যা হবার ছিল, হয়েছে তাই। যা ঘটার ছিল, ঘটেছে সেটাই। শনিবার রাতে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের এক বিশেষ সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এই বিশেষ সভা চলে রাত সাড়ে আটটা থেকে পৌনে ১১টা পর্যন্ত।
এর মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হলো। যার প্রেক্ষাপট ছিলো বিশাল। সমাজ বাস্তবতায় যে ঘটনার অভিঘাত এখনও অজানা। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবিটি মূলত শুরু হয়েছিল ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর।
বাংলাদেশকে দীর্ঘ ১৫ বছর নির্বাচনহীনতায় রেখে আপাতদৃষ্টে একটি গণতান্ত্রিক বলয়ের মায়াজাল সৃষ্টি করে আওয়ামী লীগ দেশে এক অদ্ভুত এবং অভূতপূর্ব রাজনীতি চালু করে। বাংলাদেশের মানুষ এক নতুন ধরণের রাজনৈতিক ধারা দেখতে পায়। যেখানে অসম্ভব বলে কোন কথা নেই। বাংলাদেশের ইতিহাসে যা কিছু কখনোই হয়নি এবং আপাতদৃষ্টে অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল তার সবই দেখা গেছে এই সময়টাতে।
২০০৮ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয় লাভের পরপরই বাংলাদেশে ধীরে ধীরে নতুন ধারার এই রাজনীতি দেখা যায়। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার নেপথ্য শক্তি নতুন ধারার এই রাজনীতির ভিত তৈরি করা হয় সময় নিয়ে। যার প্রথম ধাক্কাটি ছিল ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটে যাওয়া বিডিআর বিদ্রোহ এবং এর পরবর্তী পদক্ষেপ। দেশের জনগণ সেদিন সশস্ত্র বাহিনীর প্রতি ঘটে যাওয়া নৃশংতা দেখেছিল। দেখেছিলে দেশের সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আক্রমণের পর, সরকারের নিরেট নির্লিপ্ততা।
বিডিআর বিদ্রোহের থেকেই বাংলাদেশে নতুন আরও বহু কিছুর প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে ওঠে দেশের সাধারণ জনগণ। ওয়ান ইলেভেনে ব্যকফুটে চলে যাওয়া বিএনপিকে, আওয়ামী লীগ ঠাণ্ডা মাথায় রাজনীতির মাঠ থেকে মাঠা ছাড়া করতে তুলে নেয় এক নতুন পদ্ধতি। গুম! রাজনীতির মাঠে বিএনপির শক্তিশালী নেতাদের গুম করার আরেক নতুন পদ্ধতি বেছে নেয় আওয়ামী লীগ। ২০১০ সাথে চৌধুরী আলম গুম। ২০১০ সালের ২৫ জুন রাতে ফার্মগেটের ইন্দিরা রোডে একটি সাদা মাইক্রোবাসে করে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে আলমকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। অনেক প্রচেষ্টার পরও পাওয়া যায়নি তাকে। একাধিক টেলিভিশন ও পত্রিকায় প্রকাশিত একাধিক সংবাদ, সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া অথবা মানবাধিকার। সবকিছুর প্রতিই বৃদ্ধাঙ্গুলী প্রকাশ করার শক্তি দেখায় আওয়ামী লীগ সরকার।
এ সময় আওয়ামী লীগের এক নতুন একটি রাজনৈতিক কৌশল অনেকটাই মোহগ্রস্থ করে রাখে দেশের বড় অংশের মানুষকে। কুইকরেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং উন্নয়ন পদাবলি। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি ন্যারেটিভ ধারণ করে প্রতিপক্ষকে ঢালাও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী আখ্যা দেয়া। কুইকরেন্টাল প্রকল্প আওয়ামী লীগ সরকারের বড় হাতিয়ার ছিল এটি সত্যি। বিদ্যুৎ এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় বড় একটি ধারা তৈরী করেছিল এটিও সত্যি। দেশের মানুষ সেই পরিকল্পনায় স্বস্তি পেলেও দীর্ঘ মেয়াদে এই বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোই জনতা এবং দেশকে শোষণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হয়ে উঠবে, নতুন রাজনীতির ধারায় সাধারণ জনতা বোধ করি তখনও বুঝতে পারেনি।
অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের ন্যারেটিভ ধারণ করে আওয়ামী লীগ এক রুদ্ররুপ ধারণ করে। যদিও মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে থাকা স্বাধীনতা দেশাত্ববোধ এবং স্বদেশপ্রেমের নরম অংশটিতে আওয়ামী লীগ হাত দিতে সক্ষম হয় কিন্তু সাধারণ মানেুষের তন্দ্রা ফিকে হয়ে আসে যখন তারা বুঝতে পারে স্বাধীনতার চেতনাকে ঢাল বানিয়ে দেশ থেকে বিপুল অর্থপাচার, বিরোধী দমন এবং দীর্ঘ মেয়াদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মুখে মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেও আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিটি স্তরকেই অবমাননা করে। হরণ করে সাধারণ মানুষের কথা বলার অধিকার। সমালোচনার অধিকার। অর্থনৈতিক শোষণ থেকে বাঁচার অধিকার।
আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত থাকলে কেবল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং ভিন্ন দলের মুক্তিযোদ্ধারাও স্বাধীনতা বিরোধী এমনই এক অদ্ভুব অবস্থান নেয় দলটি। একই সাথে দেশের আইন শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে প্রতিটি সংস্থাকে ব্যবহার করে একটি ফ্রাঙ্নেস্টাইন এক নায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেতে। মুক্তিযুদ্ধের ইস্যুতে দেশের মানুষকে বিভক্ত করে দেশের সুবিধা নেয় আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকা কালীন সময় দুর্নীতি হয়ে ওঠে এক অঘোষিত সরল পন্থা। যেখানে সাবেক অনেক সরকারি সাবেক কর্মকর্তার হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ তৈরির খবর প্রকাশ হয় গণমাধ্যমে। সরকারি অফিসে ঘুষ দেয়া যেন একটা স্বাভাবিক সংস্কৃতি। ঘুষের নাম বদলে যায় স্পিড মানিতে। এস আলম, হলমার্ক থেকে শুরু করে মধ্য শ্রেনীর রাজনীতিবিদে ও ব্যবসায়ীরাও দেশের বাইরে পাচার করে হাজার কোটি টাকার অর্থ। প্রতি বছর লক্ষ কোটি টাকা বিদেশে পাচার ছিল সাধারণ বিষয়।
এ বিষয়ে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, এতো দুর্নীতি হয়েছে, যা আগে কখনো মানুষ দেখেনি। দুর্নীতি নিয়ে মানুষের ভয়, চক্ষুলজ্জাও উঠে গিয়েছিল। এসবের মধ্য দিয়ে তারা যে বিত্ত অর্জন করেছে, তা পাচার করে দিয়েছে। যেখানে মানুষ কষ্টে জীবনযাপন করছে, সেখানে নেতা-মন্ত্রীদের বিদেশে অঢেল সম্পদের তথ্য মানুষকে বিরক্ত আর ক্ষুব্ধ করেছে। দল হিসেবে যেই দুর্নীতিকে পুরোপুরি সমর্থন করে আওয়ামী লীগ।
বিরোধী মত দমনেও বলতে গেলে বিশ্বের সবচেয়ে কলঙ্কজনক নজিরের কাছাকাছি পৌছে যায় দলটি। আয়নাঘর, ফোনে আড়ি পাতা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারী, কলঙ্কজনক আইসিটি আইনসহ সমাজের প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে তৈরি করে নতুন বেঞ্চমার্ক। সাধারণ মানুষের চিন্তাকেও জোর করে আওয়ামী করণের পথে হাটে দলটি। দলটির নারী কেলেঙ্কারি ছিল অনেকটাই স্বাভাবিক বিষয়। মেগা প্রজেক্ট এবং মেগা দুর্নীতি আর মেগা পাচারের পুরো ঘানি বয়ে বেড়াতে হয় দেশের মানুষকে।
