একজন উর্দুভাষী হয়েও বাংলা ভাষাকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলন করেছেন রাজপথে। বাংলা ভাষার সমর্থনে উর্দুতে ব্যানার পোস্টার লিখে ঢাকায় বসবাসরত উর্দুভাষীদেরকে বুঝিয়েছেন বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য, তাদের সমর্থন কুড়ানোর চেষ্টা করেছেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রক্তচক্ষুকে উপক্ষো করে গলা ফাটিয়ে বলেছেন, ‘হামার জবান, বাংলা জবান’।
বাংলাদেশকে নিজের প্রেমিকা হিসেবে গ্রহণ করা নিভৃতচারী জয়নুল আবেদীন নৈ:শব্দে না ফেরার দেশে চলে গেছেন গত ৯ মার্চ, ২০১৭ । তাকে স্মরণ করতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআইরইউ শনিবার, ১৮ মার্চ এক শোক সভার আয়োজন করে।
ডিআইরইউ সাগর-রুনী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই শোকসভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বাদশা। সাধারণ সম্পাদক মুরসালিন নোমানীর সঞ্চালনায় সভায় জয়নুল আবেদীনকে স্মরণ করে বক্তব্য রাখেন কবি, সাংবাদিক ও গীতিকার কে জি মুস্তাফাসহ প্রমুখ।
’স্মৃতি যেন অতীতের ফেলে রাখা আয়না
মন থেকে কিছুতেই মুছে ফেলা যায় না’-
আবেগ মাখানো নিজের লেখা এই দুটি গানের কলি দিয়েই জয়নূল আবেদীন স্মরণে কথা বলা আরম্ভ করলেন এদেশের একজন খ্যাতিমান কবি, সাংবাদিক ও জনপ্রিয় গীতিকার কেজি মোস্তাফা।
বলছিলেন, ‘তার সাথে আমার বহু স্মৃতি জড়িত।ষাট দশকে যখন আমি চলচ্চিত্রে গান লেখার কাজ শুরু করি সেই থেকে তার সঙ্গে আমার সম্পর্ক। আজ যখন প্রেস ক্লাবে খালি পড়ে থাকা চেয়ারটির দিকে তাকাই অনেক কষ্ট হয়, ব্যথা জাগে মনে। পুরানো স্মৃতিগুলো কিলবিল করছে মাথায়। বুকের ভেতর বেদনার পাহাড় জমাবদ্ধ হচ্ছে বাবার’!
জয়নুল আবেদীন ছিলেন একাধারে একজন কবি, সাংবাদিক, চলচ্চিত্র গল্পকার। তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির আজীবন সদস্য, বাসসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সদস্য, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সদস্য। সবকিছুকে ছাপিয়ে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ছিলেন অবাঙালি ভাষা সংগ্রামী। জন্মসূত্রে তিনি উর্দুভাষী হয়েও ছিলেন বাংলাদেশি। পাসপোর্টে তার স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে লেখা ছিল জাতীয় প্রেসক্লাবের ঠিকানা, ১৮/ তোপখানা।
বাস্তবতা মেনে চললে তার ঠিকানা হওয়ার কথা ছিল পাকিস্তানে, নিজের পরিবার পরিজনদের সাথে। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রেমে, বাংলাদেশের রূপে তিনি এতটাই মজে ছিলেন যে, আপন শিকড় বাদ দিয়ে পুরো জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশে।
উপস্থিত সাংবাদিকদের বক্তব্যে উঠে আসে উর্দুভাষী বাংলা ভাষার জন্য নিজের জীবন-যৌবনকে উৎসবর্গ করা জয়নুল আবেদীন সম্পর্কে অনেক অজানা কথা।
বক্তারা বলছেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে বা ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময় শাসকগোষ্ঠীর সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেননি জয়নুল আবেদীন। বরং ১৯৫২ সালে যেমন তারা বাংলা ভাষার জন্য গলা ফাটিয়েছেন, রাজপথ কাঁপিয়েছেন তেমনি, ১৯৭১ সালে নির্যাতিত বাঙালিদের পাশে দাঁড়িয়ে শাসকগোষ্ঠীর বিরাগভাজন হয়েছেন।
কিন্তু যে মানুষটা উর্দুভাষী হয়েও বাংলা ভাষাকে, ভিনদেশি হয়েও বাংলাদেশকে ভালবেসে, পরিবার পরিজন ছেড়ে এ দেশেই সারাটা জীবন উৎসর্গ করলেন, জীবদ্দশায় গুটি কয়েক লোক বাদে তার খোঁজ কেউ নেয়নি। সারা জীবন লাঞ্ছনা তাকে পিছু ছাড়েনি, কিন্তু থেমে যাননি, ময়লা-আবর্জনার ওপর দিয়ে তিনি চলেছেন, কিন্তু নিজের শরীরে ময়লা লাগতে দেননি, তিনি অসহায় ছিলেন, কিস্তু কখনো পরাজিত হননি।
