রাজধানীর যানজট সমস্যা নিরসনে চালু হলো আন্তঃজেলা বাসের গেটলক সিস্টেম। ফলে যাত্রীদের নির্দিষ্ট পথের যাত্রার সময় বাঁচবে এবং ভ্রমণ হবে নিরবচ্ছিন্ন ও আনন্দদায়ক।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিস্টেমের মাধ্যমে নির্দিষ্ট এলকা পর্যন্ত আন্তঃজেলা বাসগুলো রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাত্রী নিতে পারবে না। ফলে যানজট অনেকটাই নিরসন হবে। ভবিষ্যতে এই সিস্টেমটাকে উত্তরা অবধি বৃদ্ধি করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
আজ রোববার দুপুরে এই কার্যক্রম চালু করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিকের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আব্দুল মোমেন। এদিন মহাখালী এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের সামনে কাজ করছেন ট্রাফিক সদস্যরা। সঙ্গে পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের পক্ষ থেকে মোতায়েন করা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক। বাস থামানো মাত্র ট্রাফিক সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক সদস্যরা সেই বাসকে হুশিয়ার করে সরিয়ে দিচ্ছেন। রাস্তার দুই পাশে অবৈধ পার্কিং বন্ধ, যত্র-তত্র গাড়ি থামানো নিয়ন্ত্রণেই বর্তমানে এ সড়কের গতি বেড়েছে অন্তত দ্বিগুন। আর সড়কের এই গতি অব্যাহত রাখতে সার্বক্ষনিক মাঠে থেকে দায়িত্ব পালন করছেন গুলশান ট্রাফিক বিভাগের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও।
ট্রাফিক বিভাগ জানায়, এ সড়কে চলাচলকারী আন্তঃজেলা কোনো বাসকে তত্রতত্র পার্কিং যেমন করতে দেয়া হচ্ছে না, তেমনি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে তত্রতত্র ইউটার্নও। ইউটার্ন মোড়ে ট্রাফিক সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবক দুজন সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালন করছেন। যেকারণে গমনাগমনে সড়কের যানবাহন থাকছে গতিশীল।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিকের গুলশান বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) আব্দুল মোমেন বলেন ‘মহাখালী বাস টার্মিনাল একটি সংবেদনশীল জায়গা। এখানে শ্রমিকরা আছেন, যাত্রীরা বাসে চলাচল করেন। সুতরাং সকল প্রকার সংবেদনশীলতা মাথায় রেখে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হয়, যাতে যাত্রীরা কোনো প্রকার সমস্যায় না পড়েন। যে কারণে আমরা কখনো কঠোর হই কিংবা একটু নরমভাবে ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। আন্তঃনগর গেটলক সিস্টেম নগরবাসী ও যাত্রীদের জন্য সুফল বয়ে আনবে।’
মহাখালী বাস টার্মিনাল মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম বলেন: আমরা লক্ষ্য করেছি মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ছেড়ে যাওয়া সকল বাসগুলো বনানী পর্যন্ত যত্রতত্র যাত্রী উঠায়। এরফলে যানজটের সৃষ্টি হয়। এ সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছিল। সম্প্রতি আমরা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান নূর মোহাম্মদ মজুমদার, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার হাবিবুর রহমান ও গুলশান ডিভিশনের ট্রাফিকের উপ-কমিশনার আব্দুল মোমেনসহ শ্রমিক ফেডারেশনের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেই যে মহাখালী থেকে ছেড়ে যাওয়া কোনো গাড়ি বনানী পর্যন্ত কোনো যাত্রী উঠাবে না। এরমাধ্যমে এই এলাকায় যানজট নিরসন হবে। মহাখালী থেকে ছেড়ে যাওয়া গাড়িগুলোতে যাত্রীদের তালিকা, ড্রাইভারের নাম ও গাড়ির নাম্বার সহ একটি ‘প্রস্থান পত্র’ দেওয়া হবে। পরে বনানীতে আমাদের সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্তরা সেখানে দেখবেন যে যাত্রীর সংখ্যা সঠিক আছে কি না।

