ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে জন্ম নেয়া এক ফুটবলারের জীবনের গল্পটা যেন সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সেই খেলোয়াড়টির নেশা ছিল কেবল ফুটবল আর ফুটবল। ক্যারিয়ারের প্রথম ক্লাব ছিল ব্রন্ডবি। সেখানে বিশ্বকাপে খেলা মিডফিল্ডার থমাস ডেলানে, ডিফেন্ডার ড্যানিয়েল ওয়াস ও বর্তমানে এফসি কোপেনহেগেনের কোচ জ্যাকব নেস্ট্রপের সঙ্গে খেলেছেন।
তিনি আর কেউ নন, বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়া। ক্যারিয়ারে নানা চড়াই-উতরাই পেরোনো মিডফিল্ডার একসময় হয়েছিলেন মৃত্যুর মুখোমুখি। জীবনে ঘটে যাওয়া এক দুর্ঘটনা তার কর্মজীবনের গতিপথ পরিবর্তন করে দেয়। দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে বিক্ষত শরীর নিয়ে দীর্ঘসময় হাসপাতালের বিছানায় কাটিয়েছিলেন।
ফুটবল বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের দ্বিতীয় রাউন্ডে ‘আই’ গ্রুপের ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগে ফিফাকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন জামাল। ব্যক্তিজীবন, ক্যারিয়ার ও বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে প্রত্যাশার কথা খোলামেলাভাবেই বলেছেন।
‘আমার গল্প অন্য খেলোয়াড়দের গল্প থেকে আলাদা বলেই আমি মনে করি। আমার জীবনে একটি দুর্ঘটনা ঘটেছিল। আমাকে চারবার গুলি করা হয়। যখন ৩-৪ মাস হাসপাতালের একই বিছানায় ছিলাম, তখন সুস্থ হয়ে ফুটবলার হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় বিভোর ছিলাম।’
‘হাসপাতাল থেকে যখন ফিরে আসি, আমার একজন নতুন কোচ ছিলেন। তিনি আমাকে ফুটবলের পরিবর্তে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে বলেছিলেন। আমি দলের সেরা একজন খেলোয়াড় ছিলাম। ভেবেছিলাম তাদের চেয়ে উপরের মানের হলে কেন ফুটবলে ফিরতে পারবো না?’
এফসি কোপেনহেগেন ক্লাবের হয়ে না খেলে জামাল ফুটবল থেকে কিছু সময় দূরে কাটিয়েছেন। বিশ্বভ্রমণে গিয়ে মানসিকভাবে চাঙ্গা থেকেছেন। ২০ বছর বয়সে বাহুতে স্ক্রু বসানোর জন্য তাকে বড় অস্ত্রোপচারের মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
ফুটবলে ক্যারিয়ার গড়ার প্রতি জামালের জেদ এতটাই ছিল যে, পায়ের নার্ভ বের করে তার বাহুতে স্থাপন করার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
সেই ঘটনার স্মৃতিচারণ করে ৩৩ বর্ষী জামাল বলেছেন, ‘আমি প্রশ্ন করেছিলাম, পা থেকে নার্ভ নিলে কী হবে? তারা বলেছিল, আমার পা ঠিকভাবে কাজ করবে না। আমি আমার ডান হাতের দুই বা তিনটি আঙুল দিয়ে কাজ করতে পারি। এটা আমার জন্য কোনো সমস্যা নয়। আমি পা থেকে নার্ভ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আমি মনে করি এটা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল।’
ডেনমার্কের লোয়ার ডিভিশন দিয়ে ফুটবলে ফিরে আসার পর জামাল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) থেকে একটি কল পেয়েছিলেন। তাকে বাংলাদেশের হয়ে খেলার প্রস্তাব দেয়া হয়। সুযোগটা কাজে লাগানোর পর তার ভাগ্য বদলে যায়। বর্তমানে লাল-সবুজের দলের অধিনায়ক তিনি। ১০ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে টাইগারদের হয়ে ৭৯ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন।
‘যখন খুব ছোট ছিলাম, তখন বাংলাদেশে বেড়াতে যেতাম। আমার বাবা-মা বাংলাদেশ নিয়ে গল্প বলতেন। তাদের কারণে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। বাংলাদেশের হয়ে খেলার সিদ্ধান্ত নেয়ার এটি একটি প্রধান কারণ বলে মনে করি।’
‘কেবল ডেনমার্কে খেলতে পারতাম। আমার পরিবারের অবস্থা খুবই ভালো ছিল। আমাদের একেবারেই অর্থের অভাব ছিল না। তবে বাংলাদেশের হয়ে খেলাটাকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভেবেছিলাম। এদেশে ১৮০ মিলিয়ন মানুষ আছে। যদি আমি অবস্থার পরিবর্তন করতে পারি, তাহলে আমার জন্য এবং বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য ভালো হবে।’
‘জাতীয় দলে প্রথম যখন খেলতে এলাম, তখন ফুটবলের অবস্থা একেবারেই তলানিতে ছিল। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কয়েক বছর লেগেছিল। ফুটবলারদের জন্য সুবিধাগুলোর অস্তিত্ব ছিল না। শুরুতে কেমন অবস্থা ছিল তা কল্পনাও করতে পারবেন না।’
‘কিন্তু এখন আমরা ধীরে ধীরে যথাযথ সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছি। খেলোয়াড়দের যত্ন নেয়া হয়। আমরা কখনোই আগে ভিডিও সেশন বা পর্যাপ্ত মিটিংয়ের মতো কিছু করিনি। সেই অবস্থা থেকে আমরা অনেক এগিয়েছি।’
মাঠের বাইরের অগ্রগতিকে বাস্তব অগ্রগতিতে পরিণত করাই এখন বাংলাদেশের পরবর্তী করণীয়। ফুটবল বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের প্রথম রাউন্ডে মালদ্বীপকে দুই লেগ মিলিয়ে পরাজিত করে দ্বিতীয় রাউন্ডে জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। ‘আই’ গ্রুপে বেঙ্গল টাইগারদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, লেবানন ও ফিলিস্তিন।
বাংলাদেশ ফুটবল দলটাকে এখন অনেকটা অধিনায়ক জামালের মতোই বলা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দলটি প্রতিকূলতাকে চ্যালেঞ্জ করার অভ্যাস তৈরি করেছে। মালদ্বীপ র্যাঙ্কিংয়ে ৩৪ ধাপ এগিয়ে থাকার পরও তাদের বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করেছে। পরে হোম ম্যাচ ২-১ গোলে জিতে পরের রাউন্ডের টিকিট কেটেছে। জামাল অবশ্য এখানেই থামতে নারাজ। সামনে আরও বড় সফলতার অপেক্ষায় আছেন টাইগার অধিনায়ক।
‘যদি বলি, অস্ট্রেলিয়ার পেছনে থেকে আমরা পয়েন্ট টেবিলের দ্বিতীয় স্থানে থাকার লক্ষ্য স্থির করেছি, লোকেরা বলবে আমি পাগল। আমরা যে দলের বিপক্ষে খেলছি, তারা আমাদের থেকে র্যাঙ্কিংয়ে অনেকবেশি এগিয়ে আছে। কিন্তু ফুটবলে আপনাকে নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে হবে। নিজের উপর আস্থা রাখতে হবে।’








