এক শতাব্দী আগে বাংলাদেশের মধুপুর গড় থেকে শুরু করে সিলেট, চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের গহীন বনাঞ্চলে অবাধে ঘুরে বেড়াত শত শত বন্য হাতি। কিন্তু নগরায়ন, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণের কারণে আজ তারা নিজ দেশেই চরম সংকটের মুখোমুখি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা এশীয় হাতিকে বিশ্বব্যাপী ‘বিপন্ন’ বললেও, বাংলাদেশে আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এটি ‘মহাবিপন্ন’ বা বিলুপ্তির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।
১. কমছে সংখ্যা, সংকুচিত হচ্ছে বিচরণভূমি:
২০১৬ সালের আইইউসিএন শুমারি অনুযায়ী বাংলাদেশে স্থায়ী আবাসিক বন্য হাতির সংখ্যা ছিল ২৬৮টি। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়া, চোরা শিকার ও অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণে এই সংখ্যা বর্তমানে ২০০-এর নিচে নেমে এসেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
- রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও রেললাইন: কক্সবাজার ও চুনতির সংরক্ষিত বনে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন এবং বনের ভেতর দিয়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন নির্মাণের কারণে হাতিদের ঐতিহাসিক বিচরণ পথ বা ‘করিডর’ মারাত্মকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
- সীমান্তের কাঁটাতার: শেরপুর, নেত্রকোনা ও সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারত থেকে আসা পরিযায়ী হাতিগুলো কাঁটাতারের বেড়ায় আটকা পড়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যা মানুষ ও হাতির সংঘাতকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
২. মানুষ-হাতি দ্বন্দ্ব: মৃত্যুর মিছিল:
বনের পরিধি কমে যাওয়ায় এবং তীব্র খাদ্য সংকটের কারণে হাতির পাল প্রায়ই লোকালয়ের ফসলি জমি, কলাবাগান বা ধানক্ষেতে হানা দিচ্ছে।
- ফসল বাঁচাতে মানুষ ক্ষেতের চারপাশে বৈদ্যুতিক তারের বেড়া দিচ্ছে, যাতে স্পৃষ্ট হয়ে গত কয়েক বছরে অসংখ্য হাতি প্রাণ হারিয়েছে।
- অন্যদিকে, হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন বহু স্থানীয় গ্রামবাসী। এই চলমান সংঘাত দুই পক্ষের জন্যই এক নির্মম বাস্তবতা তৈরি করেছে।
৩. বন্দি হাতিদের যন্ত্রণাময় জীবন
বনের হাতির বাইরে বাংলাদেশে প্রায় ৯৬টি হাতি বন্দিদশায় (Captive) রয়েছে। এই হাতিগুলোকে সার্কাস, জঙ্গল থেকে ভারী গাছ টানা এবং রাস্তাঘাটে জোরপূর্বক চাঁদাবাজি বা ভিক্ষাবৃত্তির মতো অমানবিক কাজে ব্যবহার করা হয়। দীর্ঘ সময় শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা এবং নির্যাতনের কারণে এই হাতিগুলোর জীবন কাটে চরম যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে।
৪. আশার আলো: ঘুরে দাঁড়ানোর কিছু গল্প
এত সংকটের মাঝেও সম্প্রতি বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে:
- গারো পাহাড়ে সুসংবাদ: শেরপুরের বন্যপ্রাণী বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বালিজুরি রেঞ্জের গারো পাহাড়ে হাতির জন্য বিশেষ খাদ্যসমৃদ্ধ বাগান করায় সেখানে হাতির বংশবিস্তার বাড়ছে এবং ড্রোনের মাধ্যমে হাতির পালে নতুন শাবকের উপস্থিতি দেখা গেছে।
- উচ্চ আদালতের ঐতিহাসিক রায়: ২০২৪ সালে বাংলাদেশ হাইকোর্ট নতুন করে হাতি শিকার এবং বন্দি করার লাইসেন্স দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
- বন্য পরিবেশে পুনর্বাসন প্রকল্প: ২০২৫-২০২৬ সালের দিকে বাংলাদেশ সরকার বন্দি হাতিদের ব্যক্তিগত মালিকদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে অবমুক্ত করা এবং তিন বছর মেয়াদী
- পুনর্বাসন: পুনর্বাসন প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের প্রাকৃতিক বনাঞ্চলে ফিরিয়ে দেওয়ার জাতীয় উদ্যোগ শুরু করেছে।
হাতি কেবল বনের সৌন্দর্য নয়, বরং তারা বনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বজায় রাখার প্রধান কারিগর। করিডরগুলো পুনরুত্থিত করা, বনে পর্যাপ্ত খাবারের গাছ লাগানো এবং বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় আইনের কঠোর প্রয়োগই পারে মহাবিপন্ন এই প্রাণীকে বাংলাদেশের বুক থেকে চিরতরে হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করতে।








