সাগরের আব্বা, আম্মা এবং সে নিজেই যে বিখ্যাত তা আমরা, মানে বন্ধুরা জানতাম না। পূর্বদেশ পত্রিকার ছোটদের সাহিত্যের পৃষ্ঠা চাঁদের হাটে যারা নিয়মিত লিখতো, তাদের প্রায় সবাইকে আমরা চিনতাম। লিখতো সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাহিত্য রচনায় উৎসাহীরা। আমরা জানতাম, কোন নামের মানুষ কোন জেলার, কোথায় থাকে।
অদ্ভুত একটা সময় ছিল। সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বরিশাল, যশোর; দেশের সবখান থেকে চাঁদের হাটের ঠিকানায় ছড়া, কবিতা, গল্প ইত্যাদি ডাকে পৌঁছে যেতো। পত্রিকার পাতার দায়িত্বে থাকা রফিকুল হক ছিলেন আমাদের গুরু। সবাই তাঁকে ডাকতাম দাদুভাই বলে। দাদুভাই আমাদেরকে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন বড়সড় একটা কর্মীবাহিনী।
বাহিনীর কাজ ছিল ছাপানোর জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খামগুলো খুলে কবিতা, ছড়া, গল্প আলাদা করা। আদেশ করলেই আমরা ঢাকার নানাদিক এসে জড়ো হয়ে যেতাম পূর্বদেশের চাঁদের হাটের কামরায়। তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে সকলে বাছাইয়ের কাজ করতাম খুবই উৎসাহ, মনোযোগ দিয়ে।
এই কাজের মধ্য দিয়ে চাঁদের হাট নামটার সঙ্গে আমাদের আবেগ, ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। আমরা অনুভব করতে শুরু করি, অবজারভার ভবনটা আমাদের, দাদুভাই, চাঁদের হাটও আমাদের। এই আপন আপন অনুভবের কারণে যে কয়জন আমরা প্রায়ই একত্রিত হতাম, সবাই একটা পরিবারের মতো হয়ে যাই।
এই ঘনিষ্ঠতা তৈরি হওয়াতে সেই যৌবনকালে আমাদের ভাবনার জগৎ, আড্ডার ধরণ পাল্টে যায়। কে কোন বই পড়লাম, কে নতুন কি লিখেছি, এই সব নিয়ে কথা বলে সময় কাটাতাম। প্রথম দিকে ফরিদুর রেজা সাগর বা ইমদাদুল হক মিলন এরা দুজন আমাদের সাথে ছিল না। চাঁদের হাটকে কেন্দ্র করে যে বন্ধুদল তৈরি হয়, তারা দুজন সে দলের অংশ হয়ে ওঠে কিছুদিন পরে।
লেখালেখির তাড়না আমাদের এক করে দিয়েছিল। সাগর আগে থেকে কচিকাঁচার মেলায় লিখতো। কচিকাঁচার মেলা তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতার নাম। সে পাতার দায়িত্বে ছিলেন বিখ্যাত রোকনুজ্জামান খান। বৃহৎ অনুসারী দল ছিল তাঁর। অনুসারীদের কাছে তিনি ছিলেন অতি প্রিয় দাদাভাই।
দাদাভাইয়ের প্রিয় ছিল সাগর। কচিকাঁচার মেলায় নিয়মিত তাঁর লেখা ছাপা হতো। ছাপা হতো চাঁদের হাটের পাতাতেও। ইত্তেফাকের বিখ্যাত রেখাচিত্র শিল্পী কচিকাঁচার মেলার পাতায় ছাপানো ছড়া, কবিতা, গল্পের ছবি আঁকতেন। পূর্বদেশ পত্রিকারও নিজস্ব শিল্পী রয়েছে। থাকা সত্বেও দাদুভাই একদিন বলে বসেন, আফজাল তুমিই চাঁদের হাটের পাতার ছবিগুলো আঁকবে।
চাঁদের হাটের সাথে যুক্ত হওয়ার আগে আমি পূর্বদেশ আর ইত্তেফাক পত্রিকায় কার্টুন আঁকতাম। তখন বয়সে খুবই তরুণ, আর্ট কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। ভাবা যায় না, ঐ বয়সী একটা ছোকরার আঁকা কার্টুন তখন দেশের দুটো অতি জনপ্রিয় দৈনিক পত্রিকার সামনের পৃষ্ঠায় প্রায় প্রতিদিনই ছাপা হয়।
মনে আছে, তখন দৈনিক বাংলার প্রথম পৃষ্ঠায় প্রায় নিয়মিতই কার্টুন আঁকতেন আমার শিক্ষক, দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় কার্টুনিস্ট রফিকুন্নবী, রনবী।
আর্ট কলেজে পড়ি। ভালো ছবি আঁকার জন্য যা যা দরকার, সেইসব শেখাতেন শিক্ষকেরা। কার্টুন আঁকা, ইলাস্ট্রেশন করা শেখানো হতো না। বুঝতে পারি, ওগুলো নিজে নিজে শেখার বিষয়। শিখতে পারা বিশেষ যোগ্যতাও।