সবচেয়ে ভয়ংকর দিক ছিল বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ এবং দুর্নীতির প্রকোপ। দেশে দুর্নীতি যখন প্রকট হয় তখন বিচার বিভাগেও পরে এর ভয়ংকর কালো ছায়া। গণমাধ্যমকে কুক্ষিগত করে প্রভাবের মুখে সরকার পন্থি করা, সংবাদ প্রকাশে বাধা এবং মুক্ত গণমাধ্যমে অন্ধকার পর্দা টেনে বাংলাদেশে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ষোল কলা পূর্ণ করে আওয়ামী লীগ।
দেশের প্রতিটি আদেশের জন্য দলটির প্রধান এবং তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনার অঙ্গুলী হেলনই ছিল শেষ কথা। যার প্রতিটি বিষয়ই ছিলো ম্যাজিক রিয়েলিজমের বাস্তবিক বাস্তবায়ন।
ক্ষমতায় আসার পর নানান উপায়ে দেশের জনতাকে মোহগ্রস্থ করে রাখার সাফল্য দেখানো আওয়ামী লীগের ওপর জনগণের তন্দ্রা সেদিন পুরোপুরি কেটে গিয়েছিলো যেদিন ভোট দেবার অধিকারটুকুও হারায় দেশের সাধারণ মানুষ। অন্যদিকে ভয়াবহ মিথ্যাচারের মাধ্যমে দিন রাত দেশের গণমাধ্যমের সামনে এসে দেশে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি দলটির আদর্শিক এবং নৈতিক অবস্থানকে সাধারণের কাছে পরিস্কার করে তোলে।
সাগর রুনি হত্যা, আইন বহির্ভুত হত্যা, ওবায়দুল কাদেরের অরুচিকর বক্তব্য থেকে শুরু করে ডিবি হারুনের বাস্তবে এসে সিনেম্যাটিক আচরণে সাধারণ মানেুষের কাছে যে ম্যাসেজটি গেছে তা হল, অন্যায়, অসত্য, অবিচার কোন মন্দ বিষয় নয়। তা খুবই স্বাভাবিক। এবং ক্ষমতাবানেরা ক্ষমতায় থাকতে যে কোন পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারে যার কোন বিচার চাওয়ার চিন্তা করাও অন্যায়। রুচিহীনতার রাজনীতি স্বাভাবিক। দেশে আইন মানেই আওয়ামী লীগ। ক্ষমতার প্রকট দম্ভ প্রকাশ করাই ক্ষমতার আসল সৌন্দর্য।
তবে সবকিছুরই শেষ আছে। তারই ধারাবাহিকতায় পতন হয়েছিল শেখ হাসিনারও। অহংকার আর ঔদ্ধত্বের শেষ সীমায় পৌঁছে তাই শোষিত, নিষ্পেষিত জনতার হাতেই তার পতন। পতনের আগে আওয়ামী লীগ দেখিয়ে যায় তার প্রকৃত রূপ। নতুন রুপে একদলীয় শাষণ ব্যবস্থা চালু করা, একনায়কতান্ত্রিক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা, দীর্ঘ দিনের পুষে রাখা ক্ষোভে ফেটে পরা সাধারণ ছাত্র জনতার ওপর নির্মমভাবে গুলি চালাতে পিছপা হয়নি।
মূলত দীর্ঘ সময় ধরে রুচিহীনতার অপরাজনীতি, ফ্যাসিজম প্রতিষ্ঠা এবং দেশের মানুষের ওপর নির্বিচারে গণহত্যা চালানো দলটির রাজনৈতিক পতন সেদিনই হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সেদিনই আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর সেই রায় দিয়েছিলো দেশের নিষ্পেষিত জনগণ। যার ঘোষণা আসে শনিবার রাতে, যমুনা থেকে।
রাজনীতিতে রুচিহীনতা, নীতিহীনতা, ভিন্নমতের প্রতি অসম্মাণ, দুর্নীতি, এক নায়কতন্ত্র এবং উগ্রতা, দেশের জনগণ কখনওই বিষয়গুলো মেনে নেয়নি। সামনের দিনেও রাজনীতিতে পরমত অসহিষ্ণুতা, উগ্রতা এবং ফ্যাসিজমের ছায়া দেখলে জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করবে। ইতিহাস তারই সাক্ষ্য বহন করে।
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








