এসব মগ্নতার ভেতর ঢোকা যায়না। অদ্ভুত ব্যাপার। কার্টিজ পেপারের খাতায় পেন্সিল টানছেন তিনি। একটি মেয়ের হাতের ঠোঙ্গা থেকে বাদাম নিচ্ছেন এক হাত দিয়ে। ভাঙছেন। মুখে পুরছেন। নীচে রাখা মোবাইলের স্ক্রিনে চোখ রাখছেন। সেখানে এক লোকের মুখ। হাসিখুশি চশমা পরা মুখাবয়ব। ভাবলাম, ইনি আর পাঁচজন প্রতিকৃত আঁকিয়ের মতো নন। নিজেই নিজের অনুশীলন করছেন। কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি কি প্রতিকৃতি আঁকার কাজ করেন?’ আমার প্রশ্নটা খুব বেশি মোলায়েম, বিনীত ও পরিশীলিত হলো না। তিনি বললেন, “হ্যাঁ করি। আমি যেভাবে আঁকি, সেটি আপনি দেখতে পারেন। আমি শুধু চোখের ছবি আঁকলেই লোকটাকে আপনি চিনতে পারবেন?”
শিল্পীরা দুর্দান্ত আত্মবিশ্বাসী হন। কিন্তু নিজের কাজকে বিজ্ঞাপিত করতে পছন্দ করেন না। প্রতিকৃতি আঁকিয়ে বললেন। আমি কাপড়ের মুখোশ ঢাকা মুখে তার সঙ্গে কথা বলছি। তার কথা শুনে অবাক হচ্ছি। আমার চোখে নিশ্চয় সে অবাক স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আঁকিয়ে বুঝতে পারছেন। বললাম, ছবি পাঠিয়ে দিলে এঁকে দেন নাকি সামনে বসে থাকতে হয়? বললেন, “দুইভাবেই করি। ছবি পাঠালে পাঁচ’শ টাকা। সামনাসামনি বসলে একটু বেশি। পাঁচ ‘শ টাকাতেও করা যাবে। এখনই করে দিব?”
: কত সময় লাগবে?
: কম ফিনিশিং নিলে ২০ মিনিট। ডিটেইল ফিনিশিং নিলে আধাঘন্টা।
: এত অল্প সময়ে সম্ভব?
: কি বলেন? পাঁচ মিনিটেই সম্ভব?
: আমি চাই প্রতৃত শিল্পসম্মত প্রোট্রেইট?
: এটা আপেক্ষিক ব্যাপার। আমি চারুকলার স্টুডেন্ট। আমি সবটাই বুঝি।
বললাম, আজ একটু তাড়া আছে। পরে আসবো।
চারুকলার মাস্টার্সের ছেলেটি স্বাধীনতা স্তম্ভের নীচে যে সরোবর তার বেদীতে বসা। এই বেদীতে অসংখ্য মানুষ বসেন। ছেলেটির সঙ্গে বান্ধবী। ছেলেটি বিশেষ কোনো জায়গায় বাণিজ্যিক আসন গাঁড়েননি। বোঝা যায় এখনও জড়তামুক্ত হতো পারেননি অথবা এই বাণিজ্যিক প্রচলিত রকমটা চার কাছে ভালো লাগে না।
সোহরাওয়ার্দির টিএসসি সোজা ফটক দিয়ে গিয়ে বইমেলার যে প্রবেশ মুখ পাওয়া যায়, সেখানে বেশ কয়েকজন প্রতিকৃতি আঁকিয়ে বসেন। কারো কারো সামনে পেশ ভীড় থাকে। আঁকিয়েরা নিবিষ্ট মনে এঁকে যান সামনে বসা মানুষের মুখটি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তরুণীরা গ্রাহক হয়ে বসেন। ছবি আঁকা দেখতেও ভীড় করে বহু মানুষ।
তর্ক জুড়লে মূলধারা, প্রকৃত শিল্প, শিল্পের মহত্ব থেকে শুরু করে বহু কথা আসতে পারে। কিন্তু আমার বিবেচনায় এই শিল্পটি অনেক দামী। আমি যে শিল্পীর সঙ্গে কথা বলেছি, তার পেন্সিলের টানে চশমাসহ যে চোখ ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই অসাধারণ। মূল ছবির তুলনায় তার শিল্পমাণ অনেক বেশি।
বইমেলার বিভিন্ন অংশে এমন আঁকিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তারা বইমেলার আয়োজনের হিসেবের মধ্যেকার মানুষ নয়। তারা প্রতিদিন এখান থেকে উঠে যাওয়ার আস্ফালন শোনেন। তারপরও বসে কাজটি করেন। অর্থ উপার্জনের তাগিদে। যাকে বলে পেটের তাগিদে।
অনেক গম্ভীর সুউচ্চ শিল্পী আছেন ভালো প্রতিকৃতি আঁকতে পারেন না। প্রতিকৃতি আঁকার কাজটি তাদের কাছে মূল্যবান কিছু নয়। ঈর্ষায়, অবজ্ঞায় তাদের গৌণ করা যেতে পারে কিন্তু শিল্পশক্তির প্রশ্নে খাটে করা যাবে কীভাবে? আঠারো কোটি মানুষের কয়জন পারেন কাগজের বুকে পেন্সিল টেনে কয়েক মিনিটে একটি মুখ ফুটিয়ে তুলতে?
হতাশ হলাম এই লেখাটি যখন শেষ করছি, তখন বইমেলার দ্বিতীয় শুক্রবার। সবচেয়ে ভীড়ের দিন। বেশ কয়েকটি জায়গায় প্রতিকৃতি আঁকিয়েদের বসতে দেয়া হয়নি।
(চলবে)







