১৪ তলা একটি আবাসিক ভবনের সপ্তম তলায় গৃহকত্রী লায়লা আফরোজ ও তার মেয়ে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিয়াকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। এই হত্যার ঘটনায় অন্যতম সন্দেহভাজন ছিল গৃহকর্মী আয়েশা। ঘটনার দিন সকাল ৭টা ৫২ মিনিটে বোরকা পরে বাসায় ঢোকে সে। আর ৯টা ৩৬ মিনিটে মা-মেয়েকে খুন করে মেয়ে নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যায়। এই জোড়া খুনের ঘটনায় সোমবার রাতে নিহত লায়লা আফরোজের স্বামী আজিজুল ইসলাম মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন।