অকৃতদার এই মানুষটির একমাত্র আশ্রয় বলতে ছিল জাতীয় প্রেসক্লাব। তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির স্থায়ী সদস্য ছিলেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবেই থাকতেন।ভাষা আন্দোলনে অবদান স্বরূপ একমাত্র প্রেসক্লাবই তাকে ২০১৪ সালে সম্মান জানিয়েছিল। প্রাপ্তি বলতে ওইটুকুই। এই অপ্রাপ্তী নিয়েই তিনি মারা গেছেন। ফিরে যাননি পাকিস্তানে। বাংলাদেশের মাটিতেই হয়েছে তার আবাস।
শোকসভায় সাংবাদিক নেতারা অত্যন্ত আক্ষেপ করে বলেন, একজন অবাঙালি হয়েও রাষ্ট্রভাষার জন্য আন্দোলন করার অবদান স্মরূপ, একজন সাংবাদিক হিসেবে, একজন চলচ্চিত্রের গল্পকার কিংবা একজন বিশিষ্ট কবি হিসেবেও তাঁকে কোন রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রদান করা যেতো। কিন্তু আমরা বড় হতভাগা, আমরা জয়নুল ভাইকে কিছুই দিতে পারিনি ।
সাংবাদিক নেতাদের অভিযোগ, এমন একজন ভাষা সংগ্রামীর দিকে ফিরেও তাকায়নি রাষ্ট্র। তার চিকিৎসার সময় খবর নেয়া হয়নি।অথচ স্বাধীনতার পর তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিুর রহমান স্বয়ং নিজে পাসপোর্ট প্রদান করেছিলেন। সেদিন থেকে তিনি বাংলাদেশের নাগরিক। তিনি ভাষার জন্য জেল খেটেছেন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে এই দেশে থেকে গিয়েছেন তিনি। অথচ তাকে একটিবার দেখতে যাননি তথ্যমন্ত্রী। এমনকি মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় শোকবার্তা পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি।
তারা আরো আক্ষেপের সুরে বলছেন, তার চিকিৎসা খরচ তো বহন করা হয়নি। বরং হাসাপাতাল কর্তৃপক্ষ তার লাশ পর্যন্ত বের করতে দিচ্ছিল না। ২৮ হাজার টাকা পাওনা আছে অজুহাত তুলে তারা লাশ বের করতে নিষেধ করে। পরে হাসাপাতালে বন্ড দিয়ে লাশ বের করতে হয় বলে জানা্ন সাংবাদিক নেতারা।
সাংবাদিক নেতারা বলছেন, তার কোন রাজনৈতিক পরিচয় ছিলো না। তার পরিচয় তিনটি ক্ষেত্রে ঘিরে, জার্নালিজম, লিটারেচার এবং ফিল্ম। তিনি ভারত, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ- এই তিনটি দেশের নাগরিক ছিলেন। কিন্তু এই বাংলাদেশকেই নিজের আশ্রয় হিসেবে বেঁছে নিয়েছিলেন তিনি।
সাংবাদিক নেতারা কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন- যথা, জয়নুল আবেদীন উর্দুতে সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চা করেছেন। তার সেই সব লেখাগুলো সংগ্রহ করে আগামী বছর তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে একটি বই প্রকাশ করা হোক। সেই সাথে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি জয়নুল কর্নার চালু করার দাবি জানা্নো হয়, যেখানে প্রেস ক্লাবের যে চেয়ারটিতে তিনি বসতেন সেটি সংরক্ষণ করা যায়, তার লেখাগুলো এবং তাকে প্রেস ক্লাব থেকে যে সম্মাননা ক্রেস্ট প্রদান করা হয়েছিল তা সংরক্ষণ করে রাখা যায়।
সভাপতির বক্তব্যে সাখাওয়াত হোসেন বাদশা বলেন, আমরা কোন রাজনৈতিক বিবেচনায় কিছু বলতে চাই না। জয়নুল আবেদীন একজন সাংবাদিক ছিলেন, তিনি ছিলেন ভাষা সংগ্রামী। তিনি এদেশকে ভালোবেসে আর পাকিস্তানে যাননি। তাই রাষ্ট্র কি করছে না করছে তার দিকে আমরা না তাকিয়ে রিপোর্টার্স ইউনিটি তাঁকে সম্মান জানাচ্ছে। তবে লজ্জা লাগে যখন তাঁর নামের সাথে ভাষা সংগ্রামী লেখা থাকার পরও রাষ্ট্র তাকে সম্মান জানায় না। এটি আমাদের রাষ্ট্রের ব্যর্থতা, সাংবাদিক হিসেবে আমাদের ব্যর্থতা এবং এদেশের মানুষের ব্যর্থতা।
“জয়নুল ভাই যে কত বড় মাপের মানুষ ছিলেন তা বুঝতে পারিনি। তার বিশালত্ব আমরা ধরতে পারিনি। সরকার চাইলে সাংবাদিকদের কল্যাণ তহবিল থেকে জয়নুল ভাইকে সহযোগিতা করতে পারতো, কিন্তু করেনি। আর কিছুর জন্য না হোক, একজন সাংবাদিক হিসেবে হলেও তিনি সেই অধিকার পেতে পারতেন। জয়নুল আবেদীন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সদস্য হিসেবে তাঁকে আমরা সম্মান দিব।”
