অচেনা এক শক্তির মুখোমুখি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গত কয়েক দশক ধরে আমরা বিশ্বাস করে এসেছি যে নতুন প্রযুক্তি মানেই বিশ্বের উন্নতি। কিন্তু ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে সেই ধারণা বড় একটা ধাক্কা খেয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে শুধু টাকা আয়ের মেশিন হিসেবে দেখছে না। তারা এখন দেখছে দেশের নিরাপত্তার জন্য এআই একটি বিরাট হুমকি।
যে প্রযুক্তি দিয়ে চ্যাট করা যায় বা ছবি বানানো যায়, তার আড়ালে এমন এক ভয়ংকর শক্তি লুকিয়ে আছে যা বিপদে ফেলতে পারে, তা মার্কিন নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারছেন। তারা বুঝেছেন যে, এআই হলো এক দুধারী তলোয়ার। এটি যেমন আমাদের জীবন সহজ করতে পারে, তেমনি চোখের পলকে সব ধ্বংসও করে দিতে পারে। ঠিক এই কারণেই এই শক্তিকে এখন আর শুধু কোম্পানিগুলোর মর্জির ওপর ছেড়ে দেওয়া নিরাপদ মনে করছে না মার্কিন প্রশাসন।
শক্তিশালী এআই মডেল ও তাদের অজানা ক্ষমতা
বর্তমানে তৈরি হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ফ্রন্টিয়ার মডেলগুলোর ক্ষমতা সাধারণ এআই-এর চেয়ে অনেক গুণ বেশি। দেখা যাচ্ছে যে এই মডেলগুলোর ট্রেনিং যখন শেষ হয়, তখন তারা এমন কিছু নতুন কাজ করতে শুরু করে যা তাদের নির্মাতারাও আগে থেকে জানতেন না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন ভয় পাচ্ছে যে এআই-এর এই অজানা ক্ষমতাগুলো নিয়ন্ত্রণ করার কোনো কায়দা এখনো আমাদের হাতে নেই। তাই মার্কিন প্রশাসন বড় বড় এআই কোম্পানিগুলোকে এখন কড়া নজরদারিতে রাখছে। কোনো নতুন মডেল বাজারে ছাড়ার আগেই সেগুলোকে ল্যাবে নিয়ে নানাভাবে পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে যে সেগুলো দিয়ে কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ করা সম্ভব কি না।
ডিজিটাল যুদ্ধের নতুন অস্ত্র ও সাইবার হামলা
এআই-এর বিপজ্জনক ক্ষমতা হ্যাকিং বা সাইবার হামলাকে অনেক বেশি সহজ করে দিয়েছে। আগে বড় কোনো হামলা চালাতে অনেক অভিজ্ঞ মানুষের দরকার হতো। কিন্তু এখন এআই নিজেই সফটওয়্যারের ভেতর লুকিয়ে থাকা সূক্ষ্ম ভুলগুলো খুঁজে বের করতে পারে এবং এমন সব ভাইরাস তৈরি করতে পারে যা কোনো অ্যান্টি-ভাইরাসও ধরতে পারবে না। এর মানে হলো এখন আর খুব বেশি দক্ষ না হয়েও যে কেউ এআই-এর সাহায্য নিয়ে একটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বা ব্যাংক অচল করে দিতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি এখন এক বিশাল দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জীবাণু অস্ত্র ও জননিরাপত্তার হুমকি
একটি বড় ভয়ের জায়গা হলো এআই এখন বিজ্ঞান আর ভাইরাসের জটিল সব রহস্য সমাধান করতে পারছে। দেখা যাচ্ছে যে কোনো সাধারণ মানুষ বা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী যদি এআই-এর কাছে জানতে চায় যে কীভাবে কোনো ভাইরাসকে আরও প্রাণঘাতী করা যায় এবং সেটা ল্যাবে তৈরি করার উপায় কী, তবে এআই তাকে ধাপে ধাপে সব শিখিয়ে দিচ্ছে। আগে এসব তথ্য পাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু এখন ঘরে বসে সহজেই মারণাস্ত্র বা বিষাক্ত রাসায়নিক তৈরির রেসিপি পাওয়া যাচ্ছে। এই প্রযুক্তি যাতে ভুল মানুষের হাতে না পড়ে, সেটাই এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মূল মাথা ব্যথার কারণ।
মিথ্যা তথ্যের ভিড়ে সত্যের মৃত্যু
