আমাদের দেশে বিশ্বকাপ নিয়ে উন্মাদনা নতুন কিছু নয়। বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের মাতামাতির খবর এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বহির্বিশ্বেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী কিছু দেশের সাংবাদিক এই নিয়ে প্রতিবেদন করতে বাংলাদেশে এসেছিলেন বলে আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি। রাষ্ট্রদূতগণও ভিনদেশে নিজেদের দেশের সমর্থকগোষ্ঠী দেখে বেশ উল্লসিত; ইতিমধ্যে তাদের অনেকে কোন কোন সমর্থকের বাড়ি পরিদর্শনও করেছেন। ফুটবলের প্রতি আমাদের ভালবাসা নিয়ে বিভিন্ন দেশের গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রচারিত হওয়ার খবরও পত্রিকায় এসেছে। মাসব্যাপী এই বিশ্বকাপ চলাকালীন সবচেয়ে বড় আর্কষণ বাড়ি ঘরের ছাদে, জানালায়, বারান্দায় বিভিন্ন রঙ-বেরঙের পতাকা প্রদর্শন বা উড়ানো। এই সুযোগে অনেকে বড় বড় পতাকা বানিয়ে এক দালান থেকে আরেক দালান দূরত্ব সমান পতাকা টাঙ্গিয়ে নিজেদের সমর্থন, ভালবাসা প্রকাশ করে থাকেন। যদিও বড় পতাকা তৈরির মাঝে অন্য দলের সমর্থকদের এক ধরনের হেয় করার সুপ্ত লক্ষ্য থাকে।
ফুটবল খেলার প্রতি ভালবাসা, সমর্থন, আগ্রহ থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের দেশের ন্যায় ফুটবলের প্রতি এত ভালবাসা, উন্মাদনা, মিছিল, মারামারি, পতাকা প্রদর্শন, প্রতিটি ম্যাচকে ঘিরে চুলচেরা বিশ্লেষণ আর নিজেদের ফেসবুকে প্রচার পৃথিবীর কোন প্রান্তে হয়ে থাকে কিনা জানা নেই।
২০১৫ বিশ্বকাপ ক্রিকেট চলাকালীন অস্ট্রেলিয়াতে ছিলাম বলে বাংলাদেশ বনাম ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়া বনাম পাকিস্তানসহ কিছু ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়েছিল (সাউথ অস্ট্রেলিয়াতে)। কিন্তু সেখানে আমাদের ন্যায় এইভাবে পতাকা প্রদর্শন, উন্মাদনা চোখে পড়েনি। তবে সবার মাঝে বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে কথাবার্তা আর বড় বড় শপিং মলে জার্সি বিক্রি হতেও দেখেছি (বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের জার্সি বিক্রি হতে দেখে গর্ব নিয়ে আমিও ৪৫ ডলার খরচ করে একটা কিনেছিলাম)। বিশ্বকাপ ম্যাচকে কেন্দ্র করে শহরকেন্দ্রিক যাত্রীবাহী বাসগুলোতে দর্শকদের চলাফেরার সুবিধার্থে রুটিন পরিবর্তন হতে দেখেছি। এটা ঠিক, বিশ্বকাপকে ঘিরে সেখানকার রাস্তাঘাট সাজানো হয়েছিল যদিও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে, যা ছিল খুবই মার্জিত এবং বিশ্বকাপের পরপরই সব সরিয়ে ফেলা হয়। 
বিশ্বকাপ ফুটবল সময়ে খেলাটির প্রতি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের এ ভালবাসা দিয়ে আগামীতে বিশ্বকাপ জয়ের চিন্তা করা না গেলেও বিশ্ব মানুষের মন জয় করার একটি সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। বিশ্ব সমাজ ইতোমধ্যে জেনেছে আমরা ক্রিকেট খেলা যেমন ভালবাসি তার চেয়ে অনেকগুণ আনন্দ আর নানা উদ্যোগ নিয়ে ফুটবল খেলা উপভোগ করি। তাই বিশ্বকাপ এলে বাংলাদেশকে পৃথিবীর বুকে আরেক পৃথিবীতে পরিণত করি অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর পতাকা প্রদর্শন আর সমর্থন যুগিয়ে। এ সময়ে ঢাকা (বাংলাদেশ) দেখিয়ে দেয় সারা পৃথিবীতে রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে যতই বিভেদ থাকুক বিশ্ব হয়ে উঠতে পারে এক শহরের বাসিন্দা, যেখানে সকলে বসবাস করবে সম্প্রীতি, সহযোগিতা আর যৌথতার মূল্যবোধ নিয়ে।
