আমার মা আজ যে বাসাটি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে, সেই বাসায় সে ঢুকেছিল নতুন বউ হয়ে ৫২ বছর আগে। এই বাসায় আম্মা তার দুসন্তানের জন্ম দিয়েছে, স্বামীর সাথে ২৮ বছর সংসার করেছে, আমার ছোট ফুপুর, আমার আর বাবেলের বিয়ে হয়েছে এই বাসা থেকেই। অসংখ্য ভাই বোন এখান থেকে তাদের পড়াশোনা শেষ করেছে, এর চেয়েও আরো বেশি সংখ্যক আত্মীয়-অনাত্মীয় এখানে এসেছে- থেকেছে বিভিন্ন কাজে। আর অগণিত মানুষ আমাদের এই সরাইখানা টাইপ ছোট, সাদামাটা বাসাটিকে ঘিরে ঢাকা শহরে তাদের আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে। সবচেয়ে বড় স্মৃতি আব্বা এই বাড়ি থেকেই শেষবিদায় নিয়েছেন।
এতবছরের সাজানো সংসার গুটিয়ে নিয়ে ২/৩ বছরের জন্য চলে যেতে আম্মার এবং আমাদেরও বুক ফেটে যাচ্ছে। এত স্মৃতি কি ব্যাগে ভরে নিয়ে যাওয়া যায়? কিন্তু আম্মা তাই চাইছে। এই বাড়ির প্রতিটি ইট কাঠ আমাদের চেনে, আমাদের সব কথা জানে। আম্মা কোন জিনিসটা সাথে নেবে, আর কোনটা ছেড়ে যাবে, তা ভাবতে ভাবতেই তার চোখ জলে ভিজে যাচ্ছে। বারবার আমাদের বলছে, এইতো এই বারান্দায় তোর আব্বা অফিস থেকে এসে বসে থাকতো, এই চেয়ারে বসে গল্প করতো, এই দুটো ট্রাংক নিয়ে আমরা বাড়ি যেতাম, এইযে তোর দাদির ট্র্যাংক, তোর আব্বার বই, লেখাগুলো, স্মারক উপহার, সংসার খরচের পয়সা কষ্ট করে বানানো আমার কাঠের আসবাব, হাঁড়ি পাতিল, জগ, গ্লাস কি করবো, কোথায় রাখবো এসব?
আম্মাও জানে, আমরাও জানি সব পুরোনো স্মৃতি আমরা টেনে নিয়ে যেতে পারবোনা কিন্তু তারপরও এই দীর্ঘ পথচলার নুড়ি-পাথর, ছবি, মায়া আমাদের ডাক দিয়ে যাচ্ছে । এই বাড়িটা শুধু আমাদের কাছে বাড়ি ছিলনা, ছিল অপরিমিত হাসি, আনন্দ, শক্তি আর শান্তির উৎস। শুধু কি আত্মীয়-স্বজন? আব্বাসহ আমাদের সবার বন্ধুদের অবাধ যাতায়াত, আড্ডা আর আনন্দের জায়গা আমাদের ছোট বাসাটা। ছিলনা কোনো ভয়, বিধিনিষেধের বাড়াবাড়ি। এখানে যেটুকু কষ্ট ছিল, তা আমরা, মানে এই বাসায় থাকা একঝাঁক মানুষ ভাগ করে নিয়েছি।
কেন যেন আম্মার এই বাড়ি ছাড়ার দৃশ্যটি দেখে আমার বারবার মনে পড়েছে দেশবিভাগের উপর লেখা সেইসব গল্প-উপন্যাসের কথা। সাম্প্রতিক সময়ে এসে দেখেছি দহগ্রাম-আঙ্গুরপোতার মানুষগুলোর দেশ, স্বজন ছেড়ে যাওয়ার দু:খ কষ্ট। তাদের চোখে মুখে যে কষ্ট ছিল, আম্মার চেহারাতে সেটাই দেখতে পেলাম। এতবছর একসাথে থাকা মানুষগুলো কে যে কোথায় চলে যাবে, কে জানে।
আব্বা ১৯৯২ সালে চলে যাওয়ার পর থেকে এই বাসাটিকে ঘিরেই আম্মা দাঁড়িয়েছিল। তার সংসার, আব্বার স্মৃতি, ভালবাসা। আমার জন্মের সময় আমরা এখানেই থাকতাম ১০ নং বিল্ডিং এর ১১ নং ফ্ল্যাটে। আমার লিলি ফুপু, মন্টু চাচা এবং আমরা। তিন কামরার একটি ছোট ফ্ল্যাটে ৩টি পরিবার থাকতাম। রুপসু আর আমার জন্ম এখানেই ১৯৬৫ সালে।
পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় ২/৩ বছর গ্রীনরোডে থাকলেও আমরা আবার ১৯৭৪ সালে আরেকটি ফ্ল্যাটের বরাদ্দ নিয়ে উঠে আসি ১০ নং বিল্ডিং এর ৯ নং ফ্ল্যাটে। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আব্বাকে, তৎকালীন মর্নিং নিউজ পত্রিকার সম্পাদক, অভিজাত এলাকায় বাসা বরাদ্দ দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু আব্বা এই কলোনিতেই বরাদ্দ চেয়ে নিয়েছিল। আব্বা পরে আমাকে বলেছিল অন্য বাসা নিলে আমরা তা ধরে রাখতে পারতামনা বিভিন্ন কারণে, বরং এখানে সবার সাথে কম খরচে থাকবো সেটাই ভালো। আব্বার সেই কথাটা অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে। আব্বা অকালে চলে যাওয়ার পর এই ফ্ল্যাটটি ছিল বলেই আমরা ঢাকার বুকে টিকে থাকতে পেরেছিলাম।
আসাদগেট নিউকলোনির এই ফ্ল্যাটগুলো ছিল আমাদের নিজের বাসার মতো। কেমন যেন একটা অধিকারবোধ জন্মে গিয়েছিল। আম্মা এবং আম্মার মতো অনেকে কখনও ভাবেইনি যে এই বাসা ছেড়ে একদিন যেতে হবে। কলোনির ৭টি বিল্ডিং এর যারা বসবাস করেছে বা করছিল, তারা শুধু প্রতিবেশি ছিলনা, ছিল সবার আত্মার আত্মীয় । এই কলোনিতে বছরের পর বছর বাস করছে তারা।
এই কলোনির ৭টা মাঠে আমরা পুরো স্কুল জীবনটা খেলেছি, রাস্তায় রাস্তায় দলবেঁধে ঘুরেছি, মাঠে বৃষ্টির পানি জমে গেলে তাতে মাছ ধরেছি, খেলাঘর, কবিতার দল ’স্বগতোক্তি’ করেছি, ঈদ, শবেবরাত, পূজা, পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারিসহ সব উৎসবই করেছি সবাই মিলে। আম্মাদের দেখিনি কোনো একটি ভাল খাবার পাশের বাড়িতে না দিয়ে খেতে। আমাদেরও কলোনির বন্ধুবান্ধবের দলটাও ছিল অনেক বড়। আমরাও একটা বাটারবন কিনলে ১০ জনে ভাগ করে খেতাম।
কিন্তু আইয়ুব খানের সময়ে তৈরি এই কলোনির ভবনগুলোর বয়স হয়েছিল। দিনে দিনে জৌলুস হারিয়ে, পলেস্তারা খসে পড়তে শুরু করেছিল। এখনতো রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকায় চলে গেছে আমাদের বহু স্মৃতিবিজড়িত এই বাসাগুলো। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাড়িগুলো ভেঙে নতুন ভবন তৈরি করবে। ইতোমধ্যে সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি এখানকার আদি বাসিন্দাদেরও বরাদ্দ দিয়েছে।
আমরা অপেক্ষায় আছি আবার কবে নতুন ভবনগুলো হবে, কবে আম্মারা ফিরে যাবে প্রিয় নিউকলোনিতে। আমরা যেভাবে এই বাস্তবতাকে মেনে নিতে পারছি, আম্মা বা আম্মার বয়সী মানুষগুলো তা পারছেনা। আম্মা খেতে পারছেনা, কথা বলছেনা, চোখ ছলছল করছে। তাকে সান্তনা দেয়ার কোনো ভাষা আমার জানা নেই। আম্মা করুণ কন্ঠে আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, “ আমি কি তাহলে উদ্বাস্তু হয়ে গেলাম?”
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







