এডিস ইজিপ্টি প্রজাতির মশার কামড় থেকে হওয়া ডেঙ্গু আর মৌসুমী রোগ নেই, এখন সারা বছরের রোগে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি এডিস মশা আচরণও বদলেছে।
কীটতত্ত্ব ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন এখনও ট্রায়াল পর্যায়ে রয়েছে, নিয়মিত গবেষণা চলছে। এখনো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারে উপযোগী হয়নি। ডেঙ্গু আগামী কয়েকদিন আরও বাড়বে।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস বিভাগ জানায়, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এই বছর এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ১০২ জন। এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে ভর্তি হয়েছেন ১৬ হাজার ৮১৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন পাঁচজন। যা চলতি বছর একদিনে সর্বোচ্চ মৃত্যু। গতকাল সোমবার (৯ সেপ্টেম্বর) একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ৬১৫ জন রোগী, যা চলতি বছর একদিনে সর্বোচ্চ।
ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ২১ থেকে ২৫ বছরের ১ হাজার ৬১৩ জন পুরুষ ও ২৬ থেকে ৩০ বছরের ৮৫৯ জন মহিলা আক্রান্ত হয়েছেন। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ ও ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ মহিলা। মারা যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ মহিলা ও ৪৮ শতাংশ পুরুষ।
মৃতদের মধ্যে ৫৮ জন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নয় জন, ঢাকায় (সিটি করপোরেশনের বাইরে) দুই জন, চট্টগ্রামে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১৪ জন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে একজন, বরিশাল (সিটি করপোরেশনের বাইরে) ১০ জন, খুলনায় (সিটি করপোরেশনের বাইরে) পাঁচ জন, ময়মনসিংহে (সিটি করপোরেশনের বাইরে) দুইজন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর এযাবৎকালের সর্বাধিক ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুরোগী শনাক্ত হয়। তবে তখন রোগী বেশি ছিল মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত। এ বছর জানুয়ারিতেই হাজারের বেশি রোগী পাওয়া গেছে যা আগে কখনও পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালের জুলাই থেকে রোগী বাড়তে শুরু করে। জুলাইয়ে ৪৩ হাজার ৮৫৪ জন, আগস্টে ৭১ হাজার ৯৭৬ জন এবং সেপ্টেম্বরে ২১ হাজার ৫২৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। সেই তুলনায় এই বছর রোগী কম পাওয়া যাচ্ছে।
ডিএসসিসি এলাকায় ২৫ শতাংশ রোগী
তথ্য বিশ্লেষণ করে জানা যায়, এই বছরের আক্রান্ত রোগীদের বেশিরভাগই ঢাকার দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার। এই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে প্রাপ্ত রোগীর প্রায় ২৫ শতাংশ রোগী ঢাকা দক্ষিণের। আর মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি এই এলাকায়। তথ্য বলছে, এখন পর্যন্ত মোট মৃত্যু ৯৭ জনের মধ্যে ৫৮ জনই ডিএসসিসি এলাকায় মারা গেছেন। আর রোগী পাওয়া গেছে ৪ হাজার ২০১ জন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় রোগী পাওয়া গেছে ২ হাজার ৮৪৫ জন এবং মারা গেছেন ৯ জন।
সিটি করপোরেশনের বাইরের রোগী
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি রোগী আছে চট্টগ্রাম বিভাগে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় এখন পর্যন্ত ৪৫ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে রোগী ভর্তি হয়েছেন ৪ হাজার ৪১৩ জন। এছাড়া বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ১ হাজার ৭৩১ জন, খুলনা সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ১ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ৩২৯ জন, রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ১৯৬ জন এবং রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ৬১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন কোন পথে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে জাপানি ভ্যাকসিন কেমিকেল ট্রায়ালে অনেক দূর উন্নীত হয়ে আসছে। আরও দুটি ধাপের ট্রায়াল বাকি আছে, সেটা যদি সম্পন্ন করা যায় এবং সফলতার পরিমাণটা বেশি থাকে তাহলে আমরা বাণিজ্যিকভাবে আমরা ব্যবহার করতে পারব। ডেঙ্গু ভাইরাসের চারটি ধরন আছে: ডেন-১, ডেন-২, ডেন-৩ ও ডেন-৪। সবকটি ধরনকে যেন ভ্যাকসিনটি প্রতিরোধ করতে পারে ট্রায়ালে এমন চেষ্টায় করা হচ্ছে। বর্তমানে গবেষণার জন্য ভ্যাকসিনগুলো তৈরি হচ্ছে এখনো বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হচ্ছে না।
ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন বলেন, ভ্যাকসিনের জন্য আমাদের বর্তমানে চিন্তা না করে নিজেদের সচেতন থাকতে হবে। অক্টোবর পর্যন্ত মশারি ব্যবহার করতে হবে, দায়িত্ব নিয়ে বাড়ির আঙ্গিনা পরিস্কার রাখতে হবে। এছাড়া জ্বরকে অবহেলা করা যাবে না।
২৪ ঘণ্টাই কামড়ায় এডিস মশা
ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, ২৪ ঘণ্টাই এডিস মশা কামড়ায়, যাতে ডেঙ্গু হতে পারে। তবে রাতের অন্ধকারে কামড়ানোর হার কিছুটা কম থাকে, ঘর আলোকিত থাকলে রাতেও কামড়াতে পারে। মোটকথা, বদলে গেছে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার আচরণ। ডেঙ্গু এখন সারা বছরের অসুখ হয়ে গেছে। ডেঙ্গু শনাক্তের জন্য এনএস১ পরীক্ষাই যথেষ্ট।
তিনি বলেন, ডেঙ্গুর উপসর্গের ধরন পাল্টে গেছে। এখনকার ডেঙ্গুতে যেসব উপসর্গ দেখা দিচ্ছে তা হলো হঠাৎ জ্বর আসা আবার জ্বর না থাকা, কাশি, শরীর ব্যথা, বমি বা বমি বমি ভাব, অসহ্য পেটে ব্যথা, চোখে ব্যথা, দেহে র্যাশ ওঠা, প্রেসার ও পালস কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া, প্রস্রাব কম হওয়া, দীর্ঘমেয়াদি ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ, হাত-পা ফুলে যাওয়া, দেহে পানি আসা, পাতলা পায়খানাসহ প্লাটিলেটও অনেক কমে যাচ্ছে। সুস্থ হতে বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হচ্ছে ভর্তি রোগীদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অকার্যকর
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, আমি দুই মাস আগেও বলেছিলাম এই মৌসুমে ডেঙ্গু বাড়বে। এখন ডেঙ্গু আগামী কয়েকদিন আরও বাড়বে। এই মুহূর্তে সিটি করপোরেশনের জোরেসোরে কাজ করা দরকার। হট স্পট ম্যানেজমেন্ট, লার্ভা ম্যানেজমেন্ট, লার্ভা সোর্স ম্যানেজমেন্ট– এই তিনটা বিষয়ে এখন গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বর্তমানে অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। স্থবির তাদের কার্যক্রম। তবে স্থানীয় সরকার, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা জনপ্রতিনিধিদের এখানে সম্পৃক্ত করতে হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাতে হবে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আছে: উপদেষ্টা
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এ এফ হাসান আরিফ বলেছেন, আমাদের লক্ষ্য হবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে একজন রোগীও যেন মারা না যায়। দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। ডেঙ্গু যেন আর বৃদ্ধি না পায়, সেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমরা সচেতনতা ও চিকিৎসার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছি। উন্নত দেশের মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে গবেষণামূলক কার্যক্রম নেওয়া হবে।