ডিসি আব্দুল মোমেন বলেন, ‘পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ প্রতিনিয়ত গেটলক সিস্টেম তদারকি করবে। কোনো পরিবহন এই নিয়ম অমান্য করে যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
মহাখালী বাস টার্মিনালের সামনে গাড়ি পাকিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল কালাম বলেন: মহাখালী বাস টার্মিনালের পেছনে দুই একরের বেশি সরকারি সম্পত্তি রয়েছে। সম্প্রতি সিটি করপোরেশন সেটা উচ্ছেদ করে বালু ভরাটের কাজ শুরু করেছে । এই জায়গার কাজ শেষ হলে মহাখালীর বাস টার্মিনালের সামনে আর বাস পার্কিং করে রাখার প্রয়োজন পড়বে না। তবে বর্তমানে যেহেতু পার্কিংয়ের জায়গার সংকট তাই টার্মিনালের সামনে আমরা নির্ধারিত সময়ে নিয়মমাফিক বাসগুলো এক লাইনে রাখব যাতে যানজটের সমস্যা না হয়। রাস্তা যানজটমুক্ত রাখতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করছি এবং ট্রাফিক পুলিশকেও পাশে পাচ্ছি।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী বলেন: ঢাকার যানজট শুধুমাত্র মহাখালীর জন্য হয় না, একটু লক্ষ্য করে দেখুন মহাখালীতে ঢুকার মুখে কাঁচাবাজারের সামনে রাস্তা দখল করে কাপড়ের মার্কেট, আইসিডিডিআরবি’র সামনে ফুটপাতে চায়ের দোকান এগুলোও প্রশাসনের নজরে আসতে হবে। আমরা আমাদের নিজেদের এলাকা যানজটমুক্ত রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। তাই আন্তঃনগর বাসগুলো যাতে বনানী পর্যন্ত যাত্রী না নিতে পারে সেটার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। উত্তরাতেও আন্তঃনগর বাসগুলো ব্যাপক পরিমাণ যানজট সৃষ্টি করে। আমরা ভবিষ্যতে উত্তরা ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব।
বিভিন্ন আন্তঃনগর বাসের চালকরা চ্যানেল আই অনলাইনকে জানান, গেটলক সিস্টেম চালু হওয়ায় তাদের সুবিধা হয়েছে। যত্রতত্র যাত্রী উঠালে অন্য যাত্রীদের কথা শুনতে হয়, রাস্তায় যানজটের কবলে পড়তে হয় পাশাপাশি প্রশাসনের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। এখন বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রী উঠবে। আমাদের দেখভাল করার জন্য শ্রমিক সংগঠনের লোকজন থাকবে। গেটলক সিস্টেম চালু হওয়ায় সুফল পাবেন কাঙ্খিত গন্তব্যের যাত্রীরা। তারা বলছেন এই সিস্টেম চালু হওয়ায় যাত্রাপথে ভ্রমণে কোন অসুবিধা থাকবে না।

ঢাকা-টাঙ্গাইল আন্তঃনগর একটি বাস সার্ভিসের যাত্রী সোহানুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: মহাখালী থেকে টাংগাইল সদর যেতে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা থেকে দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট লাগে। কিন্তু বাস স্টেশন আর মহাখালী ছাড়তে তারা কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় নেন। এরপর আমতলী, চেয়ারম্যানবাড়ি, সৈনিক ক্লাব ও কাকলী পর্যন্ত আরও এক ঘণ্টা যাত্রী নেওয়ার চেষ্টা থাকে। বাসের গতিও কম থাকে। ফলে ঢাকার এক অংশেই আমাদের দুই ঘণ্টা চলে যায়। আর নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছাতে চার থেকে সাড়ে চার ঘণ্টা লাগে। গেটলক সিস্টেম চালু হবার ফলে এমন ভোগান্তিতে আর যাত্রীরা পড়বে না। নিরবচ্ছিন্নভাবে যাত্রাপথে আমরা ভ্রমণ করতে পারব।










