চট্টগ্রামের হোটেল আগ্রাবাদে উদ্বোধন হয়েছে এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের (এইউডব্লিউ) হিউম্যানিটিজ প্রোগ্রামের প্রথম হিউম্যানিটিজ কনফারেন্স। দুই দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশ ও বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং চলচ্চিত্র নির্মাতারা অংশ নিয়েছেন।
সম্মেলনে সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, ভাষা, সংস্কৃতি, পরিচয়, অভিবাসন, লিঙ্গ, আদিবাসী জ্ঞান এবং মানবিক শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন সেশন অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কনফারেন্সের আহ্বায়ক অধ্যাপক মাসুদুর রহমান বলেন, মানবিক শিক্ষা মানুষের চিন্তা ও অভিজ্ঞতার প্রকাশ ঘটায়। তিনি অংশগ্রহণকারীদের পাশাপাশি সম্মেলনের স্পন্সর ক্লিফটন গ্রুপ ও ডিটসকে ধন্যবাদ জানান।
স্বাগত বক্তব্যে এইউডব্লিউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. সঙ্গীতা রায়ামাঝি বলেন, “জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবিকতাই মূল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্বকে বদলে দেয়, কিন্তু মানবিকতা আমাদের মানুষ করে তোলে।” তিনি এই সম্মেলনকে ভিন্নমত শোনা, নিজস্ব ধারণাকে প্রশ্ন করা এবং অর্থবহ সংলাপ তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উল্লেখ করেন। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “হিউম্যানিটিজ সমাজের বিবেক, তার স্মৃতি এবং তার কল্পনা—যা আমাদের অতীতকে সংরক্ষণ করে, বর্তমানকে আলোকিত করে এবং ভবিষ্যৎকে অনুপ্রাণিত করে।”
প্রধান অতিথি ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত আদিবাসী অধিকার বিশেষজ্ঞ রাজা দেবাশীষ রায় জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য, ভাষা এবং মানবাধিকারকে পরস্পর-সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে তুলে ধরেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, পরিবেশ রক্ষায় বহু প্রজন্ম ধরে বন ও নদী সংরক্ষণ করে আসা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, “যত বেশি আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দেওয়া হবে, তত বেশি শান্তি থাকবে।” পাশাপাশি আদিবাসী ভাষার স্বীকৃতির ওপর জোর দিয়ে তিনি সতর্ক করেন, একটি ভাষাকে অস্বীকার করা মানে একটি জীবনধারাকেই অস্বীকার করা, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর।
‘হোয়াই হিউম্যানিটিজ ম্যাটার টুডে’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ইউল্যাব) স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের ডিন অধ্যাপক ড. কায়সার হক। প্রায় পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি বলেন, শুধু মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাই নয়, বর্তমান সময়ে কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা প্রায় সব ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভাষা ও মৌলিক দক্ষতার দুর্বল ভিত্তি নিয়েই অনেক শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে, যার সংস্কার শুরু করতে হবে স্কুল পর্যায় থেকে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা যদি খাপ খাইয়ে না নিই, তাহলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হবে যেখানে যন্ত্র যন্ত্রের সঙ্গে কথা বলবে।” একই সঙ্গে তিনি মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীলতা মূল্যায়নের নতুন পদ্ধতি নিয়ে ভাবার আহ্বান জানান। অনুবাদ ও বিশ্বসাহিত্যকে তিনি মানবিক শিক্ষার বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
দিনের শেষভাগে চারটি বিষয়ভিত্তিক প্যানেলে এইউডব্লিউ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইউল্যাব, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, চিটাগং ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কানাডার কনকর্ডিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা অংশ নেন। সাহিত্য, দৃশ্যকলা, স্মৃতি, লিঙ্গ, অভিবাসন ও দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসসহ বিভিন্ন বিষয়ে তারা গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন।
সম্মেলনের সঞ্চালনা করেন মিপ্রু মারমা ও জ্যোতি টিনা। ১১ জুলাই আরও পাঁচটি সেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি হবে।







