পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বহারা পার্টিসহ বেশ কিছু আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠন রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দৃশ্যমান প্রকাশ্য ভূমিকায় তাদের প্রতিপক্ষ দলে ভুয়া পরিচয়ে মিশে যেত। তারা সেসব সংগঠনের নেতা হিসাবে জনপ্রতিনিধি ও ছাত্রসংসদের নেতাও নির্বাচিত হয়েছে অনেকে। তারা থেকেছে প্রকাশ্য ভূমিকায় একদলের নেতা ভেতর ভূমিকায় অন্যদলের নেতা। শত্রু পক্ষের সাথে থেকে শত্রু পক্ষ নিধনের কথিত বিলোপবাদী রাজনৈতিকধারা রাজনীতিতে আন্ডারগ্রাউন্ডপন্থীরাই প্রথম আনয়ন করেছিল।
সম্প্রতি বিএনপি নেতা মেজর মিজানের একটি অডিও রেকর্ড প্রকাশ পেল। এতে তিনি গাজীপুরের যুবদল নেতাকে বলছেন, কয়েকটি ছেলে দরকার যারা নৌকার ব্যাজ পরে ঘুরবে কিন্তু কাজ করবে ধানের শীষের। টাকা-পয়সা ও যন্ত্রপাতির সমস্যা নেই এগুলোর জোগান দেয়া হবে। পদে পদে মার খেতে খেতে দলটি যে স্বাভাবিক বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলেছে ও পথ হারিয়ে বিপথের যাত্রী হচ্ছে মেজর মিজানের এই চিন্তাতেই তার প্রমাণ।
বিভিন্ন দলছুট বাম, ডান, মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকারদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল জাতীয়তাবাদী ফ্রন্ট। এই জাতীয়তাবাদী ফ্রন্টই পরবর্তিতে জাতীয়তাবাদী দলে রূপ নেয়। বিএনপি রাজপথের লড়াই সংগ্রামের মাধ্যমে সৃষ্ট কোনো দল নয়। এটি ক্ষমতা কেন্দ্রিক মন্ত্রী-এমপি হওয়া ও নানা সুবিধা পাওয়ার উপর ভিত্তি করেই প্রতিষ্ঠিত। অনেক বামপন্থী নেতা জিয়ার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পায়। অনেক রাজাকার জিয়ার মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পায়। আবার মুক্তিযোদ্ধাও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পায়। ক্ষমতার মধুর এমনই যাদু একজন মুক্তিযোদ্ধাকেও রাজাকারের পাশে বসতে আপত্তি করতে দেখা যায়নি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা মেজর জিয়াউর রহমান নিজেও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনিই আবার রাজাকার মশিউর রহমান যাদু মিয়া ও শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন।
জিয়ার মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এলো এরশাদ। স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিল ৮ দল, ৭ দল, ৫ দলীয় জোটসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো। খালেদা যখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আজকের বিএনপির অন্যতম নীতি নির্ধারক ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ তখন এরশাদের উপ-প্রধান মন্ত্রী। এরশাদের পতনের পর জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা দলে দলে বিএনপিতে যোগ দেয়। এর আগে যেমন বিএনপিতে যোগ দিয়েছিল। ক্ষমতাশাসিত এসব রাজনৈতিক দলে যোগদানের ক্ষেত্রে কোন বাছ-বিচার থাকে না। দলে নেতা-কর্মী বাড়ানোটাই থাকে তাদের মূল উদ্দেশ্য।
আদর্শিক ভিত নড়বড়ে হলে যা হয় বিএনপির তা-ই হলো। দলীয় চেয়ারপার্সন কারাগারে তবুও তারা রাজপথের কর্মসূচি দিতে পারেনা। আওয়ামী লীগ সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যেমন গণপ্রশংসা রয়েছে। তেমনই কতিপয় মন্ত্রী-এমপিদের কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নিন্দাও রয়েছে। বিএনপি এগুলো নিয়েও জনগণের কাছে যেতে পারেনি। গণতন্ত্রের পূর্ব শর্তই শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা। দুইবার জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ট হতে সক্ষম হয়ে ক্ষমতায় যাওয়া দলটি আজ নিয়মতান্ত্রিক বিরোধী দল হিসেবেও নেই। সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকেও নেই। ৫ জানুয়ারী নির্বাচন বর্জন করে তারা অনির্দিষ্টকালের অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়। সে অবরোধ কর্মসূচি তারা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়নি। তাদের ডাকা অবরোধেই তারা আবার বিভিন্ন নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে!
গাজীপুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি হেরে গেল। অনেক ভোট কেন্দ্রে বিএনপির কোন এজেন্ট ছিলো না। কেন ছিলোনা? এজেন্ট হলে কি তাদের মেরে ফেলতো কেউ? হুমকি দিলেও সে ভয়ে যারা এজেন্ট হতে পারেনা তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যত কিভাবে উজ্জ্বল হবে? জনগণের সাথে না মিশে যারা বিলোপবাদী ষড়যন্ত্রের পথে এগুতে চায় তারা কিভাবে জনআস্থা পেতে পারে? ধানের শীষের ব্যাজ নিয়ে না ঘুরে নৌকার ব্যাজ নিয়ে ঘোরার নির্দেশনা দেয় যে দল; সে দল কিভাবে জয়ের মুখ দেখবে? আদালতে দণ্ডিত চেয়ারপার্সনের কারাবরণে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয় আরেক দণ্ডিত ব্যক্তি যে দলের সে দলের ভবিষ্যত কী? পলাতক আসামীর নেতৃত্বে চলবে যে দল তার ভবিষ্যত কী? মেজর মিজান কার নির্দেশে ধানের শীষের লোককে নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে ঘুরতে বলেছিল? গাজীপুর সিটি নির্বাচন কি জাতীয় নির্বাচনেও তাদের নাশকতা ও আন্ডারগ্রাউন্ড কৌশলের দিক উন্মোচন করে দিয়ে গেলোনা? জামায়াত চুপসে আছে কিন্তু তাদের নেতাকর্মীরা সব কোথায়? বিএনপির অনেক নেতাকর্মী আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছে। তবে কি তারা উপরে আওয়ামী লীগ আর ভেতরে বিএনপি। আন্ডারগ্রাউন্ড কৌশলেই কি তাদের এই যোগদান?
খোদ প্রধানমন্ত্রীও অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। কিন্তু যাদের সতর্ক করেছেন তারা কি কেউ সতর্ক হয়েছে? জাতীয় নির্বাচনে এইসব অনুপ্রবেশকারীরা কি নৌকার ব্যাজ লাগিয়ে ধানের শীষের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে পারেনা? আওয়ামী লীগের নেতারা নিজ দলীয় বিরোধী গ্রুপের বিরুদ্ধে নিজের গ্রুপকে শক্তিশালী করতে বিএনপি-জামায়াতের নেতাদের আমদানি করেছেন। এক্ষেত্রে তারা দলের দিক না ভেবে কেবলই নিজের গ্রুপের দিকই দেখেছে। আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক বিষয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা থাকার কথা দলের সাধারণ সম্পাদকের। তিনি এতদিন পর্যন্ত এইসব অনুপ্রবেশকারীদের কেবল নানা উপাধীই দিয়ে গেলেন। তাদের ব্যাপারে আদৌ কি কোন ব্যবস্থা নিয়েছেন? তিনি কি পারতেন না যারা এইসব অনুপ্রবেশকারীদের দলে ভিড়িয়েছে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিতে? অতীতে কোন সাধারণ সম্পাদক অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে এত কথা বলেননি আর ওবায়দুল কাদেরের সময়ের মতো অন্যদের সময়ে এত অনুপ্রবেশকারীও দলে ভেড়েনি।