৯০ দশকের শেষ দিকে আইন মন্ত্রণলয়ের ওই সময়ের সচিবের গাড়ি কাঁচপুর ব্রিজের কাছে দুর্ঘটনার শিকার হয়। দুর্ঘটনা কবলিত গাড়িটির সাথে পুলিশ নগদ ৭ লাখ টাকাও উদ্ধার করে। ঘটনাটি সংবাদপত্রে প্রকাশ হলে টাকার উৎস নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে সচিবের বিরুদ্ধে ঢাকায় ৫টি বাড়িসহ জ্ঞাত আয় বহির্ভুত প্রচুর সম্পদ অর্জনেরও অভিযোগ পাওয়া যায় বিভিন্ন সংবাদপত্রে। ক্ষমতার দাপটে তিনি সকল অভিযোগ ধামাচাপা দিতে সক্ষম হলেও সে সময়ে তার অধিনস্থ কর্মকর্তাদের টেবিলের আলোচনা থামাতে অক্ষম ছিলেন।
এ বছরের ৮ মে বহুল প্রচারিত বাংলা সংবাদপত্র “বাংলাদেশ প্রতিদিন” একটি সংবাদ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, এদেশ থেকে গত ১০ বছরে ৩৯ হাজার ১৩ কোটি ডলার পাচার হয়েছে। ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকার বরাত দিয়ে লেখা এ রিপোর্টে বাংলাদেশ প্রতিদিনের নিজস্ব অনুসন্ধানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে একজন সচিবের পরিচয় প্রকাশ করে তার বিরুদ্ধে ১৮০০ কোটি টাকার সম্পদ অর্জন ও ৮০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগের তথ্য প্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশনের হাতে রয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়।
২০১২ সালে রেলমন্ত্রী সুরন্জিত সেনগুপ্ত’র এপিএস ও রেলওয়ের দুই কর্মকর্তাদের বহনকারী গাড়িটি পিলখানায় আটক হয়। গাড়িতে পাওয়া যায় নগদ ৭০ লাখ টাকা। পরবর্তীতে প্রকাশিত হয় রেলওয়ের নিয়োগ বাণিজ্য থেকে এই টাকা সংগৃহীত হয়েছিলো। এ ঘটনায় দপ্তর হারান সুরন্জিত সেনগুপ্ত। টাকা যে মন্ত্রীকে প্রদানের জন্যই নেয়া হচ্ছিলো তা পরবর্তীতে প্রমাণ না হলেও জনগণের ধারনা কী হয়েছিলো তা নিশ্চয়ই প্রশ্নাতীত! তবে মন্ত্রীর দপ্তর কেড়ে নেওয়ার ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছিলো।
উল্লেখিত ঘটনা গুলোর মতো সংবাদ হরহামেশা প্রকাশিত না হলেও বাংলাদেশের সরকারী দফতরগুলোতে দুর্নীতি ও ঘুষের আদান প্রদান অনেকটা ওপেন সিক্রেট বলেই শোনা যায়। ঘুষ দাবীদার যেমন কোন প্রমাণ না রেখে নিজের প্রাপ্য মনে করে ঘুষ দাবি করেন তেমনি প্রদানকারীও তার কাজ সিদ্ধির স্বার্থে কোন ধরনের ঝামেলায় না জড়িয়ে ঘুষ প্রদানে বাধ্য হন। ঘুষ দাতা সাধারণতঃ কোন প্রমাণ রাখার চেষ্টাও করেন না। ঘুষের দাবি প্রমাণ করার সুযোগও থাকে না কারণ স্থানীয় পর্যায়ে এমন দাবি অফিসের লেটারহ্যাড, অথবা সাদা কাগজের চিঠি, ইমেইল এমনকি মোবাইল ফোনের টেক্সট মেসেজের মাধ্যমেও করার নজির নেই। এর ব্যতিক্রম কখনো কখনো হলেও দিনের আলোতে আসতে সচরাচর দেখা যায় না।
ঘুষের আন্তর্জাতিক লেনদেনে এক সময় ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার হলেও পরিবর্তিত বিশ্বে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থ লেনদেনে নজরদারি বাড়ানো ও আন্তঃ দেশীয় তথ্যের আদান প্রদান বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও আজকাল নগদ লেনদেনের পরিমাণ বাড়ছে। তাই অদূর ভবিষ্যতে ঘুষের দাবীর প্রমাণতো দুরের কথা, ঘুষ গ্রহণের পরও অভিযোগ প্রমাণ কঠিনতর হয়ে উঠতে পারে বলে বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞরা দাবী করছেন। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ব্যাংকিং চ্যানেলে ঘুষের লেনদেন কতটা ঝুঁকিপুর্ণ তা জিয়া পরিবারের সদস্যসহ বাংলাদেশী আরো অনেকের বিভিন্ন দেশে ধরা পড়া উদাহরণ হয়ে আছে বলেই ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনে কেউ আগ্রহী থাকাটাই অস্বাভাবিক।
সরকারী অফিসে ঘুষ আদান প্রদানের এই প্রসংগটি নতুন করে সামনে এলো যখন চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির অভিযোগ করেছেন, কর্মকর্তাদের ৫ শতাংশ হারে ঘুষ দিলে তিনি ৩০০ থেকে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা সরকারের কাছ থেকে থোক বরাদ্দ পেতেন। ঘুষ না দেওয়ায় তাকে মাত্র ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া প্রকল্প পাসের জন্য যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা তার কাছে একটি পাজেরো জিপ ঘুষ হিসেবে দাবি করেছিলেন।