তিনি বলেন, এই বছর থেকে আমরা জয়নুল ভাইয়ের জন্য পদক চালু করবো। সেরা সাংস্কৃতিক রিপোর্টার সম্মাননা আমরা তাঁকে দিয়ে শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
জয়নুল আবেদিন ১৯৩৭ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের উত্তর প্রদেশের এলাহাবাদে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মুহাম্মদ গোলাম মোস্তফা ও মা জয়তুন বেগমের চার পুত্র কন্যার মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার বাবা একজন ধর্মীয় পন্ডিত ছিলেন।বাবা তার নাম রেখেছিলেন জয়নুল আবেদিন। বাবা ইস্ট ইন্ডিয়ান রেলওয়ের হেড ড্রাফটস ম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন বিধায় তার শৈশব কেটেছে বিহারে। ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর তার বাবা পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়েতে যোগ দেওয়ায় কর্মস্থল হয় সৈয়দপুরে।
মেট্রিকুলেশন পড়ার সময়ই মাকে হারান জয়নুল। বাবা অধিকাংশ সময় কাজে থাকায় ছোট ভাইদের দায়িত্ব নিতে হয় নিজ কাঁধে। পরে ঢাকায় এসে ঢাকা কলেজ থেকে আইকম ও জগন্নাথ থেকে বি কম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উর্দু সাহিত্যে এমএ পাস করেন। এরপর ১৯৫৭ সালে উর্দু দৈনিক ‘জং’ পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে সাংবাদিক জীবনের সূত্রপাত ঘটে তার। পরে বাংলাদেশের বেশ কিছু জনপ্রিয় দৈনিকে বিভিন্ন গুরুপূর্ণ পদে কাজ করেছেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ‘জং’ এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।
তার সম্পর্কে ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ‘মধ্যরাতের অশ্বারোহী’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘তিনি অবাঙ্গালী হয়েও বাংলাভাষার জন্য আন্দোলন করেছেন। পরিবারের সবাই পাকিস্তানে চলে গেলেও তিনি বাংলায় থেকে গেছেন বাংলার টানে। ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় এ কর্মী উর্দুতে দেয়াল লিখন ও বিভিন্ন উদ্দীপনামূলক উক্তি ও শ্লোগান লিখে ঢাকায় বসবাসরত উর্দুভাষীদের বাংলা ভাষার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অবগত করেছিলেন এবং বাংলার পক্ষে জনমত গঠন করেছিলেন।’ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন। পাকিস্তান সরকার তা টের পেয়ে তার বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট জারি করে।
বাংলাদেশের অকৃত্রিম এই বন্ধু গত বছর ডিসেম্বরে হঠাৎ করেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা বাড়লে চলতি বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে লিভারে সমস্যা ধরা পড়লে ফেব্রুয়ারি ২০ তারিখে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাসপাতালে লিভার ইউনিটে ভর্তি করা হয়। যে তারিখে বাংলা ভাষাকে মায়ের ভাষা করার দাবিতে তিনি রাস্তায় নেমেছিলেন, ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস- সেই ২১ তারিখেই তিনি চিরতরে কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। বেশ কয়েকদিন এ অবস্থায় থেকে গত ৯মার্চ সহকর্মীদের কাছে ‘জনুভাই’ নামে পরিচিত জয়নুল আবেদিন না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। ১০মার্চ মিরপুরে বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।
জয়নুল আবেদীন বারবারই বলেছেন, ‘যে দেশের মানুষ ভাষার জন্য জীবন দেয় সে দেশের মানুষের সাথে আছি, চলতে পারছি এটাইতো অনেক। এটা তো ভাগ্যের ব্যাপার’।
জয়নুল আবেদীনের ছোট ভাই সিরাজ উদ্দীন বড় ভাইয়ের অসুস্থতার খবর পেয়ে পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন। তার ইচ্ছা ছিলো ভাইকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু মৃত্যুর আগ মুহুর্তেও জয়নুল আবেদীন হাতের ইশরায় বলে গেছেন, ‘কোথাও তিনি যাবেন না। বাংলাদেশের মাটিতেই তিনি মরতে চান’।