এবারের বিশ্বকাপে জাপানি দর্শকেরা খেলা দেখার পাশাপাশি স্টেডিয়াম পরিষ্কার করার উদ্যোগটির মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিশ্ব মানুষের মন জয় করেছেন। আমরাও চাইলে শুধু উন্মাদনায় আটকে না রেখে আমাদের এ উন্মাদনাকে ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’-এর নিদর্শন হিসাবে তুলে ধরতে পারি, এর শিক্ষা সমাজের সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে পারি। বিশ্বকাপ চলাকালে আমাদের ভালবাসাকে সংগঠিতভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে এ সময়টাতে আমরা, এমনকি বিদেশি পর্যটকদেরও, যার আকাল বহুদিন ধরে চলছে, বাংলাদেশ ভ্রমণে আগ্রহী করে তুলতে পারি।
যা হোক, যে-ভালবাসা দিয়ে একটি দেশের ফুটবল দলকে সমর্থন দেখাতে ওই দেশের পতাকা আমরা উড়িয়ে থাকি, দলটি ভালমন্দ যাই খেলুক না কেন, ওই একই ভালবাসা আর মর্যাদা দিয়ে বিশ্বকাপ শেষে পতাকাটি নামিয়ে ফেলা উচিত। কথাটি এই কারণে বলছি, দেখা যায় আমরা অনেক ভালবাসা আর আগ্রহ নিয়ে পতাকা উড়াই কিন্তু অনেকে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস পতাকাটি না নামিয়ে সেইভাবে রেখে দেন। ফলে পতাকাগুলো আগের সেই রঙ সৌন্দর্য হারিয়ে এক সময় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ধুলাবালি লেগে এক ধরনের ময়লা কাপড়ে পরিণত হয়। এতে একটি দল ও দেশের প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন করতে গিয়ে অজানতে আমাদের রুচিবোধ আর পরিবেশের প্রতি অসচেতনতার বহিঃপ্রকাশও ঘটে।
প্রিয় মেয়র প্রয়াত আনিসুল হকের সময়ে হাজার হাজার বিলবোর্ড, সাইনবোর্ড, পোস্টার সরানোর ফলে আমরা অন্য রকম এক ঢাকা পেতে শুরু করেছিলাম। চারদিকে দালানকোঠার ভিড়ের মাঝেও নিজেদের শহরকে ছিমছাম লাগছিল। এখন তার অনুপস্থিতিতে আবার সেই আগের ঢাকাতে রূপ নিতে শুরু করেছে। তার উপর হাজার হাজার পতাকা সব রোদে পুড়ে ধুলাবালি জমে ময়লা কাপড়ে পরিণত হয়ে ঝুলতে থাকলে শহরের সৌন্দর্য ম্লান হতে বাধ্য।
আসুন, বিশ্বকাপ সময়ে কোন একটি দলকে যোগ্য ভেবে সমর্থন করার পাশাপাশি দলটির জাতীয় প্রতীক বা পতাকাকেও যথাযথ ভালবাসা ও সম্মান দিই। এতে আপনার সমর্থিত দলের প্রতিও সত্যিকারের ভালবাসার প্রদর্শন হবে। শুধু তাই নয়, দেশের এই সংস্কৃতি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে আমাদের দেশেরও অন্যরকম এক ভাবমূর্তি দাঁড়াবে। এখানে অনেক পর্যটকের আগমন ঘটবে। আবার আমাদের চারপাশের পরিবেশও সুন্দর থাকবে।
ভিনদেশি একজন পর্যটক তার জাতীয় প্রতীকের প্রতি ভালবাসা দেখে যতটা খুশি হবেন, প্রতীকটি পুরনো হতে হতে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যেতে দেখলে ততটাই অখুশী হবেন। বিদেশের মাটিতে আমরাও আমাদের দেশের লাল-সবুজ পতাকা দেখলে খুশি হই। সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে নিয়ে আসি। জেনেভা শহরে আমাদের জাতিসংঘের স্থায়ী মিশনের পতাকাটি দেখে আমি যে খুশি হয়েছিলাম তা এখনো মনে রেখেছি। যতবার মিশনের সামনে রাস্তা দিয়ে হেঁটে গিয়েছিলাম ততবার পতাকার দিকে তাকিয়েছি। নেপালে গিয়ে সার্ক অফিসের সামনে পতাকার সারির মাঝে বাংলাদেশের পতাকা আমাকে আনন্দ দিয়েছে। ছবি তুলতেও ভুলে যাইনি।
মোদ্দা কথা হলো, আমাদের দেশে ফুটবলের এত দর্শকপ্রিয়তা থাকার পরও ফিফা র্যাকিং এ বাংলাদেশের অবস্থান ১৯৪তম (দক্ষিণ এশিয়ায় ৫ম)। তা দিয়ে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখতে না চাইলেও বিভিন্ন দেশের জাতীয় প্রতীকের প্রতি আমাদের যথাযথ ভালবাসা প্রদর্শন বিশ্ব মানুষের মন জয় করার একটি সহজতম উপায় হয়ে ওঠতে পারে। এই ক্ষেত্রে আমাদের জয়ের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের শিশু আর তরুণদেরকে জাতীয় পতাকার গুরুত্ব বোঝানোর জন্যও এটি একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