গত বুধবার চট্রগ্রামের এক সভায় তিনি এমন দাবি করেছেন বলে সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে। তার বক্তব্য সারাদেশে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সরকারদলীয় একজন প্রভাবশালী মেয়রের এমন অভিযোগে সারাদেশে চাঞ্চল্যও সৃস্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, একটি বড় সিটি কর্পোরেশনের প্রভাবশালী মেয়র যার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে তার কাছে উন্নয়ন বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে ঘুষ দাবি করলে অন্যান্য সিটি করপোরশনের ক্ষেত্রে কী হতে পারে এবং এর ভাগ বাটোয়ারা কতদুর বিস্তৃত সহজেই অনুমান করা যায়।
মেয়রের অভিযোগের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা মেয়রকে দেওয়া চিঠিতে আগামী ৭ দিনের মধ্যে সকল অভিযোগের প্রমাণ চেয়েছেন। তিনি তার চিঠিতে মেয়রের সকল অভিযোগের উল্লেখ করে লিখেছেন, আপনার আনীত এ অভিযোগসমূহ গুরুতর। এতে মন্ত্রণালয় তথা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে যার প্রমাণ আবশ্যক।
মেয়র এখনো তার অভিযোগে অটল থেকে তার কাছে সকল প্রমাণ রয়েছে দাবি করে সংবাদ মাধ্যমকে শুক্রবার পুনরায় বলেছেন বেশ জোর দিয়ে। যদিও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেবেন বলে সংবাদ মাধ্যমকে জানানোর পর বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের তড়িঘড়ি চিঠি প্রদান জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
মেয়রেরে অভিযোগটি যে অত্যন্ত গুরুতর তা মন্ত্রণালয়ের চিঠিতেই উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একজন ঘুষ প্রত্যাশী যুগ্ম সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে কেন সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টা বলছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়? তারা কি নিজেদের অপকর্ম সরকারের কাঁধে দিয়ে গা বাঁচানোর চেষ্টা করছে? মেয়র কি সরকারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেছেন? একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুণ্ন হবে কেন? মেয়রের বিরুদ্ধে সংবাদ মাধ্যমে দেয়া স্থানীয় সরকার সচিবের বক্তব্যকেও অনেকেই ঔদ্ধত্বপূর্ণ ও আস্ফালন বলছেন। সংবাদ মাধ্যমে তার এমন বক্তব্যের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। এ অবস্থায় মেয়র এবং মন্ত্রণালয় দৃশ্যতঃ দুটি পক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই এই অভিযোগের তদন্ত স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় করলে তদন্তের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই।
দুর্নীতির অভিযোগ উত্থাপিত হলে এর তদন্তভার দুর্নীতি দমন কমিশনের। যদিও ঘুষ দাবি সাধারণতঃ কেউ প্রমাণ দিয়ে করেন না। তবে পারিপার্শ্বিক অন্যান্য আলামত যেমন অযাচিত হস্তক্ষেপ, প্রকল্পে বরাদ্দ অর্থ ছাড়ে অযথা কালক্ষেপণ, বাজেট বরাদ্দে বৈষম্যের প্রমাণ ইত্যাদির মাধ্যমে দুর্নীতির অভিপ্রায় ছিলো কিনা তা উদঘাটন অসম্ভব নয়। অভিযুক্ত কর্মকর্তা দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর কি না এর প্রমাণও তার ও তার পরিবারের সম্পদের পরিমাণের খোঁজ নিলেই বেরিয়ে আসবে। এটি দুর্নীতি দমন কমিশনের রুটিন কাজের মধ্যেই পড়ে এবং তারা অনতিবিলম্বে এর তদন্ত শুরু করবেন বলে জনগণ প্রত্যাশা করে। 
মেয়রের অভিযোগ যে অসত্য দেশের ১ ভাগ মানুষও বিশ্বাস করেন বলে মনে হয় না। অভিযোগ সত্য হলে একজন যুগ্ম সচিবের দায়ই বা কেনো স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় নেবে? অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে স্বপদে বহাল রেখে তদন্ত বাধাগ্রস্থ হওয়ার সুযোগও রয়েছে। যার বিরুদ্ধে অভিযোগ তাকে অন্যত্র বদলি বা ওএসডি করে তদন্ত শুরু করা বাঞ্চনীয় ন্যায়বিচারের স্বার্থে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে এর সুষ্ঠু সুরাহা, সঠিক তদন্ত ও বিচারের প্রত্যাশা রয়েছে জনগণের।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল
আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