এআই এখন শুধু ভুল খবর ছড়ায় না, বরং আপনার পছন্দ আর স্বভাব বুঝে এমনভাবে মিথ্যা সাজায় যে আপনি সেটা বিশ্বাস করতে বাধ্য হবেন। এর ফলে সমাজে আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে। মানুষ যখন আর বুঝতে পারবে না কোনটি আসল ভিডিও আর কোনটি এআই দিয়ে বানানো ডিপফেক, তখন পুরো গণতন্ত্রের ভিত নড়ে উঠবে। সত্য আর মিথ্যার এই সীমানা মুছে যাওয়াকে একটি অস্তিত্ব সংকট হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন পরিষ্কার বুঝতে পারছে যে এআই-এর এই অন্ধকারের দিকটাকে এখনই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

মার্কিন প্রশাসনের নতুন কড়াকড়ি ও নজরদারি
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন আর এআই কোম্পানিগুলোকে আগের মতো অবাধে কাজ করতে দিচ্ছে না। মার্কিন সরকার এখন বড় বড় মডেলগুলোর জন্য কড়া নিয়ম চালু করছে। কোম্পানিগুলো এখন চাইলেই গোপনে তাদের শক্তিশালী এআই রিলিজ করতে পারবে না। আগে তাদের সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে যে তাদের এআই বোমা বানাতে সাহায্য করবে না বা হ্যাকিংয়ে পথ দেখাবে না। এই নজরদারি অনেকটা পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর তদারকির মতো হয়ে যাচ্ছে যেখানে প্রতি মুহূর্তের খবরাখবর সরকারকে দিতে হয়।
চিপ ও কম্পিউটিং শক্তির আসল লড়াই
এআই-এর আসল ক্ষমতা আসলে সফটওয়্যারে নয়, বরং চিপ বা হার্ডওয়্যারে। যার কাছে যত বেশি শক্তিশালী চিপ থাকবে, তার এআই তত বেশি শক্তিশালী হবে। এই কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন উন্নত চিপের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। তারা এনভিডিয়া বা এএমডির মতো কোম্পানিগুলোকে কড়া নির্দেশ দিয়েছে যেন তাদের চিপ কোনোভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর হাতে না পৌঁছায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মনে করে যে যদি চিপের সাপ্লাই বন্ধ রাখা যায়, তবে শত্রুপক্ষ বিপজ্জনক এআই বানাতে পারবে না।
সবকিছু উন্মুক্ত করার বিপদ
ইন্টারনেটে সবকিছু সবার জন্য উন্মুক্ত বা ওপেন সোর্স রাখা ভালো বলে অনেকে মনে করলেও এখানে কিছু বড় বিপদ আছে। কিছু কোম্পানি তাদের এআই সবার জন্য ফ্রি করে দিলেও মার্কিন সরকার এতে ভয় পাচ্ছে। কারণ একবার যদি একটি শক্তিশালী এআই-এর মূল কোড ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেটা আর কোনোভাবেই আটকানো সম্ভব নয়। অপরাধীরা তখন সেই কোড থেকে নিরাপত্তার দেয়াল সরিয়ে সেটিকে খারাপ কাজে ব্যবহার করবে। একবার সেই দরজা খুলে গেলে তা আর কোনোদিনও বন্ধ করা যাবে না।

এককাট্টা হয়ে বিশ্বকে বাঁচানোর চেষ্টা
কোনো একটি দেশ একা এআই নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কড়া নিয়ম করলে কোম্পানিগুলো অন্য দেশে চলে যেতে পারে যেখানে নিয়মকানুন শিথিল। উদাহরণ হিসেবে চীনা এআই খাতের উত্থান উল্লেখ করা যেতে পারে। তাই পারমাণবিক শক্তির তদারকির জন্য যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে, এআই-এর জন্যও তেমন একটি বিশ্বজুড়ে শক্তিশালী সংস্থা দরকার। এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন প্রযুক্তিতে সবার চেয়ে এগিয়ে থাকতে চায়, অন্যদিকে দেশের নিরাপত্তা নিয়েও বড় ঝুঁকিতে আছে। এই দুইয়ের মাঝে এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চলছে।
এআই এখন আর সাধারণ কোনো সফটওয়্যার নয়, এটি এখন দেশের নিরাপত্তার প্রধান বিষয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবশেষে এই বিপদ সম্পর্কে জেগে উঠেছে। একদিকে উদ্ভাবনের আনন্দ, অন্যদিকে ধ্বংসের ভয়—এই দুইয়ের লড়াই এখন তুঙ্গে। পৃথিবী কতটা নিরাপদ থাকবে তা নির্ভর করবে আমরা এই শক্তিশালী প্রযুক্তিকে কতটা সাবধানে ব্যবহার করতে পারি তার ওপর।
(তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট- ফিচার স্টোরি, ১৬ এপ্রিল ২০২৬)







