সংবিধানের মূল কপিতে বাবার স্বাক্ষরের কথা স্মরণ করে সেই সংবিধান রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ও অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ের পক্ষ থেকে দেয়া সংবর্ধনায় দেয়া বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সংবিধানের মূল কপিতে আমার বাবার স্বাক্ষর রয়েছে। প্রতিবার সংবিধানটি হাতে নিলে মনে হয় “বাবা যেন বলছেন- এ আমাদের পবিত্র আমানত, লাখো শহিদের রক্তের আখরে লেখা এই সংবিধান থেকে তুমি কখনো বিচ্যুত হয়োনা।”
সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, আইনজীবী ও পরিবারের সদস্যদের উপস্থিততে প্রধান বিচারপতি আরও বলেন, ‘আমি চাইব বিচার বিভাগ ও বিচারালয়কে যেন কোনভাবে রাজনীতিকরণ করা না হয়। এখানে বিচারক ও বিজ্ঞ আইনজীবীদের সম্মিলিত ও মেধাপুষ্ট দায়িত্ব পালনের মাধ্যমেই কেবল সুবিচারের লক্ষ্য অর্জিত হতে পারে এবং তবেই বিচার বিভাগের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকবে।’
মামলাজট ও বিলম্বিত বিচার প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মামলাজট এবং বিলম্বিত বিচার প্রকারান্তরে সুবিচারের ধারণাকে বিনষ্ট করে। কিভাবে এটি থেকে বিচার বিভাগকে মুক্ত করা যায় সেই কার্যকর পথ ও প্রক্রিয়া বের করতে হবে।’
দুর্নীতিমুক্ত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান বলেন, ‘সংবিধানের প্রতি লক্ষ্য রেখে বিচার প্রশাসনকে রাখতে হবে স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত, স্বাধীন এবং সোশ্যাল জাস্টিস তত্ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি দুর্নীতিমূক্ত বিচার ব্যবস্থা দেশ ও জাতির জন্য গর্বের। আমার দায়িত্ব পালনকালে আমার সতীর্থ বিজ্ঞ বিচারক এবং আইনজীবীদের সুচিন্তিত পথ ধরে একটি দুনীতিমুক্ত বিচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব।’

দেশের ২৪তম প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান গত ২৬ সেপ্টেম্বর শপথ নিয়েছেন।ওইদিন সকাল ১১টায় বঙ্গভবনের দরবার হলে ওবায়দুল হাসানকে শপথবাক্য পাঠ করান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। এর আগে ১২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে দেশের ২৪তম প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ১৯৫৯ সালের ১১ জানুয়ারি নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম ডা. আখলাকুল হোসাইন আহমেদ মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন এবং গণপরিষদ সদস্য হিসাবে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সংবিধান রচনায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন ও সংবিধানে স্বাক্ষর প্রদান করেন।
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসএস, এমএসএস ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৬ সালে আইনজীবী হিসেবে জেলা বারের সনদ প্রাপ্ত হন। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হিসেবে এবং ২০০৫ সালে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
ওবায়দুল হাসান সহকারী এটর্নি জেনারেল এবং ডেপুটি এটর্নি জেনারেল হিসেবে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে ৫ বছর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে ২০০৯ সালের ৩০ জুন যোগদান করেন এবং ২০১১ সালের ৬ জুন একই বিভাগে স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংগঠিত মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর একজন সদস্য হিসেবে ২০১২ সালের ২৫ মার্চ যোগদান করেন এবং ১৩ ডিসেম্বর ২০১২ তারিখে এই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত হয়ে ২০১৫ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ কর্মরত থাকাকালীন ১১টি মামলার রায় প্রদান করা হয়েছে। তিনি ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ১৯৯১ সালে হংকং এ অনুষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। ২০১৫ সালের আগস্ট মাসে সিঙ্গাপুরে একটি আইন সম্মেলনে যোগদান করেন এবং বুয়েন্স আয়ার্স, আর্জেন্টিনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ বিষয়ক একটি কনফারেন্সে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও ২০১৫ সালের আগস্ট মাসের শেষ দিকে নেদারল্যান্ডস এর হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল, তৎকালীন যুগোস্লোভিয়ার বিচারকদের সাথে এক মতবিনিময় সভায় যোগদান করেন।
‘অবর্ণনীয় নির্মমতার চিত্রঃ একাত্তরের বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড ও অন্যান্য’ এবং ‘বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশঃ একজন যুদ্ধশিশুর গল্প ও অন্যান্য’ নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।