পত্র পত্রিকা খুললে আমার মনোযোগ কেড়ে নিতো ইলাস্ট্রেশন, কার্টুন। মনে হতো, হাতে গোনা শিল্পীরা এই কাজগুলো করেন। যারা করেন তাঁদের কারো কারো কার্টুন, ইলাস্ট্রেশন খুবই আগ্রহ নিয়ে দেখতাম। দেখতাম মনকে টেনে ধরতে পারে বলেই। মনে হয়েছিল, যার মধ্যে টেনে ধরার গুন আছে, তা নিশ্চয়ই বিশেষ।
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতাম কাইয়ূম চৌধুরী, রফিকুন্নবী, কালাম মাহমুদ, ঐ পারের সত্যজিৎ রায়, পূর্ণেন্দু পত্রী, সমীর সরকারের কাজগুলো। কার্টুনের ড্রইং পছন্দ করতাম রনবী, নবী স্যারের আর ভারতের চন্ডী লাহিড়ীর। একা একা চেষ্টা করতাম। সে গোপন চেষ্টার এক পর্যায়ে মনে হতে থাকে, পত্রিকায় কার্টুন না ছাপা হলে কেমন আঁকছি তা বোঝা সম্ভব হচ্ছে না।
শুরু হলো দৈনিক পত্রিকায় কার্টুন ছাপানোর চেষ্টা। কার্টুন এঁকে সঙ্গে নিয়ে নিয়ে পত্রিকা অফিসগুলোতে ঘুরতাম। স্বাধীনতার পর মতিঝিল থেকে ইংরেজি ও বাংলাতে দুটো পত্রিকা প্রকাশিত হতো। নাম ডেইলি স্পোকসম্যান ও দৈনিক মুখপত্র। এক সকালে দেখি দুই পত্রিকায় আমার আঁকা কার্টুন ছাঁপা হয়েছে। দেখা মাত্রই মনে হয়েছিল আমার যৌবনকাল সার্থক।
তারপর অনেক অপেক্ষার পর কার্টুন ছাপা হয় দৈনিক পূর্বদেশের সামনের পাতায়। সে দৈনিকের বার্তা সম্পাদক ছিলেন মীর নূরুল ইসলাম। তিনি আমাকে নিয়মিত আঁকতে পারবো কিনা জিজ্ঞাসা করেন। বলি পারবো। প্রায় রোজই পূর্বদেশে যাতায়াত শুরু হয়ে গেলো। বার্তা সম্পাদকের টেবিলের সামনে একদিন পরিচয় হলো দাদুভাইয়ের সঙ্গে। মানুষটার সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল। তিনি তাঁর বাহিনীতে আমাকে যুক্ত করে নেন।
দাদুভাই যেদিন বললেন, সারা চাঁদের হাঁটের পাতায় যেসব লেখা ছাপা হবে- লেখার রেখাচিত্রগুলো তুমি আঁকবে। শোনা মাত্র মনে হয়েছিল, জীবনে সবই যেনো পাওয়া হয়ে গেলো।
এখন কেউ ভাবতেও পারবে না, সেসময়ে আমাদের বন্ধুত্ব গড়ে দিয়েছে লেখালেখি, আঁকাআকি, চাঁদের হাট আর চাঁদের হাটের পরিচালক দাদুভাই। দাদুভাই পরিকল্পনা করলেন, চাঁদের হাটের ছোট অফিস ঘরে সাহিত্য সভা হবে। যারা ঢাকায় থাকে তারা তো আসবেই, যদি চাঁদের হাটের পাতায় অগ্রিম ঘোষণা দেয়া হয়, ঢাকার বাইরে থেকেও অনেকে এসে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবে।
সেই সাহিত্য সভার সূত্রে যুক্ত হয় সাগর আর মিলন। দুজনেই খুব কম সময়ের মধ্যে কাছের মানুষ, প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠে।
বন্ধু হয়ে গেছি। কে কোথায় থাকি, পরস্পরের জানা ছিল। কারো বাড়িতে তখনও পর্যন্ত যাওয়া আসা শুরু হয়নি। অতএব কারো বাবা মা, পরিবার সম্পর্কে তখন পর্যন্ত তেমন কিছু জানবার কথা নয়। সাগরের আব্বার অফিসে ঢুকে দেয়াল ভর্তি বাংলা ঘড়ি দেখে মনে হয়েছিল এগুলো এখানে এইভাবে সাজানো, তার মানে আমি কি বাংলা ঘড়ির উদ্ভাবকের অফিসে এসে হাজির!
মনে প্রশ্ন, সাগরের আব্বাই কি তাহলে ‘সান অব পাকিস্তান’ নির্মাণ করেছেন সেই ফজলুল হক। তা যদি হয়, দারুণ হবে ব্যাপারটা। এক ঢিলে দুই পাখি মারার মতো ঘটনা হতে চলেছে মনে হয়।
যার বিষয়ে কিছুটা জানতাম, আরো জানবার আগ্রহ ছিল সাগর আমাকে নিয়ে এসেছে, তারই অফিস ঘরের দরজায়। সাগরের মনে আমাকে নিয়ে একটা বিশেষ ইচ্ছা আছে, সে প্রসঙ্গে পিতাকে বলবে। পিতা যদি পুত্রের প্রস্তাবে সম্মত হন, পুত্রের বন্ধুর জন্য নতুন এক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাবে।
চলবে…







