বিশ্বকাপ ফুটবলের উন্মাদনার মধ্যেই ভারতের ঝাড়খণ্ডের একটি প্রত্যন্ত আদিবাসী গ্রামে আয়োজন করা হয়েছে ব্যতিক্রমী এক ফুটবল টুর্নামেন্ট। যেখানে ট্রফির বদলে বিজয়ী দলগুলোর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে খাসি ছাগল। স্থানীয় আদিবাসী সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে এই অভিনব আয়োজন ইতোমধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।
ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় ঝাড়খণ্ড রাজ্যের চাইবাসা জেলার তিরিলবাসা গ্রামে ১৪ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় ‘রঙ্গিলা স্টার তিরিলবাসা’ ফুটবল টুর্নামেন্ট। এতে আশপাশের ৬৪টি গ্রামের দল অংশ নেয়।
টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল পুরস্কার হিসেবে নগদ অর্থের পাশাপাশি খাসি ছাগল প্রদান। স্থানীয় ভাষায় অল্প বয়সে খোজা করা পুরুষ ছাগলকে ‘খাসি’ বলা হয়।
ফাইনালে এনসিএস মাউদি ১-০ গোলে কুমবারামকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয়। চ্যাম্পিয়ন দল পায় ১৫ হাজার রুপি এবং তিনটি খাসি। রানার্সআপ কুমবারাম পায় ১২ হাজার রুপি ও দুটি খাসি। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থান অর্জনকারী কোবরা এফসি নিমধি এবং গালুবাসা এফসি যথাক্রমে ৯ হাজার রুপি ও একটি করে খাসি পায়। তবে ম্যাচসেরা, টুর্নামেন্টসেরা এবং সেরা গোলরক্ষক নগদ পুরস্কার পেলেও তাদের জন্য খাসি রাখা হয়নি।
চ্যাম্পিয়ন দলের অধিনায়ক শচীন দেবাম বলেন, ‘এটাই আমাদের প্রথম শিরোপা। পুরো গ্রামের মানুষকে নিয়ে আমরা উদযাপন করব। খাসি দিয়ে বড় ভোজ হবে।’
এটি ছিল টুর্নামেন্টটির পঞ্চম আসর। আয়োজকদের ভাষ্য, ফিফার নিয়ম অনুসরণ করে ম্যাচ পরিচালনা করা হলেও পুরস্কার এবং আয়োজনের ধরন সম্পূর্ণভাবে হো আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাজানো হয়েছে।
হো সম্প্রদায়ের কাছে খাসি শুধু একটি গৃহপালিত প্রাণী নয়, বরং ধর্মীয় আচার, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সামাজিক উৎসবে খাসি জবাই করে তার মাংস পুরো সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাগ করে খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।
টুর্নামেন্টের আয়োজক ও খেলোয়াড় মনীশ কুদাদা বলেন, ‘খাসি আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই পুরস্কার হিসেবেও এটি রাখা হয়েছে। বেশিরভাগ দল খাসি জবাই করে উৎসব করে, আবার কেউ কেউ ট্রফির স্মৃতি হিসেবে লালন-পালনও করে।’
আরেক আয়োজক ও গোলরক্ষক রাজ কেশরি বলেন, ‘আমাদের এখানে খাসি ছাড়া কোনো উৎসবই পূর্ণতা পায় না। তাই নগদ অর্থের পাশাপাশি খাসি দিলে খেলোয়াড়রা পুরো গ্রামের সঙ্গে বিজয় উদযাপন করতে পারে।’
টুর্নামেন্টে ফিফার অনেক নিয়ম মানা হলেও কিছু স্থানীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রতিটি দলে ১১ জনের পরিবর্তে ৯ জন খেলোয়াড় থাকে এবং অন্তত ছয়জনকে একই গ্রামের বাসিন্দা হতে হয়। অফসাইড নিয়ম নেই এবং মাঠের যেকোনো স্থান থেকে গোল করা যায়।
খেলোয়াড়দের মতে, এই নিয়ম ছোট গ্রামের ফুটবলারদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করেছে। কারণ উন্মুক্ত টুর্নামেন্টে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
টুর্নামেন্ট চলাকালে ফুটবল মাঠে ভিড় করেন শত শত দর্শক। কেউ মাঠের পাশে বসে, কেউ গাছে উঠে খেলা উপভোগ করেন।
মাঠের আশপাশে স্থানীয় খাবারের দোকান বসে। বিক্রি হয় ভাজা খাবার, আলুর চপ, হলুদ মটর এবং স্থানীয় পানীয়। সন্ধ্যায় ম্যাচ শেষে আয়োজন করা হয় মোরগ ধরার খেলাও, যেখানে দর্শকরা বাজি ধরতে পারেন।
একসময় মাওবাদী সংঘাতের কারণে চাইবাসা ছিল ভারতের অন্যতম স্পর্শকাতর এলাকা। দীর্ঘ সময় নিরাপত্তা সংকটের কারণে জেলা কার্যত মূলধারার বাইরে ছিল।
তবে পরিস্থিতির উন্নতির পর এখন সেখানে খেলাধুলা, শিক্ষা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছে। স্থানীয় ফুটবল টুর্নামেন্টগুলো থেকে উঠে আসছেন নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়। নারী ফুটবলার মালতি মুন্ডাও এমন টুর্নামেন্টে খেলে পরিচিতি পান এবং পরে কলকাতার লিগে খেলেন।
তিনি বলেন, ‘স্থানীয় টুর্নামেন্টগুলো আমাকে অভিজ্ঞতা দিয়েছে। এখানে নগদ অর্থের পাশাপাশি খাসিও জিতেছি।’
স্থানীয় ফুটবল ম্যাচের ভিডিও ধারণ করে ইউটিউবে প্রচার করে সফল হয়েছেন হরিশ হেমব্রম। তার ইউটিউব চ্যানেলের অনুসারী এখন দুই লাখ ১১ হাজারের বেশি। স্থানীয় টুর্নামেন্ট সম্প্রচার করেই তিনি মাসে প্রায় ২০ হাজার রুপি আয় করেন।
ভারতের ফুটবল গবেষক ও লেখক সন্দীপ মেননের মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারত খুব বেশি সফল না হলেও দেশটির গ্রামাঞ্চলে ফুটবলের প্রতি মানুষের ভালোবাসা অসাধারণ।
তার ভাষায়, ‘প্রতিটি অঞ্চলের মানুষ নিজেদের পরিবেশ ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিলিয়ে ফুটবল খেলাকে নতুন রূপ দিয়েছে। তিরিলবাসার মতো গ্রামীণ টুর্নামেন্ট তরুণ খেলোয়াড়দের পরিচিতি পাওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করে। অনেকের কাছে নিজের গ্রামের হয়ে খেলাই সবচেয়ে বড় গর্ব।’