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ নিতে ওঁৎপেতে আছে একটি মহল। সে প্রতিশোধ রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে নিতে পারবে না তাই হয়তো তারা আন্ডারগ্রাউন্ড কৌশলের দিকে এগুচ্ছে। গাজীপুর সিটি নির্বাচন ও মেজর মিজান তা দৃশ্যমান করলো। এখন বিএনপি নির্বাচনে দলীয়করণ ও অনুগত লোককে নির্বাচন কমিশনার বানানোর কথা বলে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছেন। ২০০৬ সালে বিএনপিওতো অনুগত লোকদের তত্ত্বাবধায়ক উপদেষ্টা ও নির্বাচন কমিশনার বানিয়েছিল। ১৪ দলকে বাইরে রেখে তারাও তখন নির্বাচন দেয়ার চেষ্টা করেছিল। তৎকালীন দুজন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করেছিল। বিএনপি তখন দুজন উপদেষ্টার প্রতি ক্ষুব্ধ হয়। তারা বলল, শেখ হাসিনার সাথে বৈঠক করে তারা নিরপেক্ষতা হারিয়েছে তাই তারা সেদিন তাদের পদত্যাগ দাবি করেন।
তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রফেসর ইয়াজ উদ্দীন আহমদ শারীরিক অসুস্থতার জন্য মন্ত্রিপরিষদ শাসিত সরকারের রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপালনেই অক্ষম ছিলেন। অথচ বিএনপি তাকে বানালো রাষ্ট্রপতির পাশাপাশি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও তাকে দিল ডজনখানেক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। কারণ বিএনপির টার্গেট ছিল সেদিন তাকে অনুগত ও পুতুল ছায়া সরকার প্রধান বানানো। যার মাধ্যমে বিএনপি তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করবে। তারা সেদিন নির্বাচন কমিশনার বানিয়েছিল তাদের অতি অনুগত এম. এ আজিজকে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্দ্ধগতি, মন্ত্রী, এমপি ও নেতা ক্যাডারদের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়নের কারণে বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকার হতে জনগণ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল সেদিন। এই গণক্ষোভ হতে বাঁচতে ইয়াজ উদ্দীন ও এম এ আজিজকে দিয়ে ক্ষমতায় বহাল থাকার নীল নকশা করেছিল। বিএনপির কতিপয় দুর্নীতিবাজ মন্ত্রী এমপির বিচার দাবি করে বিচার না পেয়ে বিএনপির নেতৃত্বেরই একাংশ আলাদা দল গঠন করে সেদিন। বিএনপি তখন তাদের নীল নকশাকে সংবিধান রক্ষা বলে অভিহিত করতো। রাজনীতিতে ক্ষমতার স্পর্শ কেন জানি ভবিষ্যতকে ভুলিয়ে দেয়। কেবলই বর্তমান নিয়ে ব্যস্ত না থেকে তারা যদি তখন ক্ষমতাহীন হয়ে পড়া ভবিষ্যতের কথা ভাবতো তাহলে তাদের বিপদপূর্ণ ভবিষ্যত হতো না।
বিএনপি আজ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতা ও দমন পীড়নের অভিযোগ আনছে কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে তারাও কিন্তু দমনপীড়ন কম করেনি। আজ তারা আন্দোলনের পথে হাঁটতে ব্যর্থ হয়ে হয়তো বিলোপবাদের দিকেই ছুটছে। তারা অনুপ্রবেশ করছে আওয়ামী লীগে। নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে সে দলটির নেতা হিসেবে। মেজর মিজানের অডিও রেকর্ডে এই বিলোপবাদী ষড়যন্ত্রের রাজনীতির দিকটাই উন্মোচিত হলো। আওয়ামী লীগ এবিষয়টাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বললে ভুল করবে। কারণ জাতীয় নির্বাচনের আগে এসব পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ ঘটনাতেওতো রূপ নিতে পারে।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)







